বিএনপি সরকারের ৬ মাসে প্রশাসনে কতটা দলীয়করণ, কতটা স্বচ্ছতা?
আলমগীর স্বপন
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫০ এএম
বিএনপি সরকারের ক্ষমতার ছয় মাসে প্রশাসনে কতটা শৃঙ্খলা ফিরেছে? কমেছে কী দলীয়করণ? মুল্যায়ন হচ্ছে কি যোগ্য ও পেশাদারদের? নাকি গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলের মতোই দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব আমলে না নিয়ে বেড়েছে দলীয় নিয়োগ?
বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের প্রশাসনে দলীয়করণের নজীর খুব কমই আছে বিশ্বে। যে দলই ক্ষমতায় আসে, সেই সরকার অনেকক্ষেত্রে দক্ষতার চেয়ে নিয়োগে গুরুত্ব দেয় দলীয় মতাদর্শের কর্মকর্তাদের।
সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, গত ২০ থেকে ২৫ বছরে, আমলাতন্ত্র ৩টি ভাগে ভাগ হয়েছে: আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের নিয়োগ দেওয়ার কারণে ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, রাষ্ট্র ভেতর থেকে দুর্বল হতে থাকে।
সরকার গঠনের পর প্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিএনপি এই শিক্ষা কতটা গ্রহণ করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। গণঅভ্যূাত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে প্রশাসনে চরম দলীয়করণ হয়েছে। এর থেকে বের হতে অন্তবর্তী সরকার জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করেছিলো।
কিন্তু নিয়োগ-পদোন্নতির ক্ষেত্রে দক্ষতা ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে সেই কমিশনের সুপারিশ মানেনি তৎকালীন অন্তবতী সরকারও। দীর্ঘদিন অবসরে থাকা জামায়াত ও বিএনপি ঘরানার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে ফিরিয়ে এনে গুরুত্বপূর্ণ সব মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা বিএনপিও রক্ষা করছে।
বর্তমানে সচিব ও সচিব পদ মর্যাদার ৭৯ জনের মধ্যে ২৩ জনই চুক্তিভিত্তিক, দলীয় মতাদর্শের। আবার ভিন্ন মতাদর্শের কারনে জ্যেষ্ঠ সচিব, সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদের ৭০-এর বেশি কর্মকর্তা ওএসডি, অর্থাৎ কর্মহীন হয়ে আছেন।
প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, যাদের কারণে ফ্যাসিবাদী সরকার এত শক্ত খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, যারা বারবার গণমানুষের অধিকার লুণ্ঠন করেছে, সেই ধরনের মানুষদের ছাঁটাই করা হবে—এটাই তো জনগণের আকাঙ্ক্ষা।
সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদারও মনে করেন, বঞ্চিতদের মাঝে যারা ভালো, তাদেরকে যেমন কাজে লাগাতে হবে, ঠিক তেমনি, আগের আমলে যারা ভালো ছিলেন, তাদেরকেও কাজে লাগাতে হবে। তাহলে সরকার ভালোভাবে চলতে পারবে।
সম্প্রতি ১২ অধিদফতর ও করপোরেশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় পদধারীদের নিয়োগ দিয়েছে সরকার। যারা দল থেকেও পদত্যাগ করেননি। এক্ষেত্রে অবশ্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া জণপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যায়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম মনে করেন, দলীয়ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত যারা হলেন, তারা আসলে বস্তুনিষ্ঠভাবে জনগণকে সেবা দিতে পারবেন, এটা আশা করা খুবই কঠিন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ১৮২৯ সালে, প্রেসিডেন্ট এন্ড্রু জ্যাকসনের আমলে গৃহীত নীতি অনুযায়ী, যখন যে দল সরকার পরিচালনা করবে, প্রশাসনে থাকবে তাদের দলীয় কর্মকর্তা। তবে ১৮৮৩ ও ১৯৭৮ সালে দুই দফা সংশোধনীর মাধ্যমে এই অবস্থান থেকে সরে আসে মার্কিন সরকার।
জিমি কার্টারের আমলে, প্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৬৫ ভাগ মেধা ও ৩৫ ভাগ দলীয় নিয়োগের বিধান করে দেশটি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনরা এই উদাহরণ দিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক্ষেত্রে দুই দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের অন্য আরেকটি মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সততা ও স্বচ্ছতার যে কাঠামো, সেটি সেখানে ভেঙে যায়নি। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এগুলো হয়।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা দলীয় নিয়োগ-দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে হলে সমস্যা দেখেন না। তারা বলছেন, সংকট অদক্ষতায়-অনিয়মে।
অধ্যাপক কাজী মারুফুল বলেন, যে দলটিই ক্ষমতায় আসে, তারা তাদের সমর্থক কর্মকর্তা-কর্মচারী খোঁজার চেষ্টা করেন। তবে এই কৌশলে শেষ পর্যন্ত ওই দলের কিংবা সরকারের কোন লাভ হয় না।
প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মাহদী আমিন মনে করেন, সামনের দিনগুলোতে তাদের পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করা হবে। তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দাবি করেন, প্রশাসন আগের চেয়ে 'নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে'। সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পাচ্ছে 'না'।
/এআই