বন্ড সুবিধার অপব্যবহার: দুই প্রতিষ্ঠানের ১০২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটন
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪২ পিএম
রফতানিমুখী দুই পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেড ও লিশা টেক্স (প্রা.) লিমিটেডের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে ১০২ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)। শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা কাপড় অবৈধভাবে কারখানা থেকে সরিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি, কম মূল্যে রপ্তানি দেখানো এবং মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ফাঁকিসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান দুটি এই রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) এনবিআরের সিআইসির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। পৃথক অনুসন্ধানে রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকা এবং লিশা টেক্সের বিরুদ্ধে ৭ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটন করা হয়েছে।
সিআইসি জানিয়েছে, দুই প্রতিষ্ঠানের কারখানায় সরেজমিন পরিদর্শন করে কাঁচামালের মজুদ যাচাই করা হয়েছে। পাশাপাশি আমদানি ও রফতানির তথ্যের সঙ্গে বাস্তব মজুদের হিসাব মিলিয়ে দেখা হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্যও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
রিয়াজ নিটওয়্যারে ৯৪ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি
সিআইসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেড ৪১টি ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনের (ইউডি) আওতায় বন্ড সুবিধায় মোট ২ হাজার ৮৬২ টন ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় আমদানি করে। এর মধ্যে প্রায় ৭৮ শতাংশ বা ২ হাজার ২৩৭ টন কাপড় কারখানার গুদামে পাওয়া যায়নি। রফতানির হিসাবেও এসব কাপড়ের কোনো তথ্য মেলেনি। সিআইসির ধারণা, বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে কাপড়গুলো অবৈধভাবে সরিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, সুতা ও নিট কাপড়ের হিসাব রফতানির তথ্যের সঙ্গে মিললেও ওভেন পলিয়েস্টার কাপড়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। যেসব ৩১টি ইউডির বিপরীতে কোনো রফতানি হয়নি, সেগুলোর মধ্যে ৩০টিতে আমদানি করা পুরো কাপড়ই অবৈধভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে, আংশিক রফতানি হওয়া ১০টি এন্ট্রিতেও আমদানি করা কাপড়ের প্রায় ৫৩ শতাংশের হিসাব পাওয়া যায়নি।
কারখানার পুরো প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করে সিআইসির দল ৬৯ হাজার ৩৮২ কেজি সুতা, ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯৭ পিস তৈরি পোশাক এবং মাত্র ২৫ হাজার ৫৩৩ দশমিক ৫০ কেজি ওভেন পলিয়েস্টার কাপড়ের মজুদ পায়। অর্থাৎ আমদানি করা মোট ওভেন পলিয়েস্টার কাপড়ের মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ গুদামে ছিল।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধির দেওয়া লিখিত বক্তব্যের সঙ্গেও আমদানির তথ্যে অসংগতি পাওয়া গেছে। প্রতিনিধি জানান, গত এক মাসে এ ধরনের কাপড় দিয়ে কোনো পোশাক উৎপাদন বা রফতানি করা হয়নি। অথচ বিল অব এন্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই সংশ্লিষ্ট ইউডিগুলোর বিপরীতে প্রায় ৩৯০ টন কাপড় আমদানি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ৪১টি ইউডির আওতায় আমদানি করা মোট কাপড়ের প্রায় ৮২ শতাংশই ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবরের শুরুর মধ্যে আনা হয়েছে।
সিআইসির হিসাবে, অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ১৩৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি উদ্ঘাটন করা হয়েছে।
লিশা টেক্সে কাপড় সরানো, কম মূল্যে রফতানি ও মূসক ফাঁকি
লিশা টেক্স (প্রা.) লিমিটেডের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার কেজি পলিয়েস্টার কাপড় কারখানায় না পাওয়ার তথ্য জানিয়েছে সিআইসি। সংস্থাটির অনুসন্ধান অনুযায়ী, বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে এসব কাপড় অবৈধভাবে সরিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়েছে। শুধু এ খাতেই প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কম মূল্যে রফতানি দেখানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। অনুমোদনের তুলনায় বেশি পোশাক রফতানি করলেও রফতানিমূল্য দেখানো হয়েছে চুক্তিমূল্যের চেয়ে কম।
এ ছাড়া ইউডির বাইরে স্থানীয় ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং বাধ্যতামূলক ২০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত পূরণ না করার তথ্য পেয়েছে সিআইসি।
মূসক ফাঁকির ক্ষেত্রেও একাধিক অনিয়ম ধরা পড়েছে। চার লাখের বেশি পিস পোশাকের আনুষঙ্গিক কাঁচামাল প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই স্থানীয় বাজার থেকে কেনা হয়েছে, যার বিপরীতে মূসক দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি লাইসেন্সবিহীন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকার কিট ব্যাগ সরবরাহের মাধ্যমে মূসক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
এসব অনিয়মের মাধ্যমে লিশা টেক্সের বিরুদ্ধে মোট ৭ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে সিআইসি।
বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে এ ধরনের অভিযান ও অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল।
/এনএ