×
Logo

জীবনযাপন

কিছু মানুষকে মশা বেশি কামড়ায়, কেন?

মায়িশা মালিহা

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৭ এএম

কিছু মানুষকে মশা বেশি কামড়ায়, কেন?

বন্ধুদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের টংয়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছেন। খোশগল্পে যখন সবার মনোযোগ তুঙ্গে, ঠিক তখনই হঠাৎ একজনের চিৎকার, ‘ভাই, আমি আর বসবো না! আমাকে প্রচুর মশা কামড়াচ্ছে।’ পাশ থেকে আরেকজন বলল, ‘কই, আমাকে তো একটা মশাও ছুঁয়েও দেখছে না!’ আরেকজন খোঁচা মেরে বলেই ফেললো, ‘আরে, মশা-টশা কিছু না। রুমে গিয়ে পড়াশোনা করবে, তাই নাটক করছে!’

এই দৃশ্যটা আমাদের সবার কাছেই বেশ পরিচিত, হয়তো প্রেক্ষাপট ভিন্ন। কিন্তু মজার বিষয় হলো, একই জায়গায় বসে থেকেও কেন একজনকে মশা বেশি কামড়ায়, আর অন্যজনকে প্রায় ছুঁয়েও দেখে না? আসলে কি সত্যিই এমনটা ঘটে? এমন প্রশ্নের জট খোলার চেষ্টা করবো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায়।

কার্বন ডাই-অক্সাইড

মশাদের আকৃষ্ট করার পেছনে মূল কারণ কার্বন ডাই-অক্সাইড। কারণ, নিঃশ্বাস এবং ত্বক থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড মশাকে আকর্ষণ করে। তবে গায়ের বা চুলের রঙের কোনো প্রভাব থাকে না। মশারা প্রায় ১০ মিটার বা ৩৩ ফুট দূর থেকে তাদের সূক্ষ্ম গ্রাহক অঙ্গ (রিসেপ্টর)-এর সাহায্যে এসব সংকেত শনাক্ত করে। এরপর কাদের কামড়াবে, তা বেছে নেয়।

সে কারণে দেখা যায়, শিশুদের তুলনায় প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি মশা বেশি আকৃষ্ট হয়। কেননা, প্রাপ্তবয়স্কদের দেহ থেকে তুলনামূলক বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। সাধারণত শুধু স্ত্রী মশাই মানুষকে কামড়ায়। ডিম পাড়ার জন্য স্ত্রী মশার রক্তের প্রয়োজন হয়। পুরুষ মশা ফুলের রেণু ও মধু খেয়ে বেঁচে থাকে।

তাপ-আর্দ্রতা

গবেষণায় দেখা গেছে, মশারা তাপ এবং আর্দ্রতার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। সাধারণভাবেই গ্রীষ্ম বা বর্ষাকালে মশার সংখ্যাও বেড়ে যায়। আবার শীতে মশার প্রকোপ কমে যায়। কেননা মশারা কম তাপমাত্রায় টিকে থাকতে পারে না। গরমের সময় দেহ থেকে স্বাভাবিকভাবেই অনেক উত্তাপ ছড়ায়। মশারা তাপ ও আর্দ্রতার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ায় দেখা যায়, এরা গর্ভবতী কিংবা ওজনে বেশি এমন মানুষদের লক্ষ্য করে। আরও দেখা যায়, ব্যায়াম করার পরে বা ঘর্মাক্ত অবস্থায় দেহের তাপমাত্রা বেশি থাকায় মশার কাছে সেসব মানুষ বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য কীটতত্ত্বের অধ্যাপক স্টিভ লিন্ডসে বলেন, দেহে থাকা ক্ষুদ্র রাসায়নিক পদার্থ নির্ধারণ করে দেয় শরীরের গন্ধ, যা মশাকে সংকেত দেয় কাকে কামড়াবে, অর্থাৎ কে বেশি আকর্ষণীয়। মানুষের ত্বকে থাকা অ্যামোনিয়া, ল্যাকটিক অ্যাসিড এবং কার্বক্সিলিক অ্যাসিড মশার আকর্ষণ ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে। সুতরাং দেখা যায়, যাদের দেহে কার্বক্সিলিক অ্যাসিড বেশি পরিমাণে আছে, তাদের মশা বেশি কামড়ায়।

মানবদেহের ব্যাকটেরিয়া

মশা কামড়ানোর পেছনে আরও একটি কারণ মানবদেহে থাকা ব্যাকটেরিয়া। একেকজনের শরীরে ব্যাকটেরিয়ার প্রকার বা সংখ্যা কমবেশি হওয়ার কারণেও গন্ধের তারতম্য হয়। এদিকে যমজদের ওপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, অভিন্ন যমজদের মশা একভাবে কামড়ালেও ভিন্ন যমজদের ক্ষেত্রে আলাদা হয়। শরীরের গন্ধ কিংবা মশাকে আকৃষ্ট করার পেছনে বংশগত কিংবা জিনগত প্রভাবও রয়েছে।

মশা যেসব রোগ ছড়ায়

মশা এখন এক আতঙ্কের নাম। কেননা স্ত্রী মশা কামড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ বহন করে। কিছু পরিচিত মশা যেমন—স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়ার জীবাণু, এডিস মশা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও পীতজ্বর (ইয়েলো ফিভার)-এর জীবাণু এবং কিউলেক্স মশা ফাইলেরিয়া বা গোদ রোগের জীবাণু ছড়িয়ে বেড়ায়। বাংলাদেশে ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া রোগের প্রকোপ অনেক বেশি।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরে দেশে জুলাই মাসেই রেকর্ড ৯ হাজার ২০৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ৩৬ জন। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের চলতি বছরের ৩১ জুলাই দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ হাজার ৩১০ জন এবং মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৫৪ জনে দাঁড়িয়েছে। 

মশা থেকে যেভাবে রক্ষা পাবেন

মশার কামড় একেকজনের ওপর একেকভাবে প্রভাব ফেলে। কারও শুধু একটু লাল দাগ হয়, আবার কারও শরীরে চাকা চাকা হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ সরকারও এখন মশা নিধনে সিটি করপোরেশন, জেলা ও উপজেলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়াও মশার কামড় থেকে বাঁচতে বা মশার বংশবিস্তার রোধ করতে আবাসস্থলের আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং ফুলের টব বা কোথাও যেন ময়লা পানি জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখলে মশার কামড় থেকে অনেকটাই রক্ষা পাওয়া যাবে, এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

/এসআইএন

Logo