আর্তনাদের উর্ধ্বে মেধাবী আবরার

|

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্মম নির্যাতনে শিকার হয়ে প্রিয় ক্যাম্পাস থেকে আজ বহুদূরে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ। মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১১টায় নিজ বাসার সামনে তৃতীয় জানাজা শেষে স্থানীয় রায়ডাঙ্গা কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। আবরার হত্যায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে ১১ জনকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে ছাত্রলীগ। এদের মধ্যে গ্রেফতার আছেন ১০ জন। কিন্তু এসবে থামবে আবরারের মায়ের বিলাপ? কোনোকিছুই যে আবরারকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না মায়ের বুকে। শোকে মুহ্যমান রোকেয়া খাতুন বারবার এ কথাই বলছেন, আমার ছেলের মতো ছেলে আর কোথায় পাবো? যার কোনো শত্রু পর্যন্ত ছিল না। তাকে কেনো এভাবে মেরে ফেললো ওরা?

পারিবার ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ক্লাসে কখনও প্রথম ছাড়া কখনও দ্বিতীয় হননি আবরার। অষ্টম ও দশম শ্রেণিতেও বিশেষ বৃত্তি পেয়েছিলেন এই মেধাবী শিক্ষার্থী। ২০১৫ সালে কুষ্টিয়া জেলা স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর ভর্তি হন, নটরডেম কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে। ২০১৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষাতেও সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। এবারও গোল্ডেন জিপিএ-৫।

বংশানুক্রমিকভাবেই তারা শিক্ষাদীক্ষায় ভালো। পরিবারের বাবা-চাচারাও নানা পেশায় যুক্ত। কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বা সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক। শুধু ছিল না কোনো ডাক্তার। তাই বাবা বরকত উল্লাহ্ চেয়েছিলেন আবরার মেডিকেলে পড়ুক। মেধাবী আবরার বুয়েট-ঢাকা মেডিকেল দু’জায়গাতেই সুযোগ পেয়ে গেলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলো। কিন্তু, তার আবার আগ্রহ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। সমর্থন পেলেন ইঞ্জিনিয়ার চাচার কাছ থেকেও। পিতা-মাতাও আর ‘না’ করেননি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স বিভাগে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন তিনি। বুয়েটের শেরে-ই বাংলা হলের ১০১১ নং কক্ষের আবাসিক ছাত্র ছিলেন আবরার। ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিলেন। সামনে পরীক্ষা বলে ক্যাম্পাস খোলার আগেই ফিরে আসেন হলে। কে জানতো দু’দিন পরেই আবার বাড়ি ফিরতে হবে লাশ হয়ে!

মা রোকেয়া খাতুন বলেন, রোববার সকালে আমি তাকে নিজে ঘুম থেকে ডেকে তুলি। সে ঢাকায় রওনা দেয়। মাঝে তিন থেকে চারবার ছেলের সঙ্গে আমার মুঠোফোনে কথা হয়। বিকেল ৫টায় হলে পৌঁছে ছেলে আমাকে ফোন দেয়। এরপর আর কথা হয়নি। রাতে অনেকবার ফোন দিয়েছিলাম, ও আর ফোন ধরেনি।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন তিনি।

ফাহাদের ছোটভাই আবরার ফাইয়াজ জানান, ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ভাইয়ার এক বন্ধু বুয়েট থেকে প্রথমে ফোন দিয়ে বলেন, সে মারাত্মক অসুস্থ। ঢাকায় আমাদের যে আত্মীয় স্বজন আছে তাদের মেডিকেলে পাঠাতে বলেন। কিছুক্ষণ পর আবার ফোন দিয়ে জানালেন, ভাইয়া আর নেই।

আবরারের চাচা মিজানুর রহমান আফসোস করে বলেন, আবরারকে শিবিরের কর্মী বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। অথচ ও একজন উদারমনা ছেলে। আমরা গোটা পরিবার আওয়ামী লীগের সমর্থক। তবে, আবরার ধর্মভীরু ছিল। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং পবিত্র কোরআন শরীফ পড়ত। মাঝেমাঝে তাবলিগে যেত।

ছেলের লাশের ভার বইবার শোক সামলাতে হয়েছে যে বাবার, অশ্রুসিক্ত নয়নে জানালেন, এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। যে ছেলেটা বিকেল ৫টায় ঢাকায় পৌঁছাল, তাকে ৮টার দিকে নির্যাতন করার জন্য ডেকে নিয়ে গেল। ছয় ঘণ্টা ধরে নির্যাতন চালাল, আমি অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

শাস্তি হয়তো হবে। হয়তো কারো মনঃপূত হবে কিংবা হবে না। কিন্তু, এভাবে সন্তান হারিয়ে মা-বাবার হৃদয়ে যে চিরস্থায়ী ক্ষত তৈরি হলো তার কী প্রতিকার?





সম্পর্কিত আরও পড়ুন





Leave a reply