×
Logo

জাতীয়

কর্মময় জীবনের শহর ঢাকা, মৃত্যুর পর সেখানেই মেলে না সাড়ে ৩ হাত মাটি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০১:৩৪ পিএম

কর্মময় জীবনের শহর ঢাকা, মৃত্যুর পর সেখানেই মেলে না সাড়ে ৩ হাত মাটি

জীবনের কর্মক্ষম সময়ের পুরোটা রাজধানী ঢাকায় কাটিয়েও মৃত্যুর পর অনেকেরই সাড়ে ৩ হাত জায়গা মেলেনা এই শহরে। যে শহরের মাটিতে মিশে থাকে মানুষের ঘাম, শ্রম আর সংগ্রামের গল্প, জীবনাবসানের পর সেই শহরই যেন হয়ে ওঠে অপরিচিত। কবরের জন্য সামান্য জায়গাও অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চিকিৎসার জন্য আসেন। বেশিরভাগই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু কেউ কেউ আর ফিরতে পারেন না। মৃত্যুর পর প্রিয়জনকে দাফন করতেই স্বজনদের পড়তে হয় নতুন এক সংগ্রামে।

দাফনের জন্য কবরস্থান অফিসে যোগাযোগ, নিবন্ধন, ফি পরিশোধসহ নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। শোকের মধ্যেই শুরু হয় আরেক সংগ্রাম। অথচ ঢাকার আয়তন ও জনসংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি কবরস্থানের সংখ্যা বা পরিধি। ফলে দীর্ঘদিন রাজধানীতে বসবাস করলেও মৃত্যুর পর শেষ আশ্রয় সেই গ্রামেই। 

নগরবাসীর অনেকে মনে করেন, গ্রামে পারিবারিক জমি ও পূর্বপুরুষদের কবর থাকায় সেখানে দাফনের সুযোগ তুলনামূলক সহজ। কিন্তু ঢাকায় অধিকাংশ মানুষের নিজের কোনো জমি না থাকায় মৃত্যুর পর স্থায়ী কবরের নিশ্চয়তা পাওয়া কঠিন। এছাড়া, কবর সংরক্ষণের খরচও অনেকের জন্য বড় বাধা। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বনানী কবরস্থানে ২৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণে ব্যয় হতে পারে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ কোটি টাকা। অন্য এলাকাগুলোতেও ব্যয় কোটি টাকার ঘরেই। অন্য এলাকাতেও সেই খরচ ১ থেকে দেড় কোটি টাকার কম নয়। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে (ডিএসসিসি) ১০ থেকে ২০ বছরের জন্য ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এমনকি জায়গার অভাবে সিটি করপোরেশনও অনুৎসাহিত করছে কবর সংরক্ষণে। 

ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানান, খিলগাঁও কবরস্থান সম্প্রসারণের জন্য সরকারি জমি চাওয়া হয়েছে। জমি পাওয়া গেলে নতুন করে স্থান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। 

তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রাজধানীর কবরস্থানগুলো বহু মানুষের আবেগ ও স্মৃতির কেন্দ্র হয়ে আছে। আজিমপুর কবরস্থানে মায়ের কবর জিয়ারত করতে আসা কবির হোসেন বলেন, কবরের পাশে দাঁড়ালে এখনও মনে হয় তিনি মায়ের সঙ্গেই কথা বলছেন। তার কাছে মায়ের উপস্থিতি আজও অনুভব করেন তিনি।

কবরস্থান কর্তৃপক্ষ বলেন, নতুন করে কবর সংরক্ষণের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। কারণ সবাই যদি স্থায়ীভাবে কবর সংরক্ষণ করতে চান, তাহলে সাধারণ মানুষের দাফনের জন্য জায়গা সংকট আরও তীব্র হবে। সাধারণত একটি কবর দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে ভেঙ্গে ফেলা হয় বা নতুন কবর দেওয়া হয়। তবে পূর্বে দাফন করা ব্যক্তির কবর শনাক্ত করতে সারিভিত্তিক নম্বর সংরক্ষণ করা থাকে।  সেই নম্বর দিয়েই শনাক্ত করা যাবে অতীতে দেওয়া কবর। 

বিশেষজ্ঞরা বলেন, পরিকল্পিত নগরে জনসংখ্যার অনুপাতে কবরস্থানের জায়গা রাখার কথা থাকলেও, সেই প্রস্তুতি নেই ঢাকার। ফলে সংকুচিত হচ্ছে মৃত্যুর পরের আশ্রয়ও।

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মূল্যবান জমি যদি টাকা দিয়ে কিনতে হয় সরকার টাকা দিয়ে কিনবে। কিন্তু মানুষকে তার অধিকার দিতে হবে। সেজন্য মৃত্যুর পরেও তার প্রিয়জনের কাছে অন্তত কাছাকাছি কবরস্থানেই দিয়ে যেতে পারে, সেখানে তার জন্য একটু দোয়া করতে পারে। এবং এটা মানুষকে কিন্তু বেঁচে থাকার শক্তি দেয়। 

রাজধানীতে অনেক মানুষ সারাজীবন ভাড়া বাসায় কাটান। মৃত্যুর পরও তাদের নিজের নামে কোনো স্থায়ী জায়গা থাকে না। ফলে ঢাকায় এখন মৃত্যু শুধু প্রিয়জন হারানোর বেদনা নয়, বরং শেষ আশ্রয়ের জন্যও এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার নাম।

/এএন

Logo