জাতীয় নগর ফোরামে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু সহনশীল শহর গড়ার তাগিদ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৯ পিএম
নগর নীতিকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তর এবং বাংলাদেশজুড়ে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, বাসযোগ্য ও জলবায়ু সহনশীল শহর গড়ে তুলতে সম্মিলিত পদক্ষেপ জোরদারের আহ্বানের মধ্য দিয়ে রাজধানীতে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী 'জাতীয় নগর ফোরাম ২০২৬'।
স্থানীয় সরকার বিভাগ ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে এবং এডিবি, জাইকা, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি), বুয়েট ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সহযোগিতায় এ ফোরাম অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে যুক্তরাজ্য সরকারেরও সহায়তা রয়েছে। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর শেষ হবে ফোরাম।
এতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা, উন্নয়ন সহযোগী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি এখন শহরে বসবাস করছে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬৫ শতাংশও আসে নগরাঞ্চল থেকে। দ্রুত নগরায়ণের ফলে আবাসন, পরিবহন, অবকাঠামো, জনসেবা ও পরিবেশের ওপর বাড়ছে চাপ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, বৈষম্য, পরিবেশের অবক্ষয় এবং জলবায়ুজনিত অভিবাসন।
ফোরামের আলোচনায় ঢাকাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে এর ঘনত্বের বিষয়টিও উঠে আসে। পাশাপাশি যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দূষণ এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমিত সক্ষমতাকে নগর উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বক্তারা বলেন, ২০২৫ সালে জাতীয় নগর নীতি গ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নীতিকে বাস্তবায়নে নেওয়া। এজন্য জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয়, সক্ষম স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং স্থানীয়ভাবে পরিচালিত সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন এমপি বলেন, 'আমি আশা করি, এই ফোরামের আলোচনা আমাদের এমন একটি নগর উন্নয়ন পদ্ধতির দিকে এগিয়ে নেবে, যেখানে কেউ পিছিয়ে থাকবে না এবং আর্থসামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষ মর্যাদা, নিরাপত্তা ও আশার সঙ্গে বসবাসের সুযোগ পাবে।'
২০২৫ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রথমবারের মতো জাতীয় নগর নীতি গ্রহণ করে। ইউএনডিপি বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তা এবং যুক্তরাজ্য সরকারের অর্থায়নে প্রণীত এই নীতিতে নগর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা, অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা ও আবাসন, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, জবাবদিহিমূলক নগর শাসন এবং পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু সহনশীল শহর গড়ার বিষয়ে সমন্বিত কাঠামো দেওয়া হয়েছে।

ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিগস বলেন, 'এই ফোরাম কোনো সমাপ্তি নয়। আজকের আলোচনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য এটি আমাদের যৌথ দায়িত্বের শুরু।'
বাংলাদেশের উন্নয়ন চ্যালেঞ্জকে সুযোগে পরিণত করার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, 'এই দেশের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই এর শহর ও নগরগুলোতে লেখা হবে।'
ইউএনডিপি জানিয়েছে, জাতীয় নগর নীতির অঙ্গীকার বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা, নগর সেবার মান উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানো এবং বিশেষ করে নিম্নআয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনকে নগর উন্নয়নের কেন্দ্রে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার ও উন্নয়ন পরিচালক জেমস গোল্ডম্যান আশা প্রকাশ করেন, ফোরামটি বাংলাদেশে টেকসই নগর উন্নয়নে কাজ করা অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে।
এডিবির ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর আকিরা মাতসুনাগা বলেন, 'বাংলাদেশের নগর খাতে এডিবি দীর্ঘদিনের অংশীদার। এখন আমাদের অগ্রাধিকার হলো এই সহায়তাকে এমনভাবে সমন্বিত করা, যাতে শহরগুলো আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, বাসযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে।'
স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিকল্পনা-২ শাখার যুগ্ম সচিব মো. সামছুল ইসলাম বলেন, 'আগামী দুই দিনের আলোচনার মাধ্যমে আমরা স্পষ্ট অগ্রাধিকার, বাস্তবসম্মত সুপারিশ এবং সম্মিলিতভাবে কাজ করার সুযোগ চিহ্নিত করতে পারব বলে আশা করি।'
দুই দিনের ফোরামে নগর পরিকল্পনা ও সুশাসন, কার্যকর নগর সেবা, নগর আর্থসামাজিক উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীলতা ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় নেতৃত্বে অভিযোজন এবং প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান (Nature-Based Solutions) নিয়েও আলোচনা হচ্ছে, যা জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
ফোরামের লক্ষ্য হলো বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ তৈরি, জাতীয় ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার এবং বাংলাদেশজুড়ে বিভিন্ন নগর এলাকায় প্রয়োগ ও সম্প্রসারণ করা যায়— এমন কার্যকর সমাধান চিহ্নিত করা।
/এমএইচআর