যুবলীগের আত্মপ্রকাশ ও সংগ্রামী পথচলা

|

সৈয়দ মিজানুর রহমান:

যুবসমাজের প্রিয় রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী যুবলীগ কেমন প্রেক্ষাপটে, কীভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করলো তা আমাদের তরুণ যুবসমাজকে জানতে হবে। প্রাসঙ্গিক আলোচনার পূর্বে বাংলার দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়লাভের পর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতা দখলের যে অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে এ সম্পর্কে তরুণ যুবসমাজের বিস্তারিত ধারণা থাকা উচিৎ বলে মনে করি।

বৃটিশ উপনিবেশ থেকে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বাঙালিরা স্বাধীনতা পেয়েছে ঠিক কিন্তু পাকিস্তানের অংশ হওয়ায় পুনরায় শাসন-শোষণের যাঁতাকলে পড়ে এই জাতি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেটা অ্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন ‘এক শকুনির হাত থেকে অন্য শকুনির হাত বদল মাত্র’। পাকিস্তানিদের প্রথম আঘাত আসলো আমাদের মায়ের ভাষা বাংলার উপর। আন্দোলন সংগ্রামের প্রাণপুরুষ তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের চাপিয়ে দেওয়া উর্দু ভাষার বিরুদ্ধে ইস্পাত কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর একে একে শিক্ষার অধিকার, স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান, মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধিকার আন্দোলনে ছাত্র ও যুবসমাজের সংগ্রামী নেতৃত্বে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল চালিকা শক্তি হিসাবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে ছাত্র ও যুবসমাজের অবিস্মরণীয় ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শুরু হয় ক্ষমতা দখলের নতুন ষড়যন্ত্র। বলা হয়ে থাকে স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। ঠিক তেমটাই ঘটলো বাঙালিদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে যুবসমাজের ভাগ্যে।

মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিব বাহিনীর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমদ, শাজাহান সিরাজ ও আসম আবদুর রব। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই দক্ষ সংগঠক ও তাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিত সাবেক ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান ছাত্র ও যুব শক্তির বড় একটি অংশকে আওয়ামী রাজনীতির মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে গোপন সংগঠন গড়ে তোলেন। যুদ্ধে বিজয় লাভের পর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে ভিন্ন মতাদর্শে যুবসমাজকে সংগঠিত করা হয় ক্ষমতা দখলের হীন পরিকল্পনার অংশ হিসাবে। যার সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ‘জাসদ’ আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে। প্রথমে আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে যুব সংগঠন করার চিন্তা থাকলেও সিরাজুল আলম খানের ফর্মূলায় পরবর্তীতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠন করে দেশের যুব সমাজের একটা অংশকে আওয়ামী লীগের মূল ধারার রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে জাসদে অন্তর্ভুক্তির কার্যক্রম শুরু হয়। এ সময়ে জাসদ মতাদর্শের অনুসারীরা বিভিন্নভাবে সরকার বিরোধী অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে। হত্যা, দাঙ্গা, লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করে যুব সমাজকে বিপথগামী করে তোলে।

এমন পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী তরুণ ও যুব সমাজকে বিভ্রান্তির থেকে দূরে রাখতে ও তারা যেন হতাশাগ্রস্ত না হয়ে পড়ে সে লক্ষ্যে একটি যুব সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এমতাবস্থায় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, মহান মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর অন্যতম সংগঠক, বিশিষ্ট সাংবাদিক শেখ ফজলুল হক মনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর দেশের প্রথম যুব সংগঠন আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত নবজাতক বাংলাদেশের তরুণ যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে আদর্শিক দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজে লাগানোই ছিল যুবলীগ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুজিব ভাবাদর্শের এই সংগঠনটি আজ উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ যুব সংগঠন হিসাবে খ্যাতি লাভ করেছে।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যুবলীগ নেতাকর্মীরা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও দেশগড়ার কাজে আত্মনিয়োগের পাশাপাশি অপশক্তির অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে বারংবার রাজপথে রক্ত দিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার প্রতিবাদে আন্দোলন করতে গিয়ে বগুড়ায় যুবলীগ নেতা আব্দুল খালেক খসরু, চট্টগ্রামে যুবলীগ নেতা মৌলভী ছৈয়দ আহমদ নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে যুবলীগ নেতা নূর হোসেনের তাজা রক্তের ঋণ শোধ করার মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয় স্বৈরশাসক এরশাদ। এছাড়া ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যুবলীগের অনবদ্য ভূমিকা, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট, বিএনপি জোট সরকারের সরাসরি মদদে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী, দেশরত্ন শেখ হাসিনার প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে যুবলীগ ছিলো সোচ্চার, অপ্রতিরোধ্য। ২০০৫ সালের লগি-বৈঠা আন্দোলন, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিরোধী আন্দোলনসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আওয়ামী যুবলীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১/১১ এর প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা কারান্তরীণ হলে তার মুক্তির আন্দোলনে গ্রেফতার হয়ে কারা নির্যাতনের শিকার হয় শত-সহস্র যুবলীগ নেতা কর্মী। ২০০৮ সালে ভোট বিপ্লবের অগ্রভাগে আওয়ামী যুবলীগের অসামান্য অবদান রয়েছে। যুদ্ধপরাধ ও মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত আসামিদের বিচারকার্য সম্পন্ন এবং ২০১৩ সালের ৫ এবং ৬ মে হেফাজতের ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা প্রতিরোধে আওয়ামী লীগ সরকারের নিরবিচ্ছিন্ন ছায়াসঙ্গি হিসাবেও যুবলীগ রাজপথে সংগ্রাম অব্যাহত রাখে।

জাতীয় কংগ্রেসের মাধ্যমে যুবলীগের নেতৃত্বের পরিবর্তন হয়। ৪৭ বছরে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে এ পর্যন্ত ছয়টি কংগ্রেস অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের জাতীয় নেতৃত্বের পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় কংগ্রেসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে শেখ ফজলুল হক মনি চেয়ারম্যান ও এডভোকেট সৈয়দ আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় কংগ্রেসে আমির হোসেন আমু চেয়ারম্যান ও ফকির আব্দুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে তৃতীয় কংগ্রেসে মোস্তফা মহসীন মন্টু চেয়ারম্যান ও ফুলু সরকার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ কংগ্রেসে শেখ ফজলুল করিম সেলিম চেয়ারম্যান ও কাজী ইকবাল হোসেন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালে পঞ্চম কংগ্রেসে এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক চেয়ারম্যান ও মীর্জা আজম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই কংগ্রেসের পর ২০০৯ সালে এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনীত হলে মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় কংগ্রেসে মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী চেয়ারম্যান ও মোঃ হারুনুর রশীদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়।

ইতিমধ্যে আওয়ামী পরিবারের সর্বোচ্চ অভিভাবক মাননীয় নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নির্দেশক্রমে আগামী ২৩ নভেম্বর ২০১৯, যুবলীগের সপ্তম জাতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই কংগ্রেসের মধ্য দিয়ে সকল অভিযোগ পরিশুদ্ধ করে এগিয়ে যাবে মুজিব আদর্শের প্রিয় এই যুব সংগঠনটি। কারণ দেশের মোট জনসংখ্যার বৃহৎ অংশ হচ্ছে যুবসমাজ। এ যুব সমাজকে সঠিক মেধা, মনন ও প্রযুক্তি জ্ঞানে গড়ে তুলতে পরিশুদ্ধ যুব রাজনীতির বিকল্প নেই। গণতন্ত্র, শোষণমুক্ত সমাজ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষতা এই চার মূলনীতিকে সামনে রেখে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বেকারত্ব দূরীকরণ, দারিদ্র বিমোচন, শিক্ষা সম্প্রসারণ, যুব সমাজের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যত নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ বদ্ধপরিকর। আধুনিক প্রযুক্তির জ্ঞানে দক্ষ যুবশক্তি গড়ে তুলতে সৃজনশীল কর্মসূচি প্রণয়ন করে রাষ্ট্রনায়ক জননেত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রদর্শন বিশ্বপরিমন্ডলে তুলে ধরতে মেধা, মনন ও আদর্শিক চেতনায় বলীয়ান যুব সমাজ আওয়ামী যুবলীগের পতাকাতলে সমবেত হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলবে। এবারের জাতীয় কংগ্রেস সামনে রেখে তরুণ যুবসমাজের এমনটাই প্রত্যাশা।

লেখক: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তর।
চেয়ারম্যান, শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র, ঢাকা।









Leave a reply