‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ প্রচারণায় ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, হয়রানি ও হুমকির শিকার অনেকে
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম
‘আমি চোরের মতো জীবনযাপন করি’— নিজের ব্যক্তিগত ছবি, ফোন নম্বর ও বাসার ঠিকানা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর এমন আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশি এক তরুণী। ভিন্ন ধর্মের এক তরুণের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগ তুলে তাকে লক্ষ্য করে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। এতে নিজের পাশাপাশি পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তিনি। এমনটাই উঠে এসেছে
তরুণীর ছদ্মনাম ফাতেমা। তার মতো আরও অনেককে ভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেনস্তা করা হচ্ছে। এসব প্রচারণায় ব্যবহার করা হচ্ছে ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ নামের একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব। এতে দাবি করা হয়, হিন্দু তরুণেরা মুসলিম মেয়েদের প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করেন।
অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, এই প্রচারণাকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে অনেককে হয়রানি, ভয়ভীতি ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার হতে হচ্ছে। অনুমতি ছাড়া কারও নাম, ছবি, ঠিকানা, ফোন নম্বর বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল প্রকাশ করে তাকে হয়রানি, হুমকি কিংবা অন্য ক্ষতির ঝুঁকিতে ফেলার এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে বলা হয় ‘ডক্সিং’।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ২৩টি ফেসবুক পেজে ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ বয়ান ব্যবহার করে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে— এমন ২৮৮টি পোস্ট শনাক্ত হয়েছে। এসব পোস্টে কারও নাম, ছবি, বাসার ঠিকানা, ফোন নম্বর কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলের লিংক প্রকাশ করা হয়।
এ ধরনের পোস্টে ফোন নম্বর প্রকাশিত হওয়া ১২ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে ডিসমিসল্যাব। তাদের সবাই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। পোস্টগুলো প্রকাশের পর তারা হুমকি, হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। সামাজিক অপবাদ ও নিরাপত্তার উদ্বেগে তাঁদের কেউ কেউ দৈনন্দিন কাজকর্ম এবং পড়াশোনাও বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন। একজন আইন বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, ডক্সিংয়ের মাধ্যমে অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঘটনা আরও গুরুতর নির্যাতনের পথ তৈরি করতে পারে।
যেভাবে ছড়াচ্ছে ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ প্রচারণা
‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ শব্দবন্ধটির উৎপত্তি ভারতে। ২০২৩ সালে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম অল্ট নিউজের এক অনুসন্ধান অনুযায়ী, মুসলিম পুরুষেরা হিন্দু নারীদের প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করেন— এমন অভিযোগসংবলিত ‘লাভ জিহাদ’ ষড়যন্ত্রতত্ত্বের পাল্টা বয়ান হিসেবে এর প্রচলন শুরু হয়। এই তত্ত্বে উল্টো দাবি করা হয়, হিন্দু পুরুষেরা মুসলিম নারীদের প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত করেন।
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশেও এই বয়ান ছড়িয়ে পড়ে। ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে— এমন ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে টেলিগ্রাম গ্রুপ ও বিভিন্ন ডক্সিং প্রচারণা চালানো শুরু হয়।
ডিসমিসল্যাব ফেসবুকে বাংলায় ‘ভাগওয়া লাভ’ শব্দ দিয়ে অনুসন্ধান করে এ বিষয়ে পোস্ট করা ৫৪টি পেজ শনাক্ত করে। পরে ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ওই পেজগুলোর পোস্ট সংগ্রহ করে গবেষকেরা ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ সংশ্লিষ্ট ৩ হাজার ৮২৮টি পোস্ট পান। সেগুলোর মধ্য থেকে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে—এমন পোস্ট আলাদাভাবে যাচাই করা হয়।
এ প্রক্রিয়ায় ২৩টি পেজ থেকে ২৮৮টি ডক্সিং পোস্ট শনাক্ত হয়। একই পোস্ট একাধিকবার প্রকাশের বিষয়টি বাদ দেওয়ার পর অনন্য পোস্টের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯৪। এসব পোস্টে কথিত সম্পর্কে জড়িত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন ব্যক্তির এক বা একাধিক ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে নাম, ছবি, ঠিকানা, ফোন নম্বর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলের লিংক এবং একটি ক্ষেত্রে ই-মেইল ঠিকানা।
পর্যালোচনা করা ১৯৪টি পোস্টের ৯৭ শতাংশেই ছবি ছিল। ১০৭টি পোস্টে নাম, ৫৮টিতে ঠিকানা, ৩১টিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলের লিংক এবং ১২টিতে ফোন নম্বর প্রকাশ করা হয়। একটি পোস্টে একাধিক ধরনের তথ্য থাকতে পারে বলে এসব সংখ্যা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
পোস্টগুলোর মধ্যে ১০৩টিতে (৫৩ শতাংশ) একজন নারী ও একজন পুরুষের নাম উল্লেখ করে তাঁদের ভিন্ন ধর্মের প্রেমের সম্পর্কে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলা হয়। ৩৫ শতাংশ পোস্টে শুধু পুরুষ এবং ১২ শতাংশ পোস্টে শুধু নারীর নাম প্রকাশ করা হয়।
বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে একই ক্যাপশন ব্যবহার করে পোস্ট ছড়ানোর ঘটনাও পেয়েছে ডিসমিসল্যাব। একটি ক্যাপশনে দাবি করা হয়, এক হিন্দু তরুণের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার পর এক মুসলিম শিক্ষার্থীকে ‘উদ্ধার’ করা হয়েছে। পাশাপাশি পাঠকদের নিজেদের পরিবারের সদস্যদের ওপর নজর রাখার আহ্বান জানানো হয়। আরেকটি পোস্টে এক যুগলের পালিয়ে যাওয়ার কথা বলে তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিতে অনুরোধ করা হয়।
ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের পর ভয়, হুমকি ও ব্ল্যাকমেইল
‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ প্রচারণায় ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে তাদের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব সম্পর্কে জানতে পেরেছে ডিসমিসল্যাব।
যাদের ফোন নম্বর পোস্টে পাওয়া গেছে, তাদের ১২ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে দুজন জানান, পোস্টে উল্লিখিত অভিযোগ কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। বাকি ১০টি নম্বর সংশ্লিষ্ট পোস্টে নাম উল্লেখ করা ব্যক্তিরাই ব্যবহার করেন। তাঁদের অনেকেই এ ধরনের প্রচারণার বিষয়ে অবগত।
এ ছাড়া ৩১টি পোস্টে প্রকাশিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল লিংকও যাচাই করেছে ডিসমিসল্যাব। এর মধ্যে ১৭টি প্রোফাইল আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাকি ১৪টি তখনও সক্রিয় ছিল।
এক ভুক্তভোগী (ভিকটিম-১) জানান, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের কারণে তাঁর কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি তাকে বিভিন্ন হুমকির মুখেও পড়তে হয়েছে।
ছবি ও ফটোকার্ডের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে— এমন পোস্টও পেয়েছে ডিসমিসল্যাব। এর একটি পোস্ট ১ হাজার ৫০০ বারের বেশি শেয়ার করা হয়েছিল।
‘ইসলাম ইনসাইট’ নামের একটি পেজের পোস্টে দাবি করা হয়, দেশের মুসলিম নারীরা উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপের’ শিকার হচ্ছেন। পোস্টটিতে আরও অভিযোগ করা হয়, কয়েক বছর ধরে হিন্দুত্ববাদী অনুসারীরা মুসলিম নারীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ, ধর্মান্তর এবং ভারতে পাচার করে জোরপূর্বক যৌনবৃত্তিতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে।
এ ধরনের পেজ ও গ্রুপের কার্যক্রম সম্পর্কে ভিকটিম-১ বলেন, ‘আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এমন অনেক গ্রুপ ও পেজ রয়েছে, যাদের কাজই হলো এ ধরনের পোস্ট করা। এগুলো পুরোপুরি সংঘবদ্ধ অপরাধ। কিছু পেজ ও গ্রুপের একমাত্র উদ্দেশ্য দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে ঘৃণা ছড়ানো। ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো শত্রু না থাকলেও ওই গ্রুপগুলোর একটি লক্ষ্যবস্তু প্রয়োজন ছিল। পেজের রিচ ও লাইক বাড়াতে তারা আমার ব্যক্তিগত জীবনকে পুঁজি করেছে।’
আরেক ভুক্তভোগী (ভিকটিম-২) বলেন, ‘মুসলিম মেয়েটি আমার সহপাঠী। তার সঙ্গে আমার অন্য কোনো সম্পর্ক নেই।’
ডক্সিংয়ের কারণে দৈনন্দিন জীবন কীভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে, তা তুলে ধরে ভিকটিম-৪ বলেন, ‘এসব পোস্ট প্রকাশের সময় একদিন আমার বাবা অচেনা নম্বর থেকে ফোন পান। আমি ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, কেউ হয়তো বাবাকে হুমকি দিতে ফোন করেছে। পরে দেখলাম, সেটি কুরিয়ার সার্ভিসের ফোন ছিল। মানসিক আঘাত এতটাই বেশি যে, যেখানে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, সেখানেও ভয় লাগে। আমি চোরের মতো জীবনযাপন করি।’
হয়রানির শিকার হওয়ার পর আইনি সহায়তা চেয়েছিলেন কি না—এমন প্রশ্নে ভিকটিম-১ জানান, তিনি পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন। পুলিশ সহায়তার আশ্বাস দিলেও পুরো প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির। তাঁর ভাষায়, প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল। ততক্ষণে হাজার হাজার মানুষ মিথ্যাটি বিশ্বাস করে ফেলেছেন।
ডক্সিং থেকে বাস্তব জীবনে নির্যাতনের ঝুঁকি
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) আইন বিশেষজ্ঞ মানীষা বিশ্বাস বলেন, নারী ও মেয়েদের ক্ষেত্রে ডক্সিংয়ের ঘটনা আরও গুরুতর রূপ নিতে পারে। এর মাধ্যমে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল কিংবা যৌন হয়রানির উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে অর্থ বা সুবিধা আদায়ের মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
তিনি বলেন, এর ফলে পরিবারের সদস্যরাও হুমকি ও হয়রানির শিকার হতে পারেন। এমনকি পরিচয় চুরি বা প্রতারণার ঝুঁকিও তৈরি হয়। তাই ডক্সিংকে শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন হিসেবে দেখলে চলবে না; অনলাইনে নিপীড়ন থেকে বাস্তব জীবনে ক্ষতির পথ তৈরি করতে পারে— এমন একটি ঝুঁকি হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।
অল্প কয়েকটি পেজেই অধিকাংশ পোস্ট ও প্রতিক্রিয়া
‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ বয়ান ব্যবহার করে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের পোস্টগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব পোস্টে মোট ১ লাখ ৯ হাজার ৮১৫টি প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য ও শেয়ার পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রতিটি পোস্টে গড়ে প্রায় ৩৮১টি ইন্টারঅ্যাকশন হয়েছে। এর মধ্যে গড়ে প্রায় ২৫৪টি ছিল প্রতিক্রিয়া।
ডক্সিংয়ের ২৮৮টি পোস্ট এসেছে ২৩টি ফেসবুক পেজ থেকে। এর মধ্যে মাত্র পাঁচটি পেজ থেকেই প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পোস্ট প্রকাশ করা হয়। ‘বিউটিফুল ইসলাম’ ৬২টি, ‘ভয়েস অব উম্মাহ’ ৩৯টি, ‘রুহের ডাক’ ও ‘অনার গার্ড বিডি’ ৩৬টি করে এবং ‘মোঃ রাসেল ভালুকা ধীতপুর’ ২১টি পোস্ট প্রকাশ করে।
ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনায় সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া পাওয়া ডক্সিং পোস্টটি শুরু হয়েছিল ‘এক্সক্লুসিভ ভিডিও’ শব্দ দিয়ে। ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই ‘মোল্লার আলো’ নামের একটি পেজে প্রকাশিত ওই পোস্টে অভিযোগ করা হয়, মানিকগঞ্জে একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ ব্যবহার করে মুসলিম মেয়েদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পোস্টটিতে প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য ও শেয়ার মিলিয়ে ১৫ হাজার ২৮১টি ইন্টারঅ্যাকশন পাওয়া যায়। পর্যালোচনা করা ২৮৮টি পোস্টের মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ।
ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের পোস্ট ছড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে সক্রিয় ছিল ‘মোল্লার আলো’। পেজটি ২০টি পোস্ট প্রকাশ করলেও সেগুলোতে মোট ৩৮ হাজার ১৮৬টি ইন্টারঅ্যাকশন পাওয়া যায়, যা মোট ইন্টারঅ্যাকশনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। পেজটির প্রতিটি পোস্টে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৯০০টি ইন্টারঅ্যাকশন হয়েছে— সব পোস্টের গড়ের প্রায় পাঁচ গুণ।
মোট ইন্টারঅ্যাকশনের হিসাবে ‘মোল্লার আলো’র পর ছিল ‘ভয়েস অব উম্মাহ’, ‘রুহের ডাক’, ‘ফাইট এগেইনস্ট হিন্দুত্ব’ ও ‘অনার গার্ড বিডি’। শীর্ষ পাঁচটি পেজেই মোট ইন্টারঅ্যাকশনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এসেছে। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি পোস্ট প্রকাশ করলেও ‘বিউটিফুল ইসলাম’ পেজের পোস্টগুলোতে মোট ইন্টারঅ্যাকশন ছিল ৫ হাজার ২৭০টি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরেও ডক্সিংয়ের বিস্তার
ফেসবুকের একটি পোস্ট অনুসরণ করতে গিয়ে ‘সেভ মুসলিম গার্লস’ নামে একটি ওয়েবসাইটের সন্ধান পায় ডিসমিসল্যাব। বাংলা ভাষার এই ওয়েবসাইটে মুসলিম নারী ও হিন্দু পুরুষের কথিত সম্পর্ক নিয়ে নিবন্ধ, ভিডিও, সাক্ষাৎকার ও বিভিন্ন পোস্ট প্রকাশ করা হয়। এসব কনটেন্টের বড় অংশে প্রতারণা, যৌন শোষণ, ধর্মান্তর ও সহিংসতার অভিযোগ তুলে সেগুলোকে ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ ষড়যন্ত্রতত্ত্বের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ডোমেইন রেকর্ড অনুযায়ী, ওয়েবসাইটটির ঠিকানা নিবন্ধিত হয় ২০২৬ সালের ৪ আগস্ট।
ওয়েবসাইটটির ‘এক্সপোজ লিস্ট’ পাতার শিরোনামে মুসলিম নারীদের নিয়ে অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। পাতাটিতে সম্ভাব্য পাত্রদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, বিয়ের আগে পাত্রী কোনো অমুসলিম পুরুষের ‘দাসী’ ছিলেন কি না, তা যাচাই করে নিতে। পাশাপাশি নারীদের ওই তালিকায় নাম ওঠার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহের কথা জানিয়ে মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে কথিত ষড়যন্ত্রের তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
ওয়েবসাইটটিতে অভিযোগগুলোর জন্য আলাদা একটি তালিকা বা ডিরেক্টরি রাখা হয়েছে। সেখানে ৪০টি জেলার ভিত্তিতে পোস্টগুলো সাজানো হয়েছে। পাশাপাশি ‘নাম/ঠিকানা পাওয়া যায়নি’ নামে একটি আলাদা বিভাগও রয়েছে। প্রতিটি তালিকায় একটি শিরোনাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া আছে, যেখান থেকে বিস্তারিত পোস্টে যাওয়া যায়।
এসব শিরোনামে কথিত সম্পর্কগুলোকে কখনো যৌন অসদাচরণ, কখনো প্রতারণা বা ধর্মান্তর, আবার কখনো জবরদস্তি ও নির্যাতনের ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কোনো কোনো পোস্টে পাঠকদের নির্দিষ্ট নারীকে শনাক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোথাও রেস্তোরাঁ, হোটেল বা রিসোর্টে কথিত সাক্ষাতের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। একটি পোস্টে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে কথিত প্রেমের সম্পর্কের কারণে ‘হিন্দুর দাসী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্য একটি পোস্টে ‘আইএসকনের নেতার কবলে ধর্মান্তরিত মুসলিম পরিবার’ বলে দাবি করা হয়েছে। নাম বা ঠিকানা পাওয়া যায়নি—এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করতেও পাঠকদের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে মেটার নীতিমালা
মেটার কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডে ‘প্রাইভেসি ভায়োলেশনস’ বা গোপনীয়তা লঙ্ঘনসংক্রান্ত নীতিমালায় অন্য ব্যক্তির ফোন নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানার মতো ব্যক্তিগত যোগাযোগের তথ্য প্রকাশে বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে ব্যক্তি নিজে তথ্য প্রকাশ করলে কিংবা দাতব্য কাজ, নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা বা কোনো ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের মতো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমিত ব্যতিক্রম রয়েছে।
একই সঙ্গে অন্যের ব্যক্তিগত বাসার ঠিকানা প্রকাশ করা কিংবা কারও কাছে সেই ঠিকানা জানতে চাওয়ার বিষয়েও বিধিনিষেধ রয়েছে।
ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনা করা পোস্টগুলোর মধ্যে ১০৭টিতে ঠিকানা, ২৩টিতে ফোন নম্বর এবং একটিতে ই-মেইল ঠিকানা পাওয়া গেছে। কোনো কোনো পোস্টে একাধিক ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এসব তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে মেটার নীতিমালায় উল্লেখিত অনুমোদিত কোনো উদ্দেশ্যের কথা পোস্টগুলোতে দেখা যায়নি।
একটি পোস্টে পাঠকদের উদ্দেশে বলা হয়েছিল, ‘আপনার আশপাশে এই ছেলে ও মেয়েকে দেখলে আমাদের তাদের অবস্থান জানান।’ ডিসমিসল্যাবের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ ধরনের আহ্বান মেটার নীতিমালায় অন্যের ব্যক্তিগত বাসার ঠিকানা জানতে চাওয়ার ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
ডিসমিসল্যাব যখন পোস্টগুলো পর্যালোচনা করে, তখন সেগুলো ফেসবুকে সক্রিয় ছিল। তবে মেটার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা কিংবা কোনো মডারেটর পোস্টগুলো শনাক্ত বা পর্যালোচনা করেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সাক্ষাৎকার দেওয়া ভুক্তভোগীদের সবাইকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তাঁরা ফেসবুকে পোস্টগুলো রিপোর্ট করেছেন কি না। কেউই তা করেননি। কয়েকজন জানান, পোস্টগুলোর সরাসরি লিংক তাঁদের কাছে ছিল না। আবার কেউ কেউ রিপোর্ট করার পর পোস্ট সরানো হবে কি না, সেই অপেক্ষায় না থেকে ফেসবুক ব্যবহারই বন্ধ করে দেন।
অনুসন্ধানের পদ্ধতি
‘ভাগওয়া লাভ’ শব্দ ব্যবহার করে ফেসবুকে অনুসন্ধান চালিয়ে এ বিষয়ে পোস্ট করা ৫৪টি পেজ শনাক্ত করে ডিসমিসল্যাব। পরে ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ওই পেজগুলোর পোস্ট সংগ্রহ করে ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ সংশ্লিষ্ট ৩ হাজার ৮২৮টি পোস্ট পাওয়া যায়। সেখান থেকে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে—এমন পোস্টগুলো আলাদা করা হয়।
গবেষক বাতুহান কুকুল ও ডেভিড এম ডগলাসের গবেষণায় ব্যবহৃত কাঠামো অনুসরণ করে কোনো পোস্টে ব্যক্তির নাম, ছবি, ঠিকানা, ফোন নম্বর কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলের লিংক প্রকাশ করা হলে সেটিকে ডক্সিং হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এভাবে ২৩টি পেজে প্রকাশিত ২৮৮টি পোস্ট শনাক্ত করা হয়।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল ও গ্রুপের পোস্টগুলো এই গবেষণার আওতায় রাখা হয়নি। পাশাপাশি ১২ জন ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার নেওয়া, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলা এবং ‘সেভ মুসলিম গার্লস’ ওয়েবসাইট পর্যালোচনা করা হয়েছে।
তবে ব্যক্তিগত প্রোফাইল ও গ্রুপের পোস্ট বাদ থাকায় এই গবেষণার ফলাফল ফেসবুকে এ ধরনের প্রচারণার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে না। ইন্টারঅ্যাকশনের হিসাব পোস্ট সংগ্রহের সময়কার প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য ও শেয়ারের ভিত্তিতে করা হয়েছে; কতজন পোস্টগুলো দেখেছেন, তা নয়। প্রতিটি ছবি বা অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা, পেজগুলোর পরিচালকদের শনাক্ত করা কিংবা তাদের মধ্যে সমন্বয় ছিল কি না, তা নির্ধারণ করাও সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত তথ্য আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ডিসমিসল্যাব তাদের পরিচয় প্রকাশ করে— এমন পোস্টের লিংক বা ছবি প্রতিবেদনে যুক্ত করেনি। অনুসন্ধান ও প্রতিবেদন প্রকাশের পুরো প্রক্রিয়ায় ডক্সিংয়ের শিকার ব্যক্তিদের গোপনীয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
/এনএ