×
Logo

জাতীয়

ক্যানভাসে দ্রোহের আগুন: জুলাইয়ের গ্রাফিতি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম

ক্যানভাসে দ্রোহের আগুন: জুলাইয়ের গ্রাফিতি

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে এক দফায় রূপ নেওয়া চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রযন্ত্রের বুলেট আর ব্ল্যাকআউটের বিপরীতে রাজপথে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছিল শিল্পের ক্ষমতা। রাষ্ট্র যখন রাজপথের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে চেয়েছিল, ইন্টারনেট বন্ধ করে গোটা দেশকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিল, তখন দেয়ালের ক্যানভাস, হিপ-হপ মিউজিক, আর ধারালো লেখাগুলো হয়ে উঠেছিল শোষণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধের গান। তরুণ প্রজন্মের এই শিল্পকলা শুধু নান্দনিক রূপ ছিল না, তা সাধারণ মানুষের বুকে ভয় ভাঙার মন্ত্র ফুঁকে দিয়েছিল।

দেয়ালই যখন জনগণের মুক্ত সংবাদপত্র

স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু আর সেন্সরশিপ যখন মূলধারার গণমাধ্যমের ঠুটি চেপে ধরেছিল, তখন শহরের প্রতিটি শেওলা জমা দেয়াল, মেট্রোরেলের পিলার আর ফ্লাইওভার হয়ে উঠেছিল বিকল্প গণমাধ্যম। রং-তুলি হাতে রাতের আঁধারে এবং রাজপথের উত্তপ্ত দুপুরে নেমে এসেছিল তরুণ-তরুণীরা। 

রংপুরের বুলেটের সামনে দু’হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া শহীদ আবু সাঈদের বীরত্ব ফুটে উঠেছিল দেয়ালে দেয়ালে। 'বিকল্প কে? তুমি, আমি, আমরা', 'আমার ভাইকে মারলি কেন?', 'পানি লাগবে পানি?', 'স্বৈরাচারের পতন চাই'— এই লেখাগুলো কেবল রং-তুলির আঁচড় ছিল না, এগুলো ছিল দীর্ঘ ১৫ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ। সাধারণ পথচারী থেকে শুরু করে রিকশাচালক—প্রতিটি মানুষ দেয়ালের এই ভাষা পড়ে বুঝতে পেরেছিলেন এই লড়াই সবার। বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণদের এই ক্যানভাস ভয় শব্দটাকে দেশ থেকে মুছে দিয়েছিল।

বিদ্রোহের নতুন ব্যাকরণ: স্বাধীন গান ও হিপ-হপ র‍্যাপ মিউজিক

জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে অভাবনীয় সাংস্কৃতিক সংযোজন ছিল তরুণদের স্বাধীন গান ও হিপ-হপ র‍্যাপ মিউজিক। এতদিন ধরে রাজনৈতিক আন্দোলনে ঐতিহ্যবাহী গণসঙ্গীতের যে ধারা ছিল, জেন-জি তার সাথে যুক্ত করে নতুন সুরের বারুদ।

হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেওয়া গান 'আওয়াজ ওঠা' নিয়ে রাজপথে আগুন জ্বালান র‍্যাপার হান্নান। তার গানের প্রতিটি পংক্তি—“আওয়াজ ওঠা, কথা কো”—লাখো তরুণের জাতীয় স্লোগানে পরিণত হয়। গান গাওয়ার অপরাধে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও সুরকে শিকল পরাতে পারেনি রাষ্ট্র। একইসাথে শেজানের 'কথা কো', কিংবা সায়ান, কৃষ্ণকলি ও বিভিন্ন ব্যান্ডের প্রতিবাদী গান আন্দোলনকারীদের ধমনীতে রক্তস্রোত বাড়িয়ে দিয়েছিল। ইন্টারনেট যখন বন্ধ, তখনো মোড়ে মোড়ে তরুণদের স্পিকারে কিংবা নিজের গলায় গাওয়া এই গানগুলো কারফিউ ভেঙে রাজপথে নামতে সাধারণ মানুষকে সাহস জুগিয়েছে।

ডিজিটাল প্রতিরোধ, ডিজিটাল আর্ট ও কলমের ধার

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল স্পেসগুলোতে শিল্পীদের তৈরি পোস্টার ও ইলাস্ট্রেশন মুহূর্তেই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। শিল্পী দেবাশীষ চক্রবর্তীর আঁকা একেকটি পোস্টার আন্দোলনের গতিপথ ও রাজনৈতিক দাবিকে সহজ ভাষায় তুলে ধরে। কার্টুনিস্ট ও ডিজিটাল আর্টগুলোর ব্যাঙ্গাত্মক ভাষা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতাকে তুচ্ছ প্রমাণ করে ছেড়েছিল।

মুক্তির যে আলো ছড়িয়েছে ২৪-এর শিল্পকলা

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যেমন 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' আর পটুয়া কামরুল হাসানের কার্টুন মুক্তিকামী জনতাকে জোগাত অন্তহীন শক্তি, চব্বিশের শ্রাবণ বিদ্রোহেও এই গ্রাফিতি, গান ও লেখাগুলো একই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে। এগুলো মানুষকে কেবল আবেগপ্রবণ করেনি, একত্রিত করেছিল এক ছাদের নিচে।

রাষ্ট্রীয় বুলেটের হিংস্রতাকে শিল্পের এই সৃজনশীল শক্তি দিয়ে পরাস্ত করেছিল বাংলাদেশের তরুণরা। রাজপথের রক্ত শুকিয়ে গেলেও কিংবা রঙিন দেয়ালের রং হয়তো সময়ের সাথে ফিকে হবে, কিন্তু চব্বিশের জুলাইয়ে গান, কবিতা আর রং-তুলির যে মহাজাগরণ ঘটেছিল—তা চিরকালের জন্য বাংলাদেশের মানুষকে শেখাল: অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে অস্ত্র লাগে না, সাহসের সাথে শিল্প মেশালেই সাম্রাজ্য কেঁপে ওঠে।

/এএ

Logo