×
Logo

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনই নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ অধ্যায়

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনই নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ অধ্যায়

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে, গত এক দশক ধরে, প্রভাব বিস্তার করে আসছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সময়ে, দেশটির রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণে এনেছেন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার মেয়াদের আর মাত্র দুই বছর বাকি। এরইমধ্যে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন, যার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। 

ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য এমন এক সময়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে দলটি। ফলে এবারের ভোট শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণেই নয়, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ দুই বছরের গতিপথ কেমন হবে, তা নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ভোটারদের বড় অংশের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় এখন জীবনযাত্রার ব্যয়। বিশেষকরে, খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় চাপে রয়েছেন সাধারণ মার্কিন নাগরিকেরা। প্রেসিডেন্টের আগ্রাসী শুল্কনীতি এবং ইরানের সঙ্গে অজনপ্রিয় যুদ্ধের কারণে আংশিকভাবে পণ্যের দাম বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগে অধিকাংশ ভোটারের বিবেচনায় থাকবে জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে, জনসমর্থনের ক্ষেত্রে রেকর্ড নিম্নমুখী অবস্থানে রয়েছেন ট্রাম্প। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনী প্রচারে বেশ সক্রিয় ছিলেন তিনি। দেশজুড়ে কয়েক ডজন নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নিয়ে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

তবে পণ্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ শুধু এক পক্ষের ভোটারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ কারণে আগে থেকেই রিপাবলিকানদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও প্রচারে নেমেছেন ট্রাম্প। নির্বাচনের আগের শেষ সপ্তাহান্তে আইওয়া ও কানসাসে প্রচার চালিয়েছেন তিনি। এসব অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের অবস্থান সাধারণত শক্তিশালী হলেও এবার সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র বদলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ঐতিহ্যগতভাবে, রিপাবলিকানদের নিরাপদ আসন হিসেবে বিবেচিত, এসব নির্বাচনী এলাকায় বিজ্ঞাপন প্রচারেও শত শত কোটি ডলার ঢেলেছে দলটি। এর মধ্যে কানসাসের সিনেট নির্বাচন অন্যতম।

নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রচারাভিযান বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ক্যারি ড্যান বিবিসিকে বলেন, কোনো অঙ্গরাজ্যে নিশ্চিত জয়ের প্রত্যাশা থাকলে সেখানে নির্বাচনী বিজ্ঞাপনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন পড়ে না। 

তার ভাষায়, ‘যখন কোনো অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনে জেতার কথা থাকা সত্ত্বেও বিপুল পরিমাণ অর্থ বিজ্ঞাপনে খরচ করতে দেখা যায়, তখনই বোঝা যায়, তারা নিজেদের অবস্থান নিয়ে শঙ্কিত।’

কানসাসের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ব্যয় তাদের প্রাথমিক ধারণার চেয়ে অনেক বেশি হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, আসন্ন নির্বাচনে রক্ষণাত্মক অবস্থানে থেকে লড়াই করতে হচ্ছে দলটিকে।

ট্রাম্পও, বিভিন্ন নির্বাচনী সমাবেশে, ভোটারদের কাছে বিশেষ আবেদন জানিয়েছেন। গত মাসে, এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচনে আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি, দয়া করে এমনভাবে ভোট দিন, যেন আমিও ব্যালটে আছি। শুধু কল্পনা করুন, আমি নির্বাচনে প্রার্থী।’

অবশ্য, এবারের নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী নন। তবে গত রোববার আইওয়ার সমাবেশেও একই আবেদন জানান তিনি। তার এই বক্তব্য সামনে এনেছে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন, ট্রাম্প কি এখনো রিপাবলিকান পার্টির জন্য নির্বাচনী সাফল্যের প্রধান সম্পদ, নাকি তার উপস্থিতিই দলটির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে?

এই প্রশ্নের উত্তর এখন আর আগের মতো সহজ নয়।

২০২৪ সালের, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে, বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে হোয়াইট হাউসে ফেরেন ট্রাম্প। সে সময় তার জনসমর্থনও ছিল বেশ শক্তিশালী। এর আগে, ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে, রিপাবলিকান প্রার্থীরা নিজেদের পক্ষে ট্রাম্পের সমর্থন পেতে মরিয়া ছিলেন। কারণ, তার সমর্থনকে নির্বাচনে জয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন তারা।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘায়িত যুদ্ধ এবং এর ফলে মার্কিন নাগরিকদের বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার চাপ ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় প্রভাব ফেলেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে, যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি গ্যালন ডিজেল জ্বালানির দাম ছিল ৩ ডলার ৭৫ সেন্ট। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে রেকর্ড ৬ ডলার ৫২ সেন্টে পৌঁছায়।

আইওয়ার এক ভোটার বিবিসিকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, সম্প্রতি তার ছেলে গাড়ি চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাচ্ছিলেন। পথে প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে বাবাকে ফোন করে জ্বালানির দাম জানাচ্ছিলেন তিনি। ওই ভোটারের ভাষায়, ‘আমি শুধু বলছিলাম, হে ঈশ্বর! এ তো ভয়াবহ অবস্থা।’

অন্যদিকে, ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের সময় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, ট্রাম্পের ব্যাপক বৈশ্বিক শুল্কনীতি কার্যকর না হলে মূল্যস্ফীতির হার আরও কম থাকতে পারত।

অর্থনীতির এই পরিস্থিতি নিয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে টেক্সাস, ওহাইও ও কানসাসের মতো অঙ্গরাজ্যে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে, সেখানেও এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে পারেন দলটির প্রার্থীরা।

জনমত জরিপকারী প্রতিষ্ঠান মোর ইন কমনের বৈশ্বিক গবেষণা পরিচালক স্টিফেন হকিন্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল, মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল এবং দেশটির কৃষিনির্ভর কেন্দ্রীয় অঞ্চলগুলো সাধারণত রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। অথচ এবার সবচেয়ে আলোচিত সিনেট নির্বাচনগুলোর কয়েকটি হচ্ছে এসব এলাকাতেই।

তিনি বলেন, মাত্র দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে, যেসব অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্প ১০, ১২ কিংবা ১৫ শতাংশ ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন, সেসব জায়গাতেই এখন ডেমোক্র্যাটদের সিনেট আসন জয়ের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে, ট্রাম্পের কাছে ব্যাপক ব্যবধানে হেরে যাওয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য এবার পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত রিপাবলিকান-অধ্যুষিত আইওয়ার ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ট্রাম্পের উপস্থিতি রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রতি তাদের সমর্থন বাড়াবে, নাকি কমাবে।

সেখানকার একটি কলেজ ফুটবল ম্যাচের বাইরে পল রস নামের এক ভোটার বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের উপস্থিতি রিপাবলিকানদের জন্য উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে। নিজেকে রিপাবলিকান দাবি করে তিনি বলেন, ‘বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও আমার মনে হয়, এখনকার পরিস্থিতিতে তার কারণে মানুষ রিপাবলিকানদের কম সমর্থন করতে পারে। আমার মনে হয়, এটি ক্ষতিকর হতে পারে।’

আরেক ভোটার জ্যাক শিম্পের মতে, ট্রাম্পের কারণে অনেক ভোটারই রিপাবলিকানদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। তার ভাষায়, ‘এতে ভোটাররা যে বিরক্ত হচ্ছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমার মনে হয়, শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণেই ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন এমন পর্যায়ে বাড়তে পারে, যা সাধারণত দেখা যায় না।’

রোজ হেমিং নামের আরেক ভোটারও নিজের অসন্তোষের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘তিনিই আমাদের এই যুদ্ধে জড়িয়েছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও মুদি সামগ্রীর দাম অনেক বেশি। জ্বালানির দামও আকাশছোঁয়া।’

মূলত, এটাই এবারের নির্বাচনের অন্যতম প্রধান চিত্র। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোর অনেক ভোটারও অর্থনৈতিক চাপে রয়েছেন। জনমত জরিপের ইঙ্গিত, মঙ্গলবার ভোটের মাধ্যমে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারেন তারা।

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত সর্বশেষ জনমত জরিপগুলোতে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনের হার প্রায় ৩৮ শতাংশ। এই হার কম হলেও একই জরিপগুলোতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন মাত্র ২৯ শতাংশ ভোটার। রোববার প্রকাশিত এনবিসির জাতীয় পর্যায়ের একটি জনমত জরিপেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে।

অর্থাৎ, ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ থাকলেই তারা প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।

গত মাসে, আইওয়ার রিপাবলিকান ভোটার টিম ম্যাককিননের সঙ্গে কথা বলেছিল বিবিসি। ২০২৪ সালের নির্বাচনে, ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া এই ব্যক্তি বলেন, ‘আমরা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে পছন্দ করি না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ট্রাম্পের একের পর এক হস্তক্ষেপও আমাদের খুব একটা ভালো লাগছে না।’

ফলে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নীতির কিছু দিক নিয়ে অসন্তুষ্ট হলেও ম্যাককিনন দম্পতির মতো ভোটারদের ডেমোক্র্যাটদের সমর্থক হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাদের ধারণা, ডেমোক্র্যাটরা কখনোই তাদের খ্রিষ্টান ও রক্ষণশীল মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটাতে পারবে না।

টিম ম্যাককিনন বলেন, ‘জ্বালানির দাম এক ডলার বাড়লেই আমাদের বিশ্বাস ও আদর্শ বদলে যাবে না।’

এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাটরা বিপুলসংখ্যক আসনে জয়ী হলেও তার অর্থ এই নয় যে ভোটাররা তাদের নীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। বরং ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের প্রতি অসন্তোষ থেকেই তাদের অনেকে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিতে পারেন।

এদিকে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের পাশাপাশি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়েও ভাবতে শুরু করেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। ওই নির্বাচনে একজন প্রার্থীর পক্ষে দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে তাদের। তবে দলের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ও বিভাজনের কারণে কাজটি সহজ হবে না।

এবারের নির্বাচনী প্রচার চলাকালেই ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। গত সপ্তাহান্তে মিশিগানেও দলটির নেতাদের মধ্যে এমন মতপার্থক্য দেখা গেছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে ২০২৮ সালের জন্য নিজেদের কৌশল ঠিক করতে চায় ডেমোক্র্যাটরা। তাদের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, তারা কি সত্যিই টেক্সাসে জয়ী হতে পারবে? 

রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত গ্রামীণ এলাকার ভোটারদের কতটা নিজেদের পক্ষে টানতে পারবে? জর্জিয়ার জন অসফ এবং টেক্সাসের জেমস তালারিকোর মতো উদীয়মান নেতারা কি প্রত্যাশা অনুযায়ী নিজেদের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন?

এসব প্রশ্নের কয়েকটির উত্তর নেতিবাচক হলে আগামী এক বছর ডেমোক্র্যাটদের জন্য আত্মসমালোচনার সময় হয়ে উঠতে পারে। নির্বাচনের পর দলের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে যে পর্যালোচনা শুরু হবে, তা খুব একটা সুখকর নাও হতে পারে।

তবে মোর ইন কমনের গবেষণা পরিচালক স্টিফেন হকিন্স মনে করেন, এবারের নির্বাচন ডেমোক্র্যাটদের জন্য প্রভাব বিস্তারের একটি বড় সুযোগ। তার ভাষায়, ‘এটি ডেমোক্র্যাটদের জন্য শুধু আসনসংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ নয়; বরং দেশের কোন কোন এলাকায় তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম, সেই ধারণাও বদলে দেওয়ার সুযোগ।’

অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের বিপজ্জনক কমিউনিস্ট হিসেবে তুলে ধরার রিপাবলিকান প্রচেষ্টা, এমনকি ট্রাম্পের নিজের প্রচারণাও সব ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

মিশিগানের ডেট্রয়েটের বাসিন্দা নিকোল উইলিয়ামসের কথাতেই অনেক ভোটারের মনোভাব স্পষ্ট। নিজের একটি হেয়ারড্রেসিং সেলুন পরিচালনা করেন তিনি। ডেমোক্র্যাটদের সমাজতান্ত্রিক বা সমাজকল্যাণমূলক নীতির সমালোচনা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন যা চলছে, তার চেয়ে যেকোনো কিছুই ভালো। সমাজতন্ত্রী হোক কিংবা সমাজকল্যাণমূলক নীতির পক্ষের, এসব নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আমার জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে দিন।’

মিশিগানের আরেক ভোটার গয়েন জ্যাকসনও পরিবর্তনের প্রত্যাশা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ এখন আমেরিকানদের প্রতি অসম্মান দেখানোয় ক্লান্ত। কারণ, তিনিও একজন আমেরিকান।’

অঙ্গরাজ্যটির বামপন্থী ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদকে উদ্দেশ করে ট্রাম্প বারবার আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়ার প্রসঙ্গেই এ মন্তব্য করেন তিনি।

গয়েন জ্যাকসন আরও বলেন, ‘মানুষ সত্যিই ক্লান্ত। তারা পরিবর্তন দেখতে চায়।’

প্রতিনিধি পরিষদে জয়ের আশা ডেমোক্র্যাটদের

সাধারণত কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থানের চেয়ে বেশি থাকলেও মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর দলের আসন হারানোর প্রবণতা দেখা যায়। সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক জনমত জরিপের ভিত্তিতে প্রতিনিধি পরিষদে অন্তত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী ডেমোক্র্যাটরা।

ডেমোক্র্যাটিক দলের কৌশলবিদ মেরি অ্যান মার্শ এবারের নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হিসেবে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধকে উল্লেখ করেছেন। 

তিনি বলেন, ‘জীবনযাত্রার ব্যয় এবং কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই চলতে থাকা যুদ্ধ, এগুলোই প্রধান ইস্যু। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ না করে যারা তার পাশে থেকেছেন, অপরাজেয় মনে করার সেই ভুলের পরিণতি এবার প্রত্যেক রিপাবলিকানকে বুঝতে হবে।’

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত আইন ও নীতিগুলো আটকে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারবে। তবে এতে ট্রাম্প খুব বেশি উদ্বিগ্ন হবেন বলে মনে করা হচ্ছে না। কারণ, এরই মধ্যে কংগ্রেসকে যতটা সম্ভব পাশ কাটিয়ে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে শাসন পরিচালনার চেষ্টা করেছেন তিনি।

তবে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে ডেমোক্র্যাটদের তদন্ত কার্যক্রম। বিভিন্ন ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ও তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার সুযোগ পাবে দলটি। এমনকি, মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর চেষ্টাও করতে পারে তারা। ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে এক্ষেত্রে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে মঙ্গলবারের নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য অনেক বেশি কঠিন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এবার সিনেটের ৩৫টি আসনে নির্বাচন হচ্ছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের বর্তমান অবস্থান থেকে নিট চারটি আসন বাড়াতে হবে। তবে তারা যদি মিশিগানের আসনটি হারায়, যেখানে বর্তমানে তাদেরই একজন সিনেটর রয়েছেন এবং যেটি এবার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে নিট পাঁচটি আসন বাড়াতে হবে।

সিনেটের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর বেশিরভাগের লড়াই এখন বেশ হাড্ডাহাড্ডি। কয়েকটি আসনে দুই প্রার্থীর সমর্থনের ব্যবধান জনমত জরিপের সম্ভাব্য ভুলের সীমার মধ্যেই রয়েছে। ফলে শেষ মুহূর্তে ভোটের হিসাব বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এবারের নির্বাচনে যেসব সিনেট আসনের দিকে বিশেষ নজর থাকবে, সেগুলো হলো মিশিগান, টেক্সাস, ওহাইও, আইওয়া, মেইন, আলাস্কা ও নর্থ ক্যারোলাইনা। বাস্তবে এসব অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনই অনেকাংশে নির্ধারণ করে দেবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে জনমত জরিপের পূর্বাভাস নিয়ে বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। অতীতে অনেক ক্ষেত্রেই এসব জরিপ ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বেশি দেখিয়েছে এবং ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন কম করে মূল্যায়ন করেছে। 

ট্রাম্প নিজেও মনে করেন, এবারও জরিপের পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে তিনি সবাইকে চমকে দিতে পারবেন।

তবে জনমত জরিপগুলো যদি এবার বাস্তব পরিস্থিতির কাছাকাছি হয় এবং ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন সত্যিই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে থাকে, তাহলে কয়েক দশক ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্পের দল।

নির্বাচনে প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ ফল হলে ট্রাম্প কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এর আগেও তিনি বারবার যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ভোট গণনা চলার সময় কিংবা ফলাফল ঘোষণার পর আবারও তিনি এমন প্রশ্ন তুলতে পারেন, এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

তবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। কারণ, তাদের অনেকেই আগামী দুই বছরে দেশের পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে চান।

দুই দলের জন্যই ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এটি শেষ বড় নির্বাচনী পরীক্ষা। ওই নির্বাচনই, নির্ধারণ করবে, ট্রাম্প-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির চেহারা কেমন হবে এবং দেশটির রাজনৈতিক গতিপথ কোন দিকে এগোবে।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের নিজের জন্যও এবারের নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়নের সুযোগ। তার নেতৃত্ব ও রিপাবলিকান পার্টির পারফরম্যান্স নিয়ে ভোটারদের মনোভাব প্রকাশ পাবে এই ভোটের মধ্য দিয়ে।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদের শেষ দুই বছরে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার গড়ে তুলতে চান ট্রাম্প। কিন্তু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ যদি ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যায়, তাহলে তার ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর কতটা সীমিত হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষকরে, এরই মধ্যে কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে শাসন পরিচালনার যে প্রবণতা দেখিয়েছেন তিনি, তার বিপরীতে আইনসভায় বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণ বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।

/এআই 

Logo