×
Logo

জাতীয়

জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর: রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতা

রাসেল আহমেদ

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৩ পিএম

জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর: রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতা

কোটাবিরোধী আন্দোলনের ইতি হয়েছিল রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। কিন্তু গতানুগতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সেই প্রত্যাশার অনেকটাই ফিকে হয়ে আসছে বলে মূল্যায়ন করছেন নির্দলীয় জুলাই যোদ্ধারা। অভ্যুত্থান-পরবর্তী দুই বছরের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, আমূল পরিবর্তনের জন্য এই সময়টা যথেষ্ট নয়। তবে জুলাই-পরবর্তী যে রাজনৈতিক বোধোদয়ের আশা করা হয়েছিল, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।

জুলাইতে সম্মুখসারিতে ছিলেন, এমন অনেকের সঙ্গে কথা বলে তাদের মানসপটে থাকা না পাওয়ার বেদনার একটা ধারণা মিলেছে। তেমনই একজন নিহত নাফিসের মায। যিনি প্রতিনিয়ত ছেলে হারানোর কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন।

নাফিসের ঝুলে থাকা শরীরের ছবি এখনও তার চোখে জ্বলজ্বলে। কলেজপড়ুয়া এই তরুণের রক্তের দাগ আজও কোটি হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে। দুই বছর পার হলেও নাফিসের পড়ার টেবিল আগের মতোই সাজানো আছে। পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে পড়ে আছে গল্পের বই আর স্কুলের সাফল্যমণ্ডিত স্বীকৃতিপত্র।

নাফিসের মা জানান, ছেলে তাকে বলতেন, দেশ পরিবর্তন করতে হলে কাউকে না কাউকে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। ছাত্র-জনতার ওপর গুলির বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন নাফিস। আশা করেছিলেন বিজয়ের পর রাষ্ট্রকাঠামোয় পরিবর্তন আসবে।

নিহত নাফিসের মা বলেন, 'কারে ফাঁসি দিছে? যে দেশে নেই। যারা দেশে আছে, কী দিলো তিন বছর-পাঁচ বছর? একটা স্বজন হারানো মানুষে একটা বিচার দেখলো? আশাবাদী হইতো যদি একটা বিচার কার্যকর দেখতে পারতাম। নাফিসরা এই দেশ চায় নাই।'

জুলাই আন্দোলনের পুরো সময় উত্তরা ছিল মূলত ছাত্র-জনতার নিয়ন্ত্রণে। অভ্যুত্থানের শেষ দিন ৫ আগস্ট সকালে আশপাশের বিভিন্ন অলিগলি থেকে জনতার ঢল এসে জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এই জনসমুদ্রে শামিল হওয়া সাধারণ মানুষের ক্ষোভ শুধু গণহত্যার বিরুদ্ধেই ছিল না, ছিল রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের প্রত্যাশাও। গত দুই বছরে সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

জুলাইতে রাজপথে থাকা একাধিক ব্যক্তির মতে, রক্ত কেউ কোনো দলের জন্য দেয়নি। দিয়েছে দেশের জন্য। তাহলে দেশ কেন বাঁচে না, এমন প্রশ্নও তাদের। 

কারও কারও মতে, মানুষের একটা আশা ছিল যে আরও ভালো কিছু পাবে। বা মানুষের যে সমস্যাগুলো, যেমন দুর্নীতি, অপরাজনীতি বা বিশৃঙ্খলা, সেগুলো পরিবর্তন হয়ে সবকিছু ফিরবে নিয়মে। কিন্তু বেশিরভাগ স্বপ্নই পূরণ হয়নি। 

তাদের ভাষ্য, মারামারি, মাস্তানি এখনও চলছে। বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এখানে-সেখানে মারামারি চলছে। মনে হচ্ছে আগের মতোই আছি। কিছুই পরিবর্তন হয় নাই।

জুলাই আন্দোলনে সম্মুখসারিতে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজিমউদ্দীন খান মনে করেন, এত অল্প সময়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আশা করাটাও সমীচীন নয়। তবে যে শুরুটা হতে পারত, তার দেখা এখনও মিলছে না।

তিনি বলেন, 'অল্প সময়ে তো আসলে এতদিনের জঞ্জাল দূর করা যাবে না। অন্তত মানুষের কাছে এই বার্তাটা দেওয়া যাবে যে, আমাদের তরফ থেকে চেষ্টাটা আছে। এই বার্তাটাই এখন খুব জরুরি। ৫ আগস্টকে যদি আমরা একটা রাজনৈতিক শিক্ষা হিসেবে না নিই, তাহলে আগের দুঃখ-কষ্টই ফিরে আসবে। ১৯৭১ সালের পরও আমরা দেখেছি, মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি।'

তার মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেলেও সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তার কোনো প্রভাব নেই। পুরনো রাজনীতির বলয়েই এখনও ঢাকা পড়ে আছে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা।

তিনি আরও বলেন, 'হুমকি-ধমকির যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমরা আগের সময়ে দেখেছি, সেই পরিবর্তনগুলোই তো আমরা আসলে আশা করেছিলাম। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, আমাদের মগজের পরিবর্তন সেই অর্থে হয়নি, যে অর্থে আমরা আশা করেছিলাম কিংবা যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল।'

/এমএমএইচ


Logo