×
Logo

জাতীয়

কেমন ছিল ৫ আগস্ট ঢাকার সকাল

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৭ এএম

কেমন ছিল ৫ আগস্ট ঢাকার সকাল

আজ ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট। ঠিক দুই বছর আগে ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে টানা ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের শাসন ব্যবস্থার। আন্দোলনের মুখে দেশ ছাড়েন তৎকালীন সরকারপ্রধানসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। দীর্ঘ ৩৬ দিনের আন্দোলনে সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানির পর দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ কর্মসূচি পরিণত হয় ছাত্র-জনতার দুর্বার আন্দোলনে। সরকারবিহীন এক জাতির দায়িত্ব নেন সেনাপ্রধান। সেনাপ্রধান জানান, বিচার হবে সব হত্যাকাণ্ডের।

কেমন ছিল ৫ আগস্ট ঢাকার সকাল? ভোর থেকে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল রাজধানী ঢাকায়। আলো ফুটতেই ঢাকাজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজিরবিহীন সতর্কতা চোখে পড়ে। ঢাকার প্রবেশমুখ— বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী, গাবতলী ও আবদুল্লাহপুরসহ ভেতরের সব প্রধান প্রধান সংযোগস্থল (শাহবাগ, মহাখালী, কারওয়ান বাজার, রামপুরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর) ভারী কাঁটাতারের বেষ্টনী দিয়ে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করা হয়। রাস্তায় যানবাহন চলাচল ছিল না বললেই চলে; চোখে পড়ে কেবল কিছু অ্যাম্বুলেন্স ও সংবাদমাধ্যমের গাড়ি। 

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গণভবন, বঙ্গভবন ও শাহবাগ অভিমুখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয় নিশ্ছিদ্র। পাস থাকা সত্ত্বেও জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের পড়তে হয়েছিল পুলিশ-সেনাবাহিনীর কড়া চেকিংয়ের মুখে। কিছু আবাসিক এলাকায় মাইকিং করে বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশনাও দিতে দেখা যায়। তবু রাজপথে বাড়তে থাকে মানুষের ঢল। থমথমে অবস্থা কেটে যায়। সব ভয় উপেক্ষা করে একটু একটু করে রাজপথে নেমে আসতে শুরু করে শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের জনতা। বিক্ষোভকারীদের ঠেকাতে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে প্রাণঘাতী গুলি ও টিয়ারশেল ছুড়ছিল পুলিশ।

বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনের রাস্তায় চলে আসতে দেখা যায় হাজারও শিক্ষার্থী-জনতাকে। সেনাবাহিনীর মাইকিং, গুলি ও কাঁটাতার দিয়ে মোড়ানো ব্যারিকেড কোনো কিছুই জনস্রোতকে আটকে রাখতে পারেনি। এ সময় লাঠিসোটা-পতাকা হাতে বিভিন্ন বয়সের নারীদেরও দেখা যায় ছাত্রদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগোতে। কুড়িল বিশ্বরোডে তারা বাধার মুখে পড়লেও কোনো ব্যারিকেড তাদের দমাতে পারেনি। গণভবনের দিকে এগোতে শুরু করে ছাত্র-জনতা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ও এদিন সকাল থেকে ছিল থমথমে অবস্থা। শহীদ মিনার এলাকায় জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়তে থাকে পুলিশ। তবে বৃষ্টির মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রতিবাদী র‍্যালি নিয়ে বের হন। পরিস্থিতি নেয় নতুন মোড়। দুপুর ১১টার পর হাজার হাজার ছাত্র-জনতার ঢলে পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই ঢল একসময় পরিণত হয় জনসমুদ্রে। বেলা ১টার মধ্যে শাহবাগ চত্বর সম্পূর্ণ জনতার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল রামপুরা-বনশ্রী। এই অঞ্চলে সকাল ১০টার পর থেকেই বিভিন্ন গলির ভেতর জড়ো হতে থাকেন বাসিন্দারা। মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বিচ্ছিন্ন থাকলেও বেলার বাড়ার সঙ্গে বেড়ে যায় জনতার স্রোত। বনশ্রী, আফতাবনগর, মেরাদিয়া থেকে রামপুরা ব্রিজে জড়ো হতে থাকে জনতা। লাঠিসোটা হাতে লাখো মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখে পুলিশ পিছিয়ে যায়। যদিও বাড্ডা থানার কাছ থেকে ব্যাপক গুলির শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। অনেককেই আহত অবস্থায় হাসপাতালে ছুটতে দেখা যায়। সরকার পতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে রামপুরা ব্রিজও পরিণত হয় জনসমুদ্রে।

সকলে যখন বিজয় উল্লাসে ব্যস্ত, রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে তখনও পুলিশ নির্বিচারে মানুষ মারছে। বিজয় উল্লাসে অংশ নিতে এসে লাশের স্তুপে পরিণত হয় অনেকেই। যাত্রাবাড়ী পুলিশ স্টেশনের সামনে সেই সহিংসতায় শুধু ঐদিনই মারা যায় ৫৫ জনের বেশি। যাত্রাবাড়ী থানার ভেতর এবং আশপাশে অবস্থান নিয়ে পুলিশ ও আনসারদের দেখা যায় বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারীর ওপর প্রাণঘাতী রাইফেল ও শটগান দিয়ে গুলি চালাতে। ঢাকা মার্চের জন্য জড়ো হয়েছিল এই ছাত্র-জনতা। তারাও জনসমুদ্রে সামিল হতে চেয়েছিল।

এদিন বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা বেশ কয়েকটি থানায় হামলা, ভাংচুর ও আগুন দেয়।

এরই মধ্যে খবর আসে, দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন শেখ হাসিনা। পতন হয়েছে ১৬ বছরের স্বৈরাচারী সরকার ব্যবস্থার। কিন্তু পরিষ্কার কোনো ঘোষণা নেই। দুপুর ২টায় ভাষণ দেওয়ার কথা থাকলেও প্রায় এক ঘণ্টা বিলম্বে বিকেল ৩টায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে সেনাপ্রধান নিশ্চিত করেন– দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন শেখ হাসিনা।

জুলাইয়ের এক তারিখে শুরু হওয়া টানা ৩৬ দিনের কোটা সংস্কার আন্দোলন শেষ হয় স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে। তার পলায়নেই মূলত বিজয় উল্লাসে নামে পুরো জাতি। ছাত্র-জনতার জনসমুদ্র ততোক্ষণে গণভবনে পৌঁছে যায়। গণভবনের প্রতিটি কোনায় তখন মানুষের উপস্থিতি।

রাজপথে কারও হাতে লাল-সবুজের পতাকা। কেউবা মাথায় বেধেছেন লাল কাপড়। রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে জয়ের উচ্ছ্বাস তাদের চোখে-মুখে। বিজয় মিছিল নিয়ে তারা গাইছে পরাধীনতার শেকল ভাঙার গান। আনন্দ-আয়োজনের এক নতুন পর্ব রচিত হয় বাংলাদেশে।

/এএম

Logo