ঢাকার পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ৩২ রুটে ৩২ কোম্পানির বাস, থামবে কি অসুস্থ প্রতিযোগিতা?
তাজনুর ইসলাম
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৫ এএম
রাজধানী ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা কখন ফিরবে তা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। বিগত কয়েকটি সরকারই গণপরিবহন, বিশেষ করে বাস চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে নানা উদ্যোগ নেয়। কিন্তু, কোনটিই সফলতার মুখ দেখেনি। বর্তমান সরকার নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে, বাস রুট ঢেলে সাজানোর। এই পরিকল্পনায় ৩২টি রুটে আলাদা করে ৩২টি কোম্পানির বাস চলাচল করবে। এবার কি তাহলে সড়কে বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা থামবে? বাঁচবে মানুষের প্রাণ?
ঢাকার রাস্তায় চলাচলে সবচেয়ে বড় ভোগান্তি যানজট। যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ অপরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থা; যার মূলে রয়েছে বাস।
রুট পুনর্বিন্যাস করে বাস চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরানোর নানা উদ্যোগ অতীতেও দেখা গেছে। ছয় বছর আলোচনার পর ২০২১ সালে শুরু হয়েছিল রুট রেশনালাইজেশন। অল্প দিনেই তা মুখ থুবড়ে পড়ে। তৎকালীন সরকার ঢাকঢোল পিটিয়ে 'ঢাকা নগর পরিবহন'-এর যাত্রা শুরু করলেও সমন্বয়ের অভাবে তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। নগর পরিবহনের রুট সুনির্দিষ্ট করে দিলেও বন্ধ করা যায়নি অন্য কোম্পানির বাস চলাচল। ফলে প্রতিযোগিতার দৌড়ে ছিটকে পড়ে উদ্যোগটি। ঢাকার বাস চালকদের অভিযোগ, সময়সীমার বাধার কারণে যাত্রীদের ঠিকমতো সার্ভিস দেওয়া যায়নি এবং যানজটের কারণে পর্যাপ্ত লাভ তোলাও সম্ভব হয়নি।
এক বাসের সাথে আরেক বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা ঢাকার নিত্যকার চিত্র। এর ফলে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে এবং প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। যাত্রীরা জানান, রাস্তায় বাসের ধাক্কাধাক্কি ও বেপরোয়া ওভারটেকিং মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়, সৃষ্টি করে তীব্র যানজট। এছাড়া ভাঙা সিট, সংকীর্ণ জায়গা ও নোংরা পরিবেশের কারণে নগরযাত্রা হয়ে উঠেছে চরম ভোগান্তির।
তবে চালক ও সহকারীদের যুক্তি ভিন্ন। তাদের কাছে বেশি আয়ই মূল কথা। তাদের দাবি, বাড়াবাড়ির মূল কারণ চুক্তিভিত্তিক বাস চলাচল। সারাদিন বাস চালানোর জন্য মালিককে দিতে হয় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। পাশাপাশি জ্বালানি, লাইনম্যানের চাঁদা ও রাস্তায় ট্রাফিক সার্জেন্টের জরিমানার খরচও তাদের বহন করতে হয়। এ ছাড়া বাসের সহকারীরা জানান, যানজটে পড়ে খরচ মিটিয়ে অনেক সময় খালি পকেটেই বাড়ি ফিরতে হয়।
এমন বাস্তবতায় রাজধানীর বাস ব্যবস্থায় নতুন কাঠামো আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকার বাস রুটগুলো পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি রুটে ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতে চলবে বাস। অর্থাৎ, একটি রুট পরিচালনা করবে একটি নির্ধারিত কোম্পানি। সুনির্দিষ্ট থাকবে বাসের সংখ্যা, স্টপেজ, ই-টিকিটিং ও জিপিএস ট্র্যাকিং। চালক ও সহকারীদের দৈনিক ট্রিপের পরিবর্তে মাসিক বেতনের আওতায় আনার কথা বলা হচ্ছে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক মসিউর রহমান বলেন, যত্রতত্র থামানো যাবে না এ গাড়িগুলো। এই গাড়িগুলো স্টপেজে থামবে, স্টপেজ থেকে লোক নিবে, আবার স্টপেজে চলে আসবে। তাতে অন্তত একটু শৃঙ্খলায় ফিরে আসবে। পার্সন পার ট্রিপের অ্যানালাইসিস আমাদের করা আছে, যাতে কারও লোকসান না হয়।
'এক রুট, এক কোম্পানি' উদ্যোগের আওতায় ইতোমধ্যে ৬টি রুট চূড়ান্ত হয়েছে। পাশাপাশি ৫টি চক্রাকার রুট চালুর বিষয়েও আশাবাদী কর্তৃপক্ষ। ১৮ অক্টোবর থেকে চূড়ান্ত ৬ রুটের যেকোনো দুটিতে পরীক্ষামূলকভাবে এ সেবা চালু করতে সম্মত হয়েছেন বাস মালিকরা।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, ব্যবসা মানেই লাভ-লোকসানের ঝুঁকি থাকবে এবং সেটা মালিককেই নিতে হবে। এটা চালকের ওপর চাপিয়ে দিয়ে কন্ট্যাক্ট বেসিসে ব্যবসা করা যাবে না। কোম্পানিগুলিকেও দায়িত্ব নিতে হবে। প্রত্যেকটা গাড়ির মালিককে কোম্পানির সাথে একটা এমওইউ সাইন করতে হবে।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, যারা এখন পরিবহনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যারা মালিক আছেন, তারাই যদি বিনিয়োগটা করতে পারেন, তাহলে এটা টেকসই হবে। সরকার বিনিয়োগ করে বাস নামিয়ে চালানোটা এই ইকোসিস্টেমের মধ্যে অনেক চ্যালেঞ্জিং। মালিকরা যে বিনিয়োগ করবেন, সেজন্য তাদেরকে ইনসেনটিভ দিতে হবে এবং আত্মবিশ্বাসী করতে হবে যে তারা প্রফিটে থাকবেন।
রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে অতীতে নেওয়া নানা উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি। তবে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের এই নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সবাই; এখন দেখার বিষয় বাস্তবে এটি কতটা কার্যকর হয়।
/এনএ