রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ পরিচয় দিয়ে মিয়ানমার ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করছে: ইউসিআর
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫২ এএম
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিবৃতিকে ‘বিভ্রান্তিকর’ আখ্যা দিয়ে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গাদের সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর)।
সোমবার (১৭ জুলাই) দেওয়া এক বিবৃতিতে সংগঠনটি রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয়, ২০১৭ সালের সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে মিয়ানমারের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে।
ইউসিআর বলেছে, মিয়ানমারের দেওয়া বিবৃতিটি ইতিহাস বিকৃত করার, রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত অপরাধগুলোকে আড়াল করার এবং জবাবদিহির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বানকে এড়িয়ে যাওয়ার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যের একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং সেখানে তাদের দীর্ঘদিনের ইতিহাস ও সংস্কৃতি রয়েছে দাবি করে সংস্থাটি বলেছে, পরিচয় অস্বীকারই রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের অন্যতম প্রধান কারণ।
২০১৭ সালের সামরিক অভিযানকে মিয়ানমার ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ হিসেবে তুলে ধরলেও ইউসিআর একে রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির দাবি, ওই অভিযানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
আরসার বিচ্ছিন্ন হামলাকে এসব কর্মকাণ্ডের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
মিয়ানমারের দেওয়া তথ্যের সমালোচনা করে ইউসিআর বলেছে, ২০১৭ সালে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে ১৯৯১-৯২ সালে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিলিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা বর্তমানে ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। রাখাইন রাজ্যে থাকা প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গাও বিভিন্ন বিধিনিষেধের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ‘যাচাইকরণ’ প্রক্রিয়াকেও প্রত্যাখ্যান করেছে ইউসিআর। সংস্থাটির অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অনেক রোহিঙ্গাকে ‘অযাচাইযোগ্য’ বা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রত্যাবাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
প্রত্যাবাসনের যাচাইকরণ প্রক্রিয়া জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে পরিচালনার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সমস্যা হিসেবে না দেখে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে ইউসিআর। সংস্থাটির মতে, রাখাইন রাজ্যে অবস্থান করলে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নিরাপত্তা, নাগরিকত্বের আইনি নিশ্চয়তা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর তত্ত্বাবধান ছাড়া রোহিঙ্গারা নিজ ভূমিতে ফিরবে না বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে ইউসিআর মিয়ানমারকে ‘অপপ্রচার’ বন্ধ করে বাস্তবতা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার, পূর্ণ নাগরিকত্ব ও নিজ ভূমিতে ফেরার অধিকার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১৫ আগস্ট রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আবারও ‘বাঙালি’ দাবি করে নতুন একটি বিবৃতি দেয় মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ব্যক্তিদেরই ফেরত নেওয়া হবে বলে এতে বলা হয়েছে। মিয়ানমারের দেওয়া ওই বিবৃতিতে রাখাইন রাজ্যের ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে’ বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা তিন লাখের কিছু বেশি ‘বাস্তুচ্যুত’ মানুষকে ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছুক হওয়ার কথা যেমন বলা হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া তালিকায় যে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে- তা নিয়ে আপত্তিও জানিয়েছে দেশটি।
এছাড়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে মিয়ানমার দাবি করেছে, যে জাতিগত নামে (রোহিঙ্গা) তাদেরকে পরিচয় করানো হচ্ছে সেই নামে কোনো গোষ্ঠী দেশটিতে নেই।
/এসআর