×
Logo

জীবনযাপন

একাধিক ভাষায় পড়াশোনা শিশুর মস্তিষ্ককে কীভাবে প্রভাবিত করে

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১১ পিএম

একাধিক ভাষায় পড়াশোনা শিশুর মস্তিষ্ককে কীভাবে প্রভাবিত করে

সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনেক শিশু স্কুলে ইংরেজিতে পড়াশোনা করে। আবার বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে আরবিতে কথা বলে। কেউ কেউ এর পাশাপাশি চীনা ভাষাও শেখে।

এতে অনেক অভিভাবকের প্রশ্ন—একাধিক ভাষায় পড়াশোনা করলে কি শিশুর মস্তিষ্ক আরও সক্রিয় হয়, নাকি এতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়?

সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক দুই গবেষক জায়েদ ইউনিভার্সিটির ড. ফাতমা সাঈদ এবং ইউএই ইউনিভার্সিটির ড. ইউয়ান মেং এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। রিডিং ফর প্লেজার কারাভান নামের একটি আয়োজনে তারা জানান, ভিন্ন ভাষায় পড়ার সময় শিশুর মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে এবং কেন পড়ার আনন্দ গুরুত্বপূর্ণ।

ড. ইউয়ান মেং চীনা অক্ষর কীভাবে পাঠকের মস্তিষ্কে প্রক্রিয়াজাত হয়, তা নিয়ে গবেষণা করেন। তার মতে, প্রতিটি লেখার পদ্ধতি মস্তিষ্কের সামনে আলাদা ধরনের ধাঁধা তৈরি করে।

তিনি বলেন, চীনা ভাষায় শব্দের মাঝে সাধারণত ফাঁকা জায়গা থাকে না। ফলে কোন অক্ষরগুলো একসঙ্গে একটি শব্দ তৈরি করছে, তা পাঠককে বুঝে নিতে হয়। আবার একটি অক্ষরের ভেতরের ছোট অংশগুলোও শব্দের অর্থ বা উচ্চারণ সম্পর্কে ইঙ্গিত দিতে পারে।

আরবি ও ইংরেজির ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে। আরবি ভাষায় মূল অক্ষর ও নির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে শব্দ তৈরি হয়। অন্যদিকে ইংরেজিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অক্ষরের অবস্থান সামান্য পরিবর্তিত হলেও পাঠক শব্দটি চিনতে পারেন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ইংরেজিতে অক্ষরের ক্রম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গবেষণার ফল কাজের ধরন ও পাঠকের ওপরও নির্ভর করতে পারে বলে জানান ড. মেং।

ড. মেং বলেন, যে লেখার পদ্ধতিই ব্যবহার করা হোক না কেন, মস্তিষ্ককে পৃষ্ঠায় দেখা চিহ্নের সঙ্গে ভাষার যোগসূত্র তৈরি করে বার্তাটির অর্থ বুঝতে হয়।

লিপি আলাদা হলেও তিন ভাষাতেই মস্তিষ্কের মূল লক্ষ্য একই—অর্থ বোঝা।

তবে কোন ধরনের সংকেত ব্যবহার করে অর্থ বোঝা হবে, সেটিই ভাষাভেদে আলাদা। 

আরবি ভাষাভাষী শিশুদের জন্য বিষয়টি আরও কিছুটা জটিল। বাড়িতে তারা সাধারণত স্থানীয় আরবি উপভাষায় কথা বলে। কিন্তু লিখিত আরবিতে ব্যবহৃত হয় আধুনিক প্রমিত আরবি বা ফুসহা, যার শব্দভান্ডার ও ব্যাকরণ আলাদা। ভাষাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে ‘ডাইগ্লসিয়া’ বলা হয়।

জায়েদ ইউনিভার্সিটির অ্যাপ্লাইড লিঙ্গুইস্টিকসের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফাতমা সাঈদের মতে, এটি সমস্যা না হয়ে বরং সুযোগও হতে পারে।

তার মতে, এর ফলে শিশুর মস্তিষ্ককে আরও বেশি শব্দভান্ডার, বাক্যগঠন এবং অর্থ প্রকাশের বিভিন্ন পদ্ধতি শিখতে হয়।

গবেষণা বলছে, একটি ভাষায় শেখা অনেক দক্ষতা অন্য ভাষায়ও কাজে লাগতে পারে। আরবি ভাষার ধ্বনি ও অক্ষর শেখা শিশুরা ইংরেজি পড়ার ক্ষেত্রেও ইংরেজিভাষী একভাষী শিশুদের সমপর্যায়ে করতে পারে। এমনকি কিছু শিশু প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ইংরেজি বানান করতে পারে, কারণ আরবি বানানের নিয়ম তুলনামূলকভাবে নিয়মিত।

শিশুদের আরবি পড়তে সমস্যার জন্য প্রায়ই ডাইগ্লসিয়াকে দায়ী করা হয়। তবে ড. সাঈদ এ ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন।

তার মতে, আরবি ভাষায় ডাইগ্লসিয়া একটি বাস্তব বিষয় হলেও এটি পড়ার সমস্যার প্রধান কারণ—এমন প্রমাণ দুর্বল। বরং আরবি পড়তে শেখার ক্ষেত্রে শিক্ষার মান, ছোটবেলা থেকেই ফুসহা ভাষার সংস্পর্শ এবং বাড়িতে পড়াশোনার পরিবেশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুরা ছোটবেলা থেকেই আরবির বিভিন্ন রূপের সংস্পর্শে এলে তা তাদের জন্য উপকারী হতে পারে। তার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু ফুসহা ভাষায় কার্টুন দেখেছে এবং গল্প শুনেছে, তাদের আরবি শব্দভান্ডার এমন শিশুদের তুলনায় বড় ছিল, যারা আরবিতে কথা বললেও শুধু ইংরেজি ভাষার কার্টুন দেখেছে।

এদিকে, চীনা ও ইংরেজির মতো সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি লেখার পদ্ধতি একসঙ্গে শেখা শিশুর জন্য একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন ড. মেং।

তার মতে, চীনা ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই অর্থবোধক অংশ মিলিয়ে শব্দ তৈরি হয়। উদাহরণ হিসেবে ইংরেজির ‘ব্ল্যাকবোর্ড’ এবং চীনা ‘হেই বান’-এর কথা বলা যায়। দুটিতেই ‘কালো’ ও ‘বোর্ড’—এই দুটি অর্থ একত্রিত হয়েছে।

এক ভাষায় অর্থবোধক অংশ খুঁজে বের করার অভ্যাস অন্য ভাষা শেখার ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে। তবে প্রতিটি ভাষার নিজস্ব লেখা ও উচ্চারণ আলাদাভাবে শিখতে হবে।

শৈশবে আনন্দ নিয়ে বই পড়ার দীর্ঘমেয়াদি উপকারও রয়েছে। একটি ব্রিটিশ গবেষণায় দেখা গেছে, ছোটবেলায় আনন্দের জন্য বই পড়ার সঙ্গে বড় বয়সে ভালো শব্দভান্ডারের সম্পর্ক রয়েছে। তবে এটিকে সরাসরি কারণ-ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

গবেষকদের মতে, শিশু যেন পড়াশোনাকে চাপ হিসেবে না দেখে, সেদিকে অভিভাবকদের খেয়াল রাখা জরুরি।

ড. ফাতমা সাঈদের মতে, শিশুকে ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভালোবাসা ও আবেগের সম্পর্ক তৈরি করা। বাবা-মা যদি গল্প, খেলা, পড়া ও ভালোবাসার মাধ্যমে ঘরে একটি ভাষা ব্যবহার করেন, তাহলে শিশুর সেই ভাষার প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

তথ্যসূত্র: গালফ নিউজ 

/এএন

Logo