অমর শেখ রাসেল

|

শুক্রবার শেখ রাসেলের ৫৬-তম জন্মদিন। ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠতম এই সন্তান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বর্বরভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। শিশু রাসেলকেও রেহাই দেয়নি ঘাতকরা। রাসেলকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদ।

রাসেলের জন্মের সময় আমার পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছিল। সকালে রাসেলের জন্মের খবর পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত হলাম। কিন্তু পরীক্ষার কারণে বিকেলে গিয়ে নবজাতক রাসেলকে দেখলাম। কী সুন্দর একটা শিশু! তুলতুলে শরীর আর মাথাভর্তি চুল। রাসেলকে কোলে নিতে সবার মধ্যে রীতিমতো কাড়াকাড়ি। সেখানে ছিল রাসেলের বড় বোন হাসিনার খবরদারি। রেহানাও কম ছিলো না। সেই রাসেল চোখের সামনে আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলো।

পাশাপাশি বাসা হওয়ায় রাসেল খেলতে আমাদের বাসায় চলে আসতো। তার মধ্যে একটা স্বাধীনচেতা ভাব ছিল। ছয় দফা আন্দোলনের সময় মুজিব মামা দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। তখন দেখতাম রাসেল জেলখানা থেকে বাবার সাথে দেখা করে বাসায় আসতে চাইতো না। বাসায় এসেই বিষণ্ন মনে বসে থাকতো। বাবাকে খুব মিস করতো রাসেল। একারণে রাসেলে মন ভালো রাখতে একটা সাইকেল কিনে দেয়া হয়। সেই সাইকেল নিয়ে ঘুরাঘুরিতে ব্যস্ত থাকতো সে। মাঝেমধ্যে রাসেল সাইকেল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে যেত।

রাসেল অনেক ভালোবাসা আর আদরে বড় হলেও তার মধ্যে ব্যক্তিত্ববোধ ছিল। কেউ ডাকলেই সে সহজে কাছে যেত না। নিজের মতো একা থাকতে পছন্দ করতো। সে মায়ের আঁচলে নিচে থাকতে খুব পছন্দ করতো। মায়ের আঁচল ছাড়তেই চাইতো না। রাসেলকে ডিম পোচ দেয়া হলে তাতে নুন আর গোলমরিচের সাথে চিনি দেয়া লাগতো। আমরা সবাই অবাক হতাম। রাসেল তার পছন্দের মেন্যু নিয়ে তখন ভাবতাম এটা আবার কেমন মেন্যু? পরে মনে হয়েছে, আমরা তো ডিমের হালুয়া খাই। সেখানে তো ঘি আর চিনিই দেয়া থাকে। সেই হিসেবে রাসেলের চিনি দিয়ে ডিম পোচ খাওয়া মন্দ ছিল না।

রাসেলকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে ভর্তির পর একজন মাস্টারমশাই রাখা হলো। নাম মনে করতে পারছি না কিন্তু সেই মাস্টারমশাই কামাল-জামালকেও পড়িয়েছেন। সবার ধারণা ছিল রাসেল হয়তো তার কাছেই পড়বে। কিন্তু সেটা হয়নি। তখন অনেক মাস্টার রাখা হয়েছিলো কিন্তু দুই-তিনদিন পরই তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল। শুধু ব্যতিক্রম ছিলো গীতালী দাশগুপ্ত। সে সময়কার ইডেন ইন্টারমিডিয়েট গভর্নমেন্ট মহিলা কলেজের বাংলার শিক্ষক গীতালী পরীক্ষায় পাশ করলো। রাসেল ধীরে ধীরে গীতালীর ভক্ত হয়ে গেল। মুজিব মামী আশ্বস্ত হলেন যে তাঁর আদরের ছোট সন্তান অবশেষে একজন শিক্ষকের কাছে পড়তে রাজি হয়েছে।

আমার ছোটবোন শান্তা ছিল রাসেলের চেয়ে বয়সে একটু ছোট। রাসেলের পড়ার সময় শান্তাকে গীতালী একটু আদর করলেই রাসেল এটা পছন্দ করতো না। প্রায়ই রাসেল শান্তাকে ঠেলে চেয়ার থেকে সরিয়ে দিতো। প্রিয় শিক্ষকের আদরে কেউ ভাগ বসালে তা সহ্য করতে পারতো না রাসেল। আমরা কথায় কথায় ‘রাসেলের বিয়ের’ কথা বললে সে লজ্জা পেতো। একবার সে বলেছিলো বিয়ে করলে তার রিক্সা লাগবে। অন্য সব শিশুদের মতোই ছিলো সবার আদরের শেখ রাসেল।

মুক্তিযুদ্ধের সময় একটুকু বাচ্চাকে বন্দী করে রেখেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ছোট্ট একটা বাসার মধ্যে মা, ভাই-বোনদের সাথে বন্দী ছিলো রাসেল। তবে ২৭ জুলাই সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্মের পর ভাগ্নেকে কাছে পেয়ে রাসেল খুব খুশি হয়। ছোট্ট একটা শিশুকে কাছে পেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল রাসেল। সবসময় জয়ের দিকে খেয়াল রাখতো ছোট্ট রাসেল।

স্বাধীনতার পর বাবাকে কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা শেখ রাসেল সবসময় আশঙ্কায় থাকতো। কারণ তার জন্মের পর বাবাকে একনাগাড়ে কাছে পাওয়ার অভিজ্ঞতা নেই। তবে সবসময় বাড়ি ভর্তি মানুষজন। সবাই বাবার সাথে দেখা করে বাবাকে নিয়ে ব্যস্ত রাখতো। কিন্তু রাসেলের বাবা বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীন বাংলাদেশের সবার নয়নের মনি সেটা বুঝতে চাইতো না রাসেল। তার টার্গেট থাকতো কীভাবে সবসময় বাবার কাছে থাকা যায়। একারণে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঢাকার বাইরেও রাসেলকে নিয়ে যেতেন।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু চিকিৎসার জন্য সপরিবারে লন্ডনে গেলে রাসেল খুব মজা পেয়েছিলো। একইভাবে ১৯৭৩ সালে রাসেল যখন বাবার সাথে জাপান সফরে গিয়েছিলো তখন শেখ রেহানাও সফরসঙ্গী ছিলেন। বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা অন্য শিশুদের জানাতো রাসেল।

১৯৭৫ সালে শেখ কামাল ও শেখ জামালের বিয়ের সময় রাসেল খুব খুশি হয়েছিলো। বড় ভাবী সুলতানা কামাল খুকিকে খুব পছন্দ হয় রাসেলের। তাইতো বড় ভাবীর আচল ধরে থাকতো রাসেল। আর জামালের বউ রোজী তো রাসেলের ফুফাতো বোন। রাসেলের অনেক পরিচিত। রোজী আপা থেকে ভাবী হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা রাসেলের কাছে ভিন্ন রকম মনে হয়েছিল। পুরো বিয়ে বাড়িতে রাসেল দুই ভাবীর আশেপাশে ঘুরঘুর করতো।

আমি ১৫ আগষ্টের কথা চিন্তা করলেই শিউরে উঠি। এতবড় শোক বয়ে চলা বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার জন্য অত্যন্ত বেদনার। ছোট্ট রাসেলের মৃত্যুর কথা বলতেই দুই বোন আবেগ আপ্লুত হয়ে যান। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর ঘাতকেরা যখন হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছিল তখন আমাদের বাসা চারদিক থেকে সশস্ত্রভাবে ঘিরে রাখে। একসময় আমাদের ঘরে বাইরে নিয়ে আসে সেনাবাহিনীর ঘাতকেরা। গুলাগুলির অনেক পরে একটা মেয়ের গলা ভয়ে আতঙ্কে কেঁদে উঠে। আস্তে আস্তে গলার কান্নার আওয়াজ বাড়তে থাকে। তারপর দুইটি গুলির শব্দ; এরপর সবকিছু চুপ। আমি শুনেছি রাসেল যখন মায়ের কাছে যাবে বলে কান্নাকাটি করেছে তখন ঘাতক সেনারা রাসেলকে দোতলায় নিয়ে যায়। রাসেলকে দেখে দুই ভাবী জড়িয়ে ধরে। তখন তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। যখন লাশ সরানো হয় তখনও নাকি রাসেলকে খুকি ও রোজী জড়িয়ে ধরে রেখেছিল।

যে এত আহ্লাদে একটা বাচ্চা! সেই বাচ্চা মৃত্যুর আগে দেখলো বাবা-মা, ভাই-ভাবীদের লাশের সারি। রাসেলকে যখন নিচতলা থেকে দোতলা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন শিশু রাসেল নাকি নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিলো।
আমার খুব মনে হয়েছিল, রাসেল নিশ্চয়ই বেঁচে আছে। ঘাতকেরা চলে গেলে রাসেলকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসবো। ওকে নিরাপদে রাখবো। হাসিনা ও রেহানার কাছে পাঠিয়ে দিবো। কিন্তু, ঘাতকেরা শিশুহত্যার মাধ্যমে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে পৃথিবীর ইতিহাসে নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের ঘৃণ্য ইতিহাস রচনা করে।

শেখ রাসেল আমার কাছে আদুরে এক নাম; এক হতভাগা শিশুর নাম। যে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি সৈন্যরা হত্যা করতে সাহস করেনি সেই মহানায়ককে হত্যা করেছে একদল বিশ্বাসঘাতক। তাদের আমি আজীবন অভিশাপ দিয়েই যাবো।

লেখক: প্রো-ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; চেয়ারম্যান, বেগম বদরুন্নেসা আহমেদ ট্রাস্ট









Leave a reply