থামছে না সড়কে দুর্ঘটনা: রাস্তায় ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া চালক

|

কোনোভাবেই থামছে না সড়কে দুর্ঘটনা। প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীসহ সারা দেশের সড়কে ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা। এতে দীর্ঘ হচ্ছে ‘মৃত্যুর মিছিল’। পাশাপাশি দুর্ঘটনায় আহতরা পঙ্গুত্ববরণ করে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।

দুর্ঘটনা রোধে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা সুপারিশ, আইন প্রণয়নসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার পরও বেপরোয়া চালক ও গাড়িকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তাদের কাছে যেন জিম্মি সাধারণ যাত্রী।

শুধু যাত্রীই নন, তাদের এ ‘আগ্রাসী থাবা’ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না পথচারীও। দুর্ঘটনার এক-তৃতীয়াংশের শিকার পথচারী। ফুটপাতে গাড়ি উঠিয়ে দিয়ে প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে এ যন্ত্রদানব।

বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (এআরআই) গবেষণায় দেখা গেছে, সড়কে দুর্ঘটনার জন্য বেশি দায়ী বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো। সেই সঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ (ফিটনেসবিহীন) যানবাহনও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

৫২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোয়। আর চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে ঘটে ৩৫ শতাংশ। দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন পথচারী। মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৪-৩৮ শতাংশ (এক-তৃতীয়াংশ) পর্যন্ত ঘটছে পথচারীদের ওপর।

দুর্ঘটনার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী বাস ও ট্রাক। দেশের মোট দুর্ঘটনার ৪৫ শতাংশ ঘটছে এসব বড় যানবাহনের জন্য। এছাড়া পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা জোরদারকরণ ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটির প্রতিবেদনেও বেপরোয়া গতি ও অদক্ষ চালক এবং ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনকে দুর্ঘটনার জন্য অন্যতম দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অপরদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সূত্রমতে, ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৩৬৯টি। শুধু ঢাকা শহরে রয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩০৮টি। আর নিবন্ধিত গাড়ির চেয়ে অন্তত চালকের সংখ্যা কম রয়েছে।

দেশে বর্তমানে ৪১ লাখ গাড়ি রয়েছে। চালক রয়েছেন প্রায় ৩২ লাখ। এ হিসাবে লাইসেন্সবিহীন ৯ লাখ চালকের হাতে রয়েছে গাড়ির স্টিয়ারিং। পরিবহনসংশ্লিষ্টরা জানান, সড়কে বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনা হলেও দৃষ্টান্তমূলক সাজার ঘটনা খুবই কম।

এছাড়া পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের শক্তিশালী সংগঠন রয়েছে। এসব সংগঠনের আশীর্বাদে অধিকাংশ পরিবহন শ্রমিক বেপরোয়া আচরণ করে।

এ বিষয়ে অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. মাহবুল আলম তালুকদার বলেন, আমরা বিভিন্ন দুর্ঘটনা গবেষণা করে দেখেছি, সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান ও মূল কারণ হচ্ছে বেপরোয়া মনোভাব ও অতিরিক্ত গতি।

ধারণা করা হয়, এ দুটি কারণে ৮৫-৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া ফিটনেসবিহীন গাড়ির জন্যও দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ঈদের পরপরই ফাঁকা রাস্তায় বেশি গতিতে গাড়ি চলে।

ওই সময়ে অনেক আনফিট গাড়িও দূরপাল্লার সড়কে চলাচল করে। এ কারণে ঈদের আগের চেয়ে পরে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রাণহানির সংখ্যাও বেশি ছিল।

ড. মাহবুল আলম তালুকদার মনে করেন, রাস্তায় না ধরে টার্মিনালে নজরদারি বাড়ানো দরকার। টার্মিনাল থেকেই আনফিট গাড়ি বন্ধ করা গেলে সেগুলো রাস্তায় নামতে পারত না, লাইসেন্সবিহীন চালকের হাতে স্টিয়ারিং উঠত না।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো সঠিক দায়িত্ব পালন করলে এগুলো সমাধান করা যায়। তিনি বলেন, পরিবহন সেক্টর অরাজকতার মধ্যে রয়েছে। কেউ কাউকে তোয়াক্কা করে না। সবাই নিজের মতো নিজে চলতে চায়। এখন পর্যন্ত ডিসিপ্লিনে আসেনি।

ফলে সড়কে অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে। সিরিয়াসলি কেউ মনিটরিং করে না। সর্বশেষ রাজধানীতে মঙ্গলবার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক কৃষ্ণা রানী রায়ের ওপর উঠে যায় ট্রাস্ট পরিবহনের একটি বাস।

এতে ওই নারীর একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেলেন এ নারী। এর আগে মার্চে রাজধানীর প্রগতি সরণিতে রাস্তা পার হওয়ার সময় সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালের (বিইউপি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী মারা যান।

ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই ওই বাস চালাচ্ছিল চালক সিরাজুল ইসলাম। মোটরসাইকেল চালানোর লাইসেন্স দিয়ে বাস চালিয়েছিল ওই চালক। এর আগে গত বছরের ৩ এপ্রিল কারওয়ান বাজারে দুই বাসের চালকের রেষারেষিতে পড়ে হাত বিচ্ছিন্ন হয় তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজিব হোসেনের।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ এপ্রিল মারা যান রাজিব। গত বছরের ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের দুটি বাসের রেষারেষিতে একটির চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়।

এ ঘটনার পর বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ওই কলেজের শিক্ষার্থীরা। নিরাপদ সড়কের দাবিতে তারা রাস্তায় নেমে আসে। এসব দুর্ঘটনা ঘটে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও অদক্ষতার কারণে।

সড়কে আনফিট গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন চালকের বিরুদ্ধে বিআরটিএর পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. মশিয়ার রহমান বলেন, আমরা রাজধানীকে ৫টি জোনে ভাগ করে ম্যাজিস্ট্রেটদের দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছি।

তারা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন। আনফিট গাড়ি ও ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কাউকে গাড়ি চালাতে পাওয়া গেলে জেল-জরিমানা করা হচ্ছে।

অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের ২০১৮ সালের সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ওই বছর সারা দেশে ৩ হাজার ৫১৩টি দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ৭৬ জন মারা গেছেন এবং আহত হয়েছেন ৮ হাজার ৭১৫ জন।

ওই বছর দুর্ঘটনার ৩৪ শতাংশ ঘটে পথচারীদের ওপর। এছাড়া পেছন থেকে ধাক্কা দেয়ার ঘটনায় ২২ শতাংশ, নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে ১৫ শতাংশ, মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে ৯ শতাংশ।

বাকিগুলো অন্যান্য কারণে ঘটে। ওইসব দুর্ঘটনার ২৩ শতাংশে বাস ও ২২ শতাংশে ট্রাক জড়িত। এছাড়া মোটরসাইকেলের কারণে ১৯ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, বিআরটিএতে নিবন্ধিত গাড়ি রয়েছে প্রায় ৪১ লাখ সাত হাজার। অপরদিকে চালক রয়েছে প্রায় ৩২ লাখ। এর মধ্যে পেশাদার চালক রয়েছে মাত্র ১২ লাখ। মোটরসাইকেল বা হালকা যান চালানোর চালক রয়েছেন ১১ লাখ।

বর্তমানে ভারি যানবাহনের মধ্যে বাস, কার্গো ভ্যান, কাভার্ড ভ্যান, বিশেষ কাজে ব্যবহৃত গাড়ি, ট্যাংকার ও ট্রাক রয়েছে আড়াই লাখের বেশি। এসবের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার।

একইভাবে অন্য ধরনের গাড়ির চালকের অভাব রয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সহ-সভাপতি মো. আবুল কালাম বলেন, লাইসেন্সবিহীন চালকের হাতে গাড়ি দিলে যেমন দুর্ঘটনা ঘটে, তেমনি ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামলে দুর্ঘটনা ঘটবে।

আমরা মালিকদের এ বিষয়ে সতর্ক করেছি। তাদের কারণে দুর্ঘটনা হলে আমরা দায় নেব না। তিনি বলেন, যে কোনো দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালক ও মালিক দায়ী নয়, অনেক কারণ রয়েছে। রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো না।

ধারণক্ষমতার বেশি গাড়ি চলে। একই সড়কে দ্রুতগতির গাড়ির পাশাপাশি ইজিবাইক, সিএনজি, অটোরিকশার মতো ধীরগতির গাড়িও চলে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না।

সূত্র: যুগান্তর









Leave a reply