ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ৬০ বছরের অস্বীকারের নীতি এবার ভাঙতে চলেছে?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:২৩ পিএম
ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে গত ছয় দশক ধরে এক ধরনের নীরব সমঝোতা বজায় রেখেছে দুই পরম মিত্র হিসেবে খ্যাত 'যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল'। মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের অধিকারী বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হলেও, কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করেনি তেলআবিব। একইভাবে, বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি ওয়াশিংটনও।
তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, সৌদি আরবের সম্ভাব্য পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের উদ্যোগ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিনের সেই নীতিতে পরিবর্তনের আভাস মিলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির দীর্ঘদিনের অস্পষ্ট অবস্থান এখন নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশেষকরে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে, তখন নিজেদের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে ইসরায়েলের নীরবতা এবং ওয়াশিংটনের সেই নীরবতায় সমর্থন অব্যাহত রাখা কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হচ্ছে।
এই নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের একাংশও প্রশ্ন তুলছেন। তাদের মতে, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য অবস্থান স্পষ্ট করা এখন সময়ের দাবি। কারণ, ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সময় দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সীমা বা সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে অন্ধকারে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
‘টেক্সটাইল কারখানা’ থেকে পারমাণবিক অস্ত্রের গোপন কর্মসূচি
ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহের শুরু ষাটের দশকের গোড়ায়। ১৯৬০ সালের শুরুর দিকে, ইসরায়েলের একটি হেলিকপ্টারে চড়ে, দেশটি সফর করছিলেন কয়েকজন মার্কিন কূটনীতিক। এ সময় তাদের একজন মৃত সাগরের প্রায় ২০ মাইল পশ্চিমে নেগেভ মরুভূমির মধ্যে একটি নির্মাণাধীন স্থাপনা দেখতে পান। বিষয়টি নজরে আসার পর তিনি ইসরায়েলের অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আডি কোহেনের কাছে জানতে চান, সেখানে কী তৈরি হচ্ছে।
জবাবে মার্কিন কূটনীতিকদের কোহেন জানান, সেটি একটি ‘টেক্সটাইল কারখানা’। ওই দলে ছিলেন ইসরায়েলে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওগডেন রিডও।
তবে, হেলিকপ্টার থেকে দেখা সেই নির্মাণাধীন স্থাপনাটি কোনো বস্ত্র কারখানা ছিল না। সেটি ছিল ইসরায়েলের দিমোনা পারমাণবিক স্থাপনা, যা পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিতি পায়।
মার্কিন গোয়েন্দারা নির্মাণকাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য শনাক্ত করার পর কয়েক মাসের মধ্যেই রাষ্ট্রদূত ওগডেন রিড আডি কোহেনের সঙ্গে বৈঠকের দাবি জানান। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভে সংরক্ষিত এবং পরবর্তী সময়ে অবমুক্ত করা একটি গোপন কূটনৈতিক বার্তায় ওই বৈঠকের বিবরণ পাওয়া যায়।
বার্তায় বলা হয়, কোহেন প্রথমে বিষয়টি নিয়ে হাস্যরসের ভঙ্গিতে কথা বললেও শেষ পর্যন্ত এমন ধারণা পাওয়া যায় যে, তিনি বিশ্বাস করেন, ওই চুল্লি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।
এর পাঁচ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে বড় ধরনের ঘাটতি ধরা পড়ে। সেখান থেকে অস্ত্র তৈরির উপযোগী সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কয়েকশ' পাউন্ডের হিসাব পাওয়া যাচ্ছিল না।
মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একাংশের ধারণা ছিল, ওই ইউরেনিয়াম ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচিতে ব্যবহারের জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি, প্রকাশিত একটি প্রামাণ্যচিত্রেও এমন দাবি করা হয়েছে।
এরপর কেটে গেছে প্রায় ছয় দশক। এই দীর্ঘ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল, দুই দেশই বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের কৌশলী নীরবতা বজায় রেখেছে। কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিষয়টি স্বীকার করেনি। বরং ইসরায়েলি কর্মকর্তারা যখন দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতার দিকে পরোক্ষ ইঙ্গিত দিতে চান, তখন আডি কোহেনের সেই ‘টেক্সটাইল কারখানা’ মন্তব্যই এক ধরনের প্রচলিত রূপক হয়ে উঠেছে।
গত ১৪ জুলাই, এক ভাষণে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও দেশটির পারমাণবিক শক্তি কমিশনের প্রধানের সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গে ‘টেক্সটাইল কারখানা’র কথা উল্লেখ করেন।
ইসরায়েলি-আমেরিকান ইতিহাসবিদ আভনার কোহেনের ভাষায়, বিষয়টি এখন বিশ্বের ‘সবচেয়ে খারাপভাবে রক্ষিত গোপন তথ্য’। অর্থাৎ, সবাই জানে বা ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করে যে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, কিন্তু দেশটি কখনো তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে না।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই নীতিকে বলা হয় ‘নিউক্লিয়ার অপাসিটি’ বা পারমাণবিক অস্পষ্টতা। এর মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্বের বিষয়ে সরাসরি অস্বীকার না করেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এড়িয়ে যাওয়া হয়।
দীর্ঘদিন ধরে, এই নীতি, যুক্তরাষ্ট্রকে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক অবস্থান বজায় রাখতে সহায়তা করেছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলকে পারমাণবিক অস্ত্র কীভাবে তৈরি করেছে কিংবা আদৌ করেছে কি না, এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেওয়া থেকে দূরে রেখেছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও যখন পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের দিকে এগোচ্ছে, তখন সেই পুরোনো সমঝোতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। তবে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে কাজ করা শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এসব প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থও হতে পারে। একই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি আরবের মধ্যে একটি পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি কংগ্রেসের পর্যালোচনাধীন রয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সমর্থনেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ, ইসরায়েলকে, দেওয়া প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দিতে পারে ওয়াশিংটন। তার যুক্তি, ইসরায়েলের এখন আর ওই সহায়তার প্রয়োজন নেই।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা ও বিভিন্ন অধিকারকর্মী সংগঠন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে এই দীর্ঘদিনের কৌশলী নীরবতা অবসানের দাবি জানিয়ে আসছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য হোয়াকিন কাস্ত্রো বলেন, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অস্পষ্ট অবস্থান এখন পুরোনো ও অচল নীতি। তার মতে, এটি ক্রমেই ‘বেপরোয়া ও বিপজ্জনক’ হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক ও গোয়েন্দাবিষয়ক কমিটির সদস্য কাস্ত্রোর প্রশ্ন, ইসরায়েলের সঙ্গে একই যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পরও দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র অন্ধকারে থাকবে কেন?
পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হলে কিংবা ইসরায়েলের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের কী ধরনের জরুরি পরিকল্পনা রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
দীর্ঘদিনের এই অস্বীকারের আবরণ সরিয়ে ফেললে ইসরায়েলের পারমাণবিক প্রযুক্তির উৎস এবং অস্ত্র কর্মসূচির প্রকৃত ইতিহাস নিয়েও নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হবে। একই সঙ্গে, কর্মসূচিটির অকাট্য প্রমাণ সামনে আসা ঠেকাতে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা তৎপরতার বিষয়টিও আলোচনায় আসবে।
এমনকি, দিমোনা স্থাপনার নিচে বোমা তৈরির উপযোগী প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত গোপন ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটিও মার্কিন পরিদর্শকেরা কখনো খুঁজে পাননি। ২০২৪ সালে প্রচারিত হিব্রু ভাষার প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য অ্যাটম অ্যান্ড মি’-তে দাবি করা হয়, পরিদর্শকেরা আসার আগে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা লিফটের প্রবেশপথ দেয়াল দিয়ে বন্ধ করে দিতেন। প্রামাণ্যচিত্রটিতে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিকে সহায়তাকারী একটি গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধানের মৃত্যুর পর প্রকাশিত সাক্ষাৎকারও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হলে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক অবস্থানও দুর্বল হতে পারে। পাশাপাশি, পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করা দেশগুলোর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা অস্ত্র বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের নীতিও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের এক মুখপাত্র বলেন, ‘নির্দিষ্ট সামরিক সক্ষমতা ও অবস্থানসংক্রান্ত প্রতিবেদন নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য না করার নীতি পররাষ্ট্র দফতরের দীর্ঘদিনের।’
হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। ওয়াশিংটনে অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাস সিএনএনের প্রশ্নের জবাবের জন্য প্রধানমন্ত্রী দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। তবে সেখান থেকেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও পারমাণবিক কৌশলবিদ ম্যাথিউ ক্রোয়েনিগ মনে করেন, ইসরায়েল প্রকাশ্যে নিজেদের পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর ওপরও একই পথে হাঁটার চাপ বাড়তে পারে।
তার ভাষায়, ‘মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির জন্য মোটেও ভালো কিছু নয়।’
চলতি বছরের জুনে, কংগ্রেসের একটি প্রকাশ্য শুনানিতে বিষয়টি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে প্রশ্ন করেন কাস্ত্রো। হেনরি কিসিঞ্জারের পর রুবিও দ্বিতীয় মার্কিন ব্যক্তি, যিনি একই সঙ্গে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শীর্ষ কূটনীতিকের কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে খোলামেলা বক্তব্যগুলোর একটি ছিল রুবিওর ওই মন্তব্য।
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, বিশ্বের অধিকাংশ দেশই মনে করে তাদের (ইসরায়েলের) পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। তবে আমরা কখনোই, কিংবা তারাও কখনো প্রকাশ্যে তা স্বীকার করেনি। আর আমাদের পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবেই বিভিন্ন কারণে আমরাও বিষয়টি নিয়ে ওইভাবে আলোচনা করি না।’
কীভাবে তৈরি হয়েছিল অস্বীকারের এই নীতি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখার নীতির জন্ম হয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধের বাস্তবতায়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: উভয় দেশই আশঙ্কা করছিল, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনপুষ্ট আরব দেশগুলোও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উদ্যোগ নিতে পারে। একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্র হিসেবে প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করলে ইসরায়েলকে যে কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হবে, সেটিও ছিল দেশটির উদ্বেগের কারণ।
পেনসিলভানিয়ার ইউরেনিয়াম কেন্দ্রে বিপুল পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের হিসাব না মেলার বছরেই তেলআবিব সফর করেন হেনরি কিসিঞ্জার। তখন তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। রিপাবলিকান দলের প্রভাবশালী নেতাদের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করতেন তিনি। এর চার বছরেরও কম সময় পর, ১৯৬৯ সালে রিচার্ড নিক্সনের প্রশাসনে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন কিসিঞ্জার।

ইসরায়েল সফরের সময় দেশটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর মার্কিন দূতাবাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন তিনি। ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভে সংরক্ষিত এবং পরবর্তী সময়ে অবমুক্ত করা একটি স্মারকলিপিতে বলা হয়, কিসিঞ্জারের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ইসরায়েল ইতোমধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি শুরু করেছে। অথচ এর আগে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন. এফ. কেনেডি ইসরায়েলের এমন উদ্যোগ ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন।
সফরকালে ইসরায়েলের তৎকালীন উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী শিমন পেরেসের সঙ্গে বৈঠক করেন কিসিঞ্জার। তার পর্যবেক্ষণ ছিল, পেরেসসহ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে ছিলেন। এমনকি ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচিতে যুক্ত বিজ্ঞানীদের মধ্যেও দেশটির এ ধরনের অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।
তবে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। কিসিঞ্জারের ধারণা ছিল, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা চান না যে মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র ‘প্রবর্তনকারী’ হিসেবে দেশটিকে দেখা হোক।
ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচির ইতিহাসবিদ আভনার কোহেনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ‘প্রবর্তন’ শব্দটির অর্থ অস্পষ্ট রেখেছিলেন। দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের সংজ্ঞা নিয়েও একমত ছিল না।
১৯৬৮ সালের নভেম্বরে, অত্যাধুনিক 'এফ-৪ ফ্যান্টম' যুদ্ধবিমান বিক্রি নিয়ে আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের কাছে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইৎজাক রবিনের বক্তব্যেও বিষয়টি উঠে আসে। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করা এবং সেটির অস্তিত্ব প্রকাশ্যে ঘোষণা করার আগে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যে ‘প্রবর্তন’ করা হয়েছে বলে বিবেচনা করা যাবে না।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছিলেন, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে আরব দেশগুলোও একই ধরনের অস্ত্র তৈরির চেষ্টা শুরু করবে। বিশেষকরে, ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে পরাজয়ের ক্ষত তখনো আরব দেশগুলোর মধ্যে গভীর ছিল। এ পরিস্থিতিতে তারা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের উদ্যোগ নিতে পারে কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাইতে পারে বলে আশঙ্কা করছিল ওয়াশিংটন।
১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে, প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের কাছে পাঠানো কিসিঞ্জারের একটি স্মারকলিপির সঙ্গে যুক্ত প্রতিবেদনে মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছিলেন, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলে ক্ষোভের বশে কোনো পক্ষের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
তবে কিসিঞ্জার বুঝতে পেরেছিলেন, নিক্সন অস্ত্র বিক্রি বন্ধের হুমকি দিলেও ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি থামানো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কঠিন হতে পারে। পারমাণবিক কর্মসূচির গোপনীয়তা বজায় রেখেই ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা হলে মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হতে পারত। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা ছিল।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির বিষয়টি প্রকাশ্যে এনে কূটনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আরব দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে এ কর্মসূচিতে সহযোগিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করতে পারত।
এমন পরিস্থিতিতে, সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হিসেবে বেছে নেওয়া হয় বিষয়টি নিয়ে অস্পষ্টতা বজায় রাখার কৌশল। ইসরায়েলও পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি (নিউক্লিয়ার নন-প্রলিফারেশন ট্রিটি) স্বাক্ষর করেনি।
নিক্সনের কাছে পাঠানো স্মারকলিপিতে কিসিঞ্জার লিখেছিলেন, ‘আমরা অন্তত এটুকু চাই যে, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকানার বিষয়টি যেন আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত না হয়।’
তবে ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে পাঠানো ওই স্মারকলিপিতে নিক্সনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উল্লেখ নেই। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথভাবে অস্পষ্টতার নীতি গ্রহণের মুহূর্তটির কোনো আনুষ্ঠানিক নথিও পাওয়া যায়নি।

আভনার কোহেনের ধারণা, ওই বছরের সেপ্টেম্বরে, হোয়াইট হাউসে নিক্সন ও ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেইরের একান্ত বৈঠকেই এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। বৈঠকটি হয়েছিল কোনো সহযোগী বা উপদেষ্টার উপস্থিতি ছাড়াই। তাদের আলোচনার কোনো লিখিত বিবরণও জানা যায়নি।
তবে পরবর্তী সময়ে নিক্সনের কাছে পাঠানো কিসিঞ্জারের আরেকটি স্মারকলিপিতে মেইরের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের ‘ব্যক্তিগত আলোচনা’র প্রসঙ্গ উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, নিক্সনের প্রধান উদ্বেগ ছিল, ইসরায়েল যেন পারমাণবিক অস্ত্রের দৃশ্যমান উপস্থিতি তৈরি না করে কিংবা কোনো পারমাণবিক পরীক্ষা না চালায়।
ওই বৈঠকের পর ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
সত্তরের দশকে সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং মার্কিন সরকারের কিছু অনিচ্ছাকৃত তথ্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিষয়টি ক্রমেই স্পষ্ট হতে থাকে। তবে ১৯৮৬ সালে এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সংশয় প্রায় পুরোপুরি দূর হয়ে যায়।
ওই বছর, দিমোনা পারমাণবিক স্থাপনার প্রযুক্তিবিদ, মর্দেখাই ভানুনু, ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেন। গোপনে তোলা স্থাপনার বেশ কিছু ছবিসহ এসব তথ্য তিনি লন্ডনের পত্রিকা সানডে টাইমস-এর হাতে তুলে দেন।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের কিছুদিন আগে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এক তরুণ এজেন্ট ভানুনুকে ইতালির রোমে নিয়ে যাওয়ার ফাঁদ পাতেন। সেখানে তাকে মাদক প্রয়োগ করে অচেতন করা হয়। পরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় অপেক্ষমাণ ইসরায়েলি নৌবাহিনীর একটি গোপন পণ্যবাহী জাহাজে তুলে দেশে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত এক বইয়ে এ ঘটনার বিবরণ দেন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিক পিটার হুনাম।
বিচার চলাকালে, হুনাম, নিজের বক্তব্যে ঘটনার বিবরণ তুলে ধরলেও ভানুনুকে রাষ্ট্রদ্রোহ ও গুপ্তচরবৃত্তিসংশ্লিষ্ট অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ইসরায়েলের কারাগারে তাকে ১৮ বছর বন্দি থাকতে হয়। এর অধিকাংশ সময়ই কেটেছে নির্জন কারাবাসে।
স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে অস্পষ্টতা বজায় রাখার পেছনের পুরোনো যুক্তিগুলোর অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আরব দেশগুলোর কাছ থেকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য আগের মতো বড় কোনো হুমকি ছিল না। একই সঙ্গে আঞ্চলিক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা উসকে দেওয়ার মতো সোভিয়েত প্রভাবও আর অবশিষ্ট ছিল না।
২০১৮ সালে দ্য নিউ ইয়র্কার এক প্রতিবেদনে জানায়, পরিস্থিতির এই পরিবর্তনে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। ফলে তারা গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে লিখিত নিশ্চয়তা আদায়ের চেষ্টা করেন, যাতে ওয়াশিংটন কখনোই ইসরায়েলকে পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের দাবি না জানায়। প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রশাসন থেকেই এ ধরনের নিশ্চয়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে দীর্ঘদিনের অস্পষ্টতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে নিশ্চয়তার ভাষাও রাখা হয়েছিল যথেষ্ট অস্পষ্ট।
পরবর্তী সময়ে, ইসরায়েলে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা আসে। দেশটির সরকারি সেন্সর কর্তৃপক্ষ এখন প্রকাশকদের একটি বিশেষ সতর্কতামূলক বাক্য যুক্ত করার শর্তে এ বিষয়ে কিছু আলোচনা প্রকাশের অনুমতি দেয়। বাক্যটি হলো—‘বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী’।
২০১৮ সালে, সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নেতানিয়াহু তা সরাসরি অস্বীকার করেননি। বরং তিনি পুনরায় বলেন, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র ‘প্রবর্তনকারী’ প্রথম দেশ হবে না।
তবে আনুষ্ঠানিক অবস্থানে এখনো কোনো পরিবর্তন আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েল: কোনো দেশই ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র থাকার বিষয়টি স্বীকার করে না। যদিও বেসরকারি সংস্থা নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের (এনটিআই) হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারে প্রায় ৯০টি ওয়ারহেড রয়েছে।
অস্বীকারের নীতি কি আর ধরে রাখা সম্ভব?
জুনে মার্কো রুবিও'র বক্তব্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতার ক্রমবর্ধমান চাপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে দীর্ঘদিনের অস্বীকারের নীতি হয়তো ভাঙনের মুখে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক তৎপরতায় মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা যখন এমনিতেই তুঙ্গে, তখন এই বিতর্ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশেষকরে, ইসরায়েলকে দেওয়া সামরিক সহায়তা কমানোর বিষয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের পারমাণবিক অস্পষ্টতার নীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলে সৌদি আরবও একই পথে হাঁটবে। বর্তমানে, যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি আরবের মধ্যে একটি পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে পর্যালোচনা চলছে। নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন সাপেক্ষে এই চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ পেতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েক মাসের যুদ্ধে জড়ানোর পরও ইরানের হাতে প্রায় এক হাজার পাউন্ড উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এই মজুত ধ্বংস করা ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
গত বছর, মার্কিন বোমারু বিমানের হামলায়, ইরানের যেসব পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে অনেক জায়গায় এই ইউরেনিয়াম মাটির গভীরে চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হয়। তবে কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জেমস অ্যাকটন সিএনএনকে বলেছেন, আগামী তিন বছরের মধ্যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে, এমন সম্ভাবনা তিনি ৫০ শতাংশ বলে মনে করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের কংগ্রেস সদস্য হোয়াকিন কাস্ত্রোও মনে করেন, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অস্পষ্ট অবস্থান একসময় কার্যকর নীতি ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি আর অব্যাহত রাখা উচিত নয়।
তিনি বলেন, ‘পঞ্চাশ-ষাট-সত্তরের দশকের পর থেকে অনেক কিছু বদলে গেছে। সে সময়ের তুলনায় বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে অস্পষ্টতার নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।’
অন্যদিকে, ক্রোয়েনিগ মনে করেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়, তাহলে সেটিই হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘদিনের অস্পষ্টতার নীতি থেকে সরে আসার সবচেয়ে স্পষ্ট কারণ।
তার মতে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করলে তেহরানকে মোকাবিলায় নিজেদের পারমাণবিক কৌশল ও নীতি প্রকাশ্যে তুলে ধরতে হবে ইসরায়েলকে। পাশাপাশি, সামরিক মহড়ার মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন করতে হবে, যাতে ইরানের বিরুদ্ধে একটি বিশ্বাসযোগ্য পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়।
তবে ইরান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন না করা পর্যন্ত কিংবা এ ধরনের কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার করার প্রয়োজন দেখছেন না তিনি।
কাস্ত্রোর অবস্থান অবশ্য ভিন্ন। জুনে, ক্যাপিটল হিলে মার্কো রুবিও'র সঙ্গে বিতর্কের সময় তিনি যুক্তি দেন, ইসরায়েল-ইরানের মধ্যে একতরফাভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকানা থাকাটাই প্রকাশ্য আলোচনার জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয়। বিশেষকরে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকা অবস্থায় ইসরায়েল কোন পরিস্থিতিতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তা যুক্তরাষ্ট্রের জানা প্রয়োজন।
তবে কাস্ত্রোর প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি রুবিও। বরং তিনি ইঙ্গিত দেন, গোপনীয় বৈঠকে এ বিষয়ে আরও খোলামেলাভাবে আলোচনা করা সম্ভব।
রুবিও বলেন, ‘এ ধরনের বিষয়গুলোতে বিভিন্ন স্বার্থের মধ্যে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়।’
/এআই