×
Logo

অন্যান্য

আধুনিক সভ্যতার বাইরে এক গ্রাম, যেখানে শোনা হয়নি স্যানিটারি ন্যাপকিনের নাম

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম

আধুনিক সভ্যতার বাইরে এক গ্রাম, যেখানে শোনা হয়নি স্যানিটারি ন্যাপকিনের নাম

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার গোড়াদিঘা ইউনিয়ন। দুর্গম এক হাওরগ্রাম। বর্ষায় চারপাশ পানিতে থইথই করে। যাতায়াতের একমাত্র বাহন নৌকা। আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অনেক কিছুই যেখানে এখনও সহজলভ্য নয়।

কিছুদিন আগেও এই গ্রামের অধিকাংশ নারী স্যানিটারি ন্যাপকিনের নামই জানতেন না। ব্যবহার তো ছিল আরও দূরের বিষয়। মাসিকের সময় পুরোনো কাপড়, তুলাসহ নানা অনিরাপদ উপকরণ ব্যবহার করতেন তারা। স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে ধারণাও ছিল সীমিত।

গোড়াদিঘায় হাতে গোনা কয়েকটি ফার্মেসি। সেখানকার অনেক কর্মীও জানতেন না পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্যবিধি কিংবা স্যানিটারি ন্যাপকিনের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে। ফলে মাসিক নিয়ে কথা বলা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ নেওয়া কিংবা নিরাপদ উপকরণ ব্যবহার— সবই ছিল অনেকটা অচেনা বিষয়।

এই বাস্তবতায় গোড়াদিঘার নারীদের সচেতন করতে শুরু হয় ‘নিরাপদ পিরিয়ড, সবার অধিকার’ উদ্যোগ। সান কমিউনিকেশনস লিমিটেডের পরিকল্পনায়, ওএনজেড সলিউশনসের সহযোগিতায় এবং স্টেসেইফ স্যানিটারি ন্যাপকিনের উদ্যোগে নেওয়া হয় এই কার্যক্রম।

হাওর এলাকায় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম যেহেতু নৌকা, তাই সচেতনতামূলক কার্যক্রমেও ব্যবহার করা হয় নৌকা। আয়োজন করা হয় বিশেষ ‘আনন্দ মেলা’। উদ্দেশ্য— গ্রামের নারীদের এক জায়গায় নিয়ে আসা এবং আনন্দের পরিবেশে পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন করা।

মেলা সংলগ্ন নদীর ঘাটে রাখা হয় স্টেসেইফের তিনটি বিশেষ নৌকা। সেখানে নারীরা পান প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা পরামর্শ। পাশাপাশি তাদের মধ্যে বিতরণ করা হয় তিন মাসের বিনামূল্যের স্যানিটারি ন্যাপকিন।

শুধু নারীদের নয়, সচেতন করা হয় স্থানীয় ফার্মেসির মালিক ও কর্মীদেরও। পিরিয়ড ও স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের বিষয়ে দেওয়া হয় বিশেষ প্রশিক্ষণ। ফার্মেসিতে আসা ক্রেতাদের মধ্যেও বিতরণ করা হয় সচেতনতামূলক ব্যাগ।

সেই ব্যাগে ছিল অভিভাবকদের উদ্দেশে বার্তা— মেয়ের মাসিককালীন স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান। নিরাপদ উপকরণ ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরে বলা হয়, মেয়েদের সাধ্যের মধ্যে থাকা নিরাপদ স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের সুযোগ দিতে।

হাওরের নারীদের অবসর বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম লুডু। সেই লুডুকেও কাজে লাগানো হয় সচেতনতার মাধ্যম হিসেবে। তৈরি করা হয় বিশেষ ‘সাপ-লুডু’, যেখানে সাপের মুখে লেখা থাকে বন্ধ্যাত্ব, ইনফেকশনসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা। খেলার ছলে দেওয়া হয় স্বাস্থ্যকর পিরিয়ড সম্পর্কে নানা বার্তা।

গোড়াদিঘার একমাত্র স্কুলেও চলে সচেতনতামূলক কার্যক্রম। শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা হয় বিশেষ ক্লাস। আয়োজন করা হয় উঠান বৈঠক। পিরিয়ড নিয়ে সংকোচ না করে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা হয়।

তবে শুধু কয়েক দিনের সচেতনতামূলক কার্যক্রমেই থেমে থাকেনি উদ্যোগটি। স্থায়ী সমাধানের অংশ হিসেবে গোড়াদিঘায় তৈরি করা হয় ‘স্টেসেইফ গার্ল’। তাদের কাছ থেকে নারীরা বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন সংগ্রহ করতে পারেন। তিন মাস পরও মিলবে অর্ধেক দামে প্যাড। পাশাপাশি স্থানীয় ফার্মেসিগুলোতেও স্বল্পমূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখার ব্যবস্থা করা হয়।

স্টেসেইফের হেড অব মার্কেটিং নয়ন রায় বলেন, এই সময়ে দাঁড়িয়ে কোনো গ্রামের মেয়েরা যদি স্যানিটারি ন্যাপকিন সম্পর্কে না জানে, সেটি শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয় নয়; সমান সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় বাধা। তাই শুধু পণ্য পৌঁছে দেওয়া নয়, অভ্যাস ও সচেতনতার পরিবর্তনই ছিল তাদের লক্ষ্য।

সান কমিউনিকেশনসের গ্রুপ কপি হেড রিয়াজুল আলম শাওন বলেন, গোড়াদিঘার নারীদের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা জানার পর তাদের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকেই এই উদ্যোগ। সাময়িক সহায়তার পাশাপাশি স্থায়ী পরিবর্তন আনার লক্ষ্যেই কাজ করা হয়েছে।

সান কমিউনিকেশনের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর তানভীর সিকদার বলেন, দেশের অনেক মেয়েই যখন নানা ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন গোড়াদিঘার নারীদের এমন বাস্তবতা তাদের নাড়া দিয়েছে। তাই সততার সঙ্গে কাজটি করার চেষ্টা করেছেন তারা।

কয়েক মাস পর বদলে গেছে গোড়াদিঘার চিত্র

স্টেসেইফের উদ্যোগের কয়েক মাস পর গোড়াদিঘায় গিয়ে দেখা যায় পরিবর্তনের চিত্র। বদলেছে শুধু স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের অভ্যাস নয়; বদলেছে পিরিয়ড নিয়ে কথা বলার সংস্কৃতিও।

যে বিষয় নিয়ে আগে কথা বলতে সংকোচ ছিল, এখন তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে স্কুলে, উঠানে, নৌকায়— এমনকি খেলতে খেলতেও।

স্কুলছাত্রী ইসমা বলে, আগে তারা এসব বিষয়ে জানত না। স্টেসেইফের মেলার মাধ্যমে পিরিয়ড ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে জানতে পেরেছে তারা।

তৃপ্তি আক্তারের ভাষ্য, স্টেসেইফের কার্যক্রমের মাধ্যমে শুধু তিনি নন, এলাকার অনেক নারীই স্যানিটারি প্যাড সম্পর্কে জানতে পেরেছেন এবং এখন প্যাড ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে।

আরেক ছাত্রী কাজেফা আক্তার জানায়, আগে তারা কাপড় ব্যবহার করত। এখন স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়ায় পিরিয়ডের সময় স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আবদুল মোতালিব বলেন, আগে এই জনপদের নারীদের মধ্যে সচেতনতা ছিল কম। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং প্যাড সহজলভ্য করার উদ্যোগ এই পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

পল্লী চিকিৎসক আনোয়ার হোসেনও বলছেন, বছরখানেক আগেও এখানকার নারীদের বড় একটি অংশ পিরিয়ড ও স্যানিটারি প্যাড সম্পর্কে খুব বেশি জানতেন না। এখন অধিকাংশ নারীই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন এবং প্যাড ব্যবহার করছেন।

স্থানীয়দের হিসাবে, বর্তমানে গোড়াদিঘার প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মেয়ে স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করছে। সচেতন হয়েছেন অভিভাবকরাও। অনেক বাবা-মা এখন নিজেরাই মেয়েদের জন্য প্যাড কিনে দিচ্ছেন।

একসময় যে গ্রামে স্যানিটারি ন্যাপকিনের নামই অচেনা ছিল, সেখানেই এখন নিরাপদ পিরিয়ড নিয়ে হচ্ছে আলোচনা। বদলে যাচ্ছে অভ্যাস, কমছে সংকোচ।

গোড়াদিঘার এই পরিবর্তন তাই শুধু একটি পণ্য ব্যবহারের গল্প নয়; এটি দুর্গম এক হাওর জনপদের নারীদের সচেতনতা, স্বাস্থ্যবোধ ও মর্যাদা ফিরে পাওয়ার গল্প।

এই নতুন আলো ছড়িয়ে পড়ুক দেশের প্রতিটি প্রান্তে। কারণ—'নিরাপদ পিরিয়ড, সবার অধিকার।' 

/এনএ 


Logo