×
Logo

অন্যান্য

মানবপাচার নিয়ে রচনা লিখে পুরস্কার পেলেন ৩১ শিক্ষার্থী

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৮:১০ পিএম

মানবপাচার নিয়ে রচনা লিখে পুরস্কার পেলেন ৩১ শিক্ষার্থী

'মানুষ বিক্রির জন্য নয়'— বাক্যটি খুব ছোট হলেও ভীষণ অর্থবহ। ছোট্ট এই বাক্য দিয়েই মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান সম্পর্কিত বিষয়ে রচনা ও বার্তা লিখেছে নারায়ণগঞ্জের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান।

নুসরাতের মতো সারা দেশে থেকে ৮৭০ জন শিক্ষার্থী মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বিষয়ে তাদের ভাবনা ও সমাধান নিয়ে রচনা লিখেছিলেন। এদের মধ্যে ৩১ জনের রচনা ফাইনালিস্ট হিসেবে পেয়েছে পুরস্কার ও সনদ। আর দুই ক্যাটাগরিতে সেরা হয়েছে ছয়জন।

সাহিত্যগবেষক ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আজিজুল হক এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।

এতে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন লেখক, গবেষক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আফসান চৌধুরী, সাংবাদিক রাজীব নূর এবং কথাসাহিত্যিক কিযী তাহনিন।

মানব পাচার, অভিবাসী চোরাচালান এবং সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মিত অভিবাসন সম্পর্কে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের লক্ষণ চিহ্নিত করার সক্ষমতা তৈরি, সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মিত যাত্রার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ, নিয়মিত ও বৈধ অভিবাসনের গুরুত্ব তুলে ধরার লক্ষ্যে এই রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

‘অষ্টম শ্রেণি থেকে কলেজ পর্যায়’ এবং ‘বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়’, এই দুটি বিভাগে প্রতিযোগিতার মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে সিনিয়র ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিলয় বিশ্বাস। রানারআপ হয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ফাহাদ হোসেন ফাহিম।

জুনিয়র ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন কক্সবাজার জেলার খুরুশকুল হাইস্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাদ্রাতুন নাঈম তাকওয়া। যৌথভাবে প্রথম রানারআপ হয়েছেন টেকনাফের শহীদ আজিজুল হক বালিকা মাদ্রাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া সালমা এবং টেকনাফের সাবরাং উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরাফাত শাহীন কমল। তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে গাজীপুরের পিরুজালী আদর্শ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সেজুতি আক্তার আয়েশা।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সাহিত্যগবেষক ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আজিজুল হক নিজের বক্তব্যে বলেন, “এ দেশে পাচারকারীরা সফল হয়, কারণ আমাদের আর্থিক দারিদ্র্যের চেয়ে শিক্ষার দারিদ্র্য অনেক বেশি। যারা পাচারের শিকার হচ্ছেন এবং দুর্বিষহ জীবনের মুখোমুখি হচ্ছেন, এটা শুধু তাঁদের বিষয় নয়, গোটা জাতির বিষয়। পাচার প্রতিরোধের দায়িত্ব সবার। রচনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের মাধ্যমে এই বার্তাগুলো সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। এটি দারুণ উদ্যোগ”

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক ও কথাসাহিত্যিক আফসানা বেগম নিজের মালয়েশিয়া প্রবাস জীবনে দেখা অনেক বাংলাদেশির দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে বলেন, সচেতনতার মাধ্যমে অনেক মানুষকে বিপদ থেকে রক্ষা করা যায়।

অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মাইগ্রেশন কর্মসূচির পরিচালক সাফি রহমান খান বলেন, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধের লড়াই মূলত মানুষের মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ অভিবাসনের অধিকার নিশ্চিত করার লড়াই। আমরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেক দিন ধরে কাজ করছি। আমরা দেখেছি, যেখানে শিক্ষার্থীরা যুক্ত হয়, সেখানেই ইতিবাচক পরিবর্তন হয়। তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই এই রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল।

অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, 'বিশ্বে অভিবাসী প্রেরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ছয় নম্বরে। বিদেশে যারা যায়, আমরা তাদের কামলা বলি। অথচ তাঁদের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি চলে। কিন্তু পাঠ্যবইয়ে এই কামলাদের জীবনের কোনো কথা উঠে আসে না। এটা নিয়ে আমরা শিক্ষার্থীদের কথা জানতে চেয়েছি। তাঁদের সম্পৃক্ত করার একটি চেষ্টা করেছি। এটা শুধু প্রতিযোগিতা আর পুরস্কারের অংশ নয়। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা শিক্ষার্থীদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া।'

জুনিয়র বিভাগের রানারআপ টেকনাফের দশম শ্রেণির ছাত্র আরফাত শাহীন তাঁর নিজের এলাকায় মানব পাচারের ভয়াবহ প্রবণতার কথা উল্লেখ করে বলেন, 'টেকনাফে মানব পাচার ও অপহরণ খুব সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষকে অপহরণ করে টাকা দাবি করা হয়। পাচার করে নির্যাতন করা হয়। সেগুলো ভিডিও করে পরিবারের কাছে টাকা দাবি করা হয়। পরিবার সহ্য করতে না পেরে সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা পাঠায়। টেকনাফে যেন এগুলো খুব স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠেছে। এই সমস্যার সমাধান জরুরি।'

প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের একজন, ঢাকার ওয়াইডব্লিউসিএ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোবাশশিরা আনজুম বলেন, 'যখন রচনা লেখার জন্য আমি তথ্য সংগ্রহ করছিলাম, পড়ছিলাম, তখন আমি প্রথম জানলাম যে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের পরিসর কতটা বিশাল আর এর ভয়াবহতা কতটা মারাত্মক।'

অনুষ্ঠানে কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে ফিরে আসা মন্নান ছৈয়াল এবং কক্সবাজারের মানব পাচার সারভাইভার অংঅংও জুয়েল তাঁদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে দেশবাসীকে এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহবান জানান।

মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে গণসচেতনতামূলক প্রচারণা কর্মসূচির আওতায় সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। অস্ট্রেলিয়ান বর্ডার ফোর্স ও ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী, তাঁদের শিক্ষক ও অভিভাবকেরা উপস্থিত ছিলেন।

/এমএইচআর

Logo