রান্নাঘরে দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে এয়ার ফ্রায়ার
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম
এয়ার ফ্রায়ার একটি আধুনিক ইলেকট্রনিক রান্নার যন্ত্র, যা তেলে ডুবিয়ে ভাজার পরিবর্তে গরম বাতাসের মাধ্যমে খাবার রান্না করে। দেখতে অনেকটা ছোট ওভেন বা রাইস কুকারের মতো হলেও এর ভেতরে থাকে একটি পাখা (ফ্যান) ও হিটিং এলিমেন্ট। এগুলো একসঙ্গে কাজ করে খাবারের চারপাশে দ্রুত গরম বাতাসের প্রবাহ তৈরি করে।
এই প্রযুক্তিকে বলা হয় র্যাপিড এয়ার টেকনোলজি। এর মাধ্যমে খুব কম তেল ব্যবহার করে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তেল ছাড়াই খাবারকে মচমচে করে তোলা সম্ভব হয়।
গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে এয়ার ফ্রায়ারের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। বাংলাদেশেও বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারের রান্নাঘরে এর ব্যবহার বাড়ছে।
কীভাবে কাজ করে এয়ার ফ্রায়ার
এয়ার ফ্রায়ারের কাজ মূলত তিনটি ধাপে বোঝা যায়—
১. উচ্চ তাপমাত্রায় বাতাস গরম করা: যন্ত্রের ভেতরের হিটিং এলিমেন্ট বাতাসকে দ্রুত ১৮০ থেকে ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত গরম করে।
২. পাখার মাধ্যমে বাতাস সঞ্চালন: ভেতরের শক্তিশালী ফ্যান গরম বাতাস খাবারের চারপাশে দ্রুতগতিতে ঘোরাতে থাকে। ফলে খাবার সব দিক থেকে সমানভাবে রান্না হয়।
৩. ম্যালার্ড রিঅ্যাকশন তৈরি: গরম বাতাসের কারণে খাবারের বাইরের অংশ বাদামি ও মচমচে হয়ে ওঠে, যা অনেকটা তেলে ভাজার মতো। তবে এতে তেলের পরিমাণ অনেক কম লাগে।
ফলে খাবার বাইরে থেকে মচমচে এবং ভেতরে নরম থাকে, কিন্তু প্রচলিত ভাজার তুলনায় তেল ব্যবহার হয় অনেক কম।
এয়ার ফ্রায়ারে কী রান্না করা যায়
এয়ার ফ্রায়ার শুধু ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা আলুর চিপস তৈরির জন্য নয়, এটি একটি বহুমুখী রান্নার যন্ত্র। এতে তৈরি করা যায়—
ভাজাভুজি: চিকেন ফ্রাই, ফিশ ফ্রাই, চিংড়ি ফ্রাই, সিঙ্গাড়া, সমুচা, পেঁয়াজু, বেগুনি
গ্রিল ও রোস্ট: মুরগির রোস্ট, কাবাব, স্টেক, সবজি রোস্ট
বেকিং: কেক, কুকিজ, মাফিন, এমনকি ছোট পাউরুটিও
রিহিট করা: আগের দিনের ভাজা খাবার বা পিৎজা পুনরায় মচমচে করে গরম করা
ডিহাইড্রেট করা: ফলের চিপস বা শুকনো নাশতা তৈরি
বাংলাদেশের রান্নাঘরে এয়ার ফ্রায়ার
বাংলাদেশি খাবারের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে ভাজাভুজি—যেমন বেগুনি, পেঁয়াজু, আলুর চপ, চিকেন ফ্রাই, সিঙ্গাড়া ও সমুচা। এসব খাবার এয়ার ফ্রায়ারে তৈরি করলে তেলের ব্যবহার অনেক কমানো যায়। অনেক পরিবার বিশেষ করে রমজান মাসে কম তেলে ইফতারি তৈরির জন্য এয়ার ফ্রায়ার ব্যবহার করছেন। এই কম তেলে ভাজা ইফতারি এখন অনেক পরিবারেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ছে
শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার কমানোর চেষ্টা করছেন। উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও হৃদরোগের ঝুঁকি নিয়ে সচেতন মানুষের কাছে এয়ার ফ্রায়ার একটি সহজ বিকল্প হয়ে উঠেছে। এয়ার ফ্রায়ার এক্ষেত্রে একটি সহজ সমাধান হিসেবে হাজির হয়েছে—স্বাদে খুব বেশি আপস না করেই তেলের পরিমাণ কমানো যায়।
বাজারে প্রাপ্যতা
বাংলাদেশের ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ও ইলেকট্রনিক্স দোকানে এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও আকারের এয়ার ফ্রায়ার পাওয়া যাচ্ছে। ছোট পরিবারের জন্য ছোট মডেল থেকে শুরু করে বড় পরিবারের জন্য বড় ক্যাপাসিটির ডিজিটাল মডেলও রয়েছে।
দাম ও ফিচার অনুযায়ী ক্রেতারা নিজেদের প্রয়োজন ও বাজেট অনুযায়ী মডেল বেছে নিতে পারছেন। নির্দিষ্ট মডেল ও সর্বশেষ দাম জানতে স্থানীয় শোরুম বা নির্ভরযোগ্য অনলাইন মার্কেটপ্লেস যাচাই করা ভালো, কারণ দাম সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়।
ফুড ব্যবসাতেও ব্যবহার বাড়ছে
শুধু ঘরোয়া ব্যবহারেই নয়, ছোট রেস্তোরাঁ, ক্লাউড কিচেন ও হোম-বেসড ফুড ব্যবসায়ও এয়ার ফ্রায়ারের ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে কম তেলের বা স্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রির উদ্যোগে এটি জনপ্রিয় হচ্ছে।
এয়ার ফ্রায়ারের সুবিধা
প্রচলিত ভাজার তুলনায় ৭০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত কম তেল লাগে।
প্রি-হিটের প্রয়োজন কম, দ্রুত রান্না হয়।
ডুবো তেলে ভাজার মতো ঘরে তীব্র তেলের গন্ধ ছড়ায় না।
বেশিরভাগ মডেলের বাস্কেট নন-স্টিক ও ডিশওয়াশার-সেফ। তাই সহজে পরিষ্কার করা যায়।
গরম তেলের ছিটে পড়া বা আগুন লাগার ঝুঁকি অনেক কম।
তবে এয়ার ফ্রায়ারের কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে
একবারে বেশি পরিমাণ খাবার রান্না করা কঠিন হতে পারে।
সব ধরনের খাবারের স্বাদ ও টেক্সচার একদম ডুবো তেলে ভাজার মতো হুবহু হয়না।
বিদ্যুৎ খরচ যোগ হয়, যদিও গ্যাসের তুলনায় তা সাধারণত সাশ্রয়ী বলে মনে করা হয়।
তরল জাতীয় বা গ্রেভি-সমৃদ্ধ রান্নার জন্য উপযুক্ত নয়।
এয়ার ফ্রায়ার তেলে ভাজা খাবারের পুরো বিকল্প নয়। তবে কম তেল ব্যবহার করে তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর উপায়ে প্রিয় ভাজাভুজি উপভোগ করার একটি আধুনিক মাধ্যম। বাংলাদেশে ভাজা খাবারের জনপ্রিয়তা ও ব্যস্ত নগরজীবনের কারণে স্বাস্থ্য সচেতন পরিবারগুলোর মধ্যে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এই এয়ার ফ্রায়ার।
/এএন