×
Logo

জাতীয়

অত্যাবশ্যকীয় ১১৭ ওষুধের বেশিরভাগই বাজারে মিলছে না, তদারকির তাগিদ

রাসেল আহমেদ

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩১ এএম

অত্যাবশ্যকীয় ১১৭ ওষুধের বেশিরভাগই বাজারে মিলছে না, তদারকির তাগিদ

অত্যাবশ্যকীয় ১১৭টি ওষুধের বেশিরভাগই এখন বাজারে মিলছে না। প্রযুক্তির উন্নয়নে কোনো কোনো ওষুধের চাহিদা কমেছে, আবার মূল্য সমন্বয় না করায় উৎপাদন বন্ধ হয়েছে কিছু ওষুধের। দিনশেষে নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে উচ্চমূল্যে ওষুধ কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গবেষণার আলোকে ওষুধের বাজারে তদারকি জোরদার করা জরুরি।

পা ব্যথা নিয়ে রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন রিকশাচালক আমির আলী। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বিনামূল্যে কিছু ভিটামিনের ওষুধ পেলেও মেলেনি ব্যথার ওষুধটি।

একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা গাড়িচালক মেহেদী বিনামূল্যে কোনো ওষুধই পাননি। বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা খরচ হবে—এ কথা ভাবতেই চিন্তার ভাঁজ তার চোখে-মুখে।

রিকশাচালক আমির আলী বলেন, সব ওষুধই দিয়েছে। তবে দুইটা ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হবে। বাইরে ওষুধ কিনতে গেলে আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা লাগে।

গাড়িচালক মেহেদী বলেন, এগুলো যদি পেতাম, অনেক সুবিধা হতো। বাইরে থেকে দুই-তিন হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হতো। আমাদের ড্রাইভারদের এমনিতেই অনেক সমস্যা চলছে, কষ্টে আছি।

সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে ১৯৯৪ সালে ১১৭টি ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে দেয় সরকার। তবে সময়ের সঙ্গে আধুনিক হয়েছে ওষুধ প্রযুক্তি, বাজারে এসেছে বিভিন্ন নতুন ভ্যারিয়েন্ট। ফলে তালিকায় থাকা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা ব্যথার ওষুধ এখন বাজারে নেই বললেই চলে।

রাজধানীর একজন ওষুধের দোকান ব্যবসায়ী বলেন, এগুলো এখন পাওয়া যায় না। আমাদের কাছে নিফেডিপিন আছে, কিন্তু অন্যগুলো নেই। তারা বলছে, আপাতত কাঁচামালের সংকট আছে। পরে আবার আসবে।

আবার কোনো কোনো ওষুধের কাঁচামালের দাম বাড়লেও মূল্য হালনাগাদ করেনি সরকার। ফলে উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজারমূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় বাধ্য হয়ে কিছু ওষুধের উৎপাদন বন্ধ করেছে কোম্পানিগুলো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রতি দুই বছর পরপর ওষুধের দাম সমন্বয় করার কথা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ওষুধ তৈরির খরচ বেড়েছে, অথচ দাম বাড়ানো হয়নি। এতে কোম্পানিগুলো পুরোনো প্রয়োজনীয় ওষুধের পাশাপাশি নতুন ওষুধ বাজারে আনছে, যেগুলোর দাম তুলনামূলক অনেক বেশি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, পুরোনো এসব ওষুধ তৈরির প্রযুক্তি এখন অনেকটাই সেকেলে। এরই মধ্যে বাজারে এসেছে আরও আধুনিক ওষুধ। আবার ১৯৯৪ সালে নির্ধারণ করা দামও কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে বর্তমান দামের তুলনায় বেশি। কারণ এখন অনেক ওষুধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়, এতে মানুষের শ্রম কম লাগে। ফলে উৎপাদন খরচও আগের তুলনায় কমেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নীতিমতে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকা উচিত। সংস্থাটির তালিকায় ৫০০-র বেশি ওষুধকে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২৯৫টি ওষুধের দাম নির্ধারণের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। যদিও পরে বিএনপি সরকার সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়।

অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল বলেন, অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ওষুধের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা বেশি জরুরি। কারণ দাম বেশি হলে অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে পারবে না।

তিনি আরও বলেন, আবার দাম খুব কম হলে কোম্পানিগুলো ওষুধ উৎপাদনে আগ্রহ হারাবে। এতে শেষ পর্যন্ত রোগীরাই ওষুধের সংকটে পড়বেন। তাই ওষুধের দাম নির্ধারণে মানুষের সামর্থ্য ও উৎপাদন খরচ—দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। কিন্তু অনেক সময় আমরা শুধু একটি দিক বিবেচনা করি।

ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, একজন মানুষের নিজের পকেট থেকে যে চিকিৎসা খরচ হয়, তার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ওষুধ কেনা ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় চলে যায়। এই খরচ কমাতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, মেধাস্বত্ব আইন কার্যকর হওয়ার পরও যদি ওষুধ কোম্পানিগুলো বেশি লাভের আশায় দাম বাড়াতে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়বে। পরিস্থিতি এমন হলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রও বহুজাতিক কোম্পানির মাধ্যমে বাংলাদেশে কম দামে ওষুধ সরবরাহের উদ্যোগ নিতে পারে।

মাসে মাথাপিছু গড় আয় ৩০ হাজার টাকার বেশি হলেও এই হিসাবের মধ্যে নিম্নআয়ের বড় একটি জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা প্রতিফলিত হয় না। তাই সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ওষুধের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা এবং বাজারে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

/এসআইএন


Logo