শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে একজন মানুষের পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন। তবে বয়সভেদে ঘুমের চাহিদায় ভিন্নতা দেখা যায়। কিন্তু বিপত্তি বাধে তখনই, যখন কারও কারও পর্যাপ্ত ঘুম হয় না। এর প্রভাব পড়ে পরবর্তী দিনের কাজের মনোযোগ ও কর্মক্ষমতায়। এমন সমস্যায় ভুগছেন অনেক মানুষই। কেউ কেউ আবার রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিলস দেখে সময় কাটিয়ে দেন, ফলে কমে যায় ঘুমের পরিমাণ। কারণ হিসেবে বলতে শোনা যায়, ঘুম আসে না।
যদিও মাঝেমধ্যে আমাদের সবারই কমবেশি ঘুমের সমস্যা হয়, কিন্তু যখন অনিদ্রা দিনের পর দিন চলতে থাকে, তখন তা একটি বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে। ঘুমের অভাবে মানুষের শুধু ক্লান্ত ও খিটখিটে করে তোলে না, এটি স্বাস্থ্যের ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। এতে করে স্থূলতা, হৃদরোগ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে এমন সমস্যায় অনেকেই ঘুমের ওষুধের আশ্রয় নেন। কিন্তু এসব ওষুধেরও থাকতে পারে নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষুধার পরিবর্তন, মাথা ঘোরা, তন্দ্রাভাব, পেটে অস্বস্তি, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, মাথাব্যথা এবং অস্বাভাবিক স্বপ্ন দেখা।
তবে স্বাভাবিক পর্যাপ্ত ঘুমের জন্য যেসব বিষয় মেনে চলতে পারেন, সেগুলো নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো:
ব্যায়াম করুন
প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস শুধু ওজন কমাতেই সাহায্য করে না বরং এটি রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার সমস্যাও কমাতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম শরীরে মেলাটোনিনের মতো ঘুমের হরমোনের কার্যকারিতা বাড়ায়। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ব্যায়াম না করাই ভালো, এতে শরীর আরও সক্রিয় হয়ে যেতে পারে। সকালে সূর্যের আলোতে ব্যায়াম করলে শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম ঠিক থাকে, যা ভালো ঘুমে সহায়তা করে।
বিছানা শুধু ঘুমের জন্য রাখুন
বিছানায় বসে ফোনে কথা বলা, মেসেজ করা বা ই-মেইলের কাজ করা এড়িয়ে চলুন। রাতে দেরি করে বিছানায় শুয়ে টিভি দেখার অভ্যাসও ভালো নয়। বিছানা যেন শুধু ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে, জেগে থাকার জায়গা না হয়। তাই ঘুম ও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ সময় ছাড়া অন্য কাজে বিছানা ব্যবহার না করাই ভালো।
আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করুন
শুধু টিভি বা স্মার্টফোন নয়, শোবার ঘরের পরিবেশও ঘুমের মানে প্রভাব ফেলে। তাই ঘরকে যতটা সম্ভব আরামদায়ক রাখুন। ভালো ঘুমের জন্য ঘরের পরিবেশ শান্ত, অন্ধকার ও কিছুটা ঠান্ডা হওয়া ভালো। এসব বিষয় দ্রুত ঘুম আসতে এবং গভীর ঘুমে সহায়তা করে।
ঘুমের জন্য নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করুন
শৈশবে ঘুমানোর আগে গল্প শোনা বা মায়ের আদর যেমন সহজে ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করতো, বড় হওয়ার পরও ঘুমের আগে নির্দিষ্ট কিছু অভ্যাস একইভাবে কাজে আসতে পারে। ঘুমানোর আগে নিয়মিত কিছু রুটিন মেনে চললে শরীর ও মস্তিষ্ক বুঝতে পারে যে এখন বিশ্রামের সময়। যেমন, এক গ্লাস গরম দুধ পান করা, গোসল করা বা রিলাক্স টাইপের গান শোনা। এসব অভ্যাস ঘুমের প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করে।
ঘুমানোর আগে ভারী খাবার খাবেন না
খালি পেট যেমন ঘুমে বাধা দিতে পারে, তেমনি অতিরিক্ত খেয়ে ফেললেও অস্বস্তি হতে পারে এবং ঘুমের সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই ঘুমানোর দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে ভারী খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলুন। তবে ঘুমানোর আগে ক্ষুধা লাগলে হালকা ও স্বাস্থ্যকর কিছু খেতে পারেন। এই ধরুন একটি আপেলের সঙ্গে সামান্য চিজ বা কয়েকটি হোল-হুইট বিস্কুট। এতে সকালের নাশতা পর্যন্ত ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
অ্যালকোহল ও ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন
ঘুমানোর আগে হালকা খাবার খেলেও ওয়াইন বা চকলেট এড়িয়ে চলুন। চকলেটে থাকা ক্যাফেইন ঘুমে বাধা দিতে পারে। অ্যালকোহলও প্রথমে ঘুমঘুম ভাব তৈরি করলেও পরে রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়াও অ্যাসিডযুক্ত খাবার যেমন—সাইট্রাস ফল ও ফলের রস, এবং ঝাল খাবার এড়িয়ে চলুন। এগুলো বুকজ্বালা তৈরি করে ঘুমের সমস্যা বাড়াতে পারে।
মানসিক চাপ কমান
দিনের দুশ্চিন্তা ও কাজের চাপ অনেক সময় রাতে ঘুমের সময়ও মাথায় ঘুরতে থাকে। মানসিক চাপ শরীরকে এমনভাবে সক্রিয় করে, যা ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়। তাই ঘুমানোর আগে নিজেকে শান্ত করার জন্য কিছুটা সময় দিন। গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা অন্য কোনো শিথিল হওয়ার কৌশল চেষ্টা করতে পারেন। এতে ভালো ঘুমের পাশাপাশি দিনের উদ্বেগও কমতে পারে।
দিনের বেলা ঘুমানো এড়িয়ে চলুন
দিনের বেলা ঘুমালে রাতে স্বাভাবিক ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। একান্ত প্রয়োজন হলে, যেমন আগের রাতে কম ঘুম হলে, সর্বোচ্চ ২০ মিনিটের মতো ঘুমাতে পারেন। তবে রাতে ঘুমানোর আগে অন্তত ৪ ঘণ্টা জেগে থাকা জরুরি। টিভি দেখার সময় ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন, এমনকি সেটা এক মিনিটের জন্যও নয়।
চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
কিছু সমস্যা যেমন ঘুমরে সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে, এই যেমন- পা নড়ানোর অস্বস্তি, নাক ডাকা, পেট, বুক বা গলায় জ্বালাপোড়া। এগুলো রেস্টলেস লেগস সিনড্রোম, স্লিপ অ্যাপনিয়া বা জিইআরডির মতো সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এসব কারণে রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
তথ্যসূত্র: স্লিপ হেলথ ফাউন্ডেশন, হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং
/এসআইএন