মিডটার্ম ইলেকশনের প্রচার ব্যয় ছাড়াচ্ছে সব রেকর্ড, হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচন
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১১ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে নির্বাচনী প্রচারাভিযানে ব্যয়ের অতীতের সব রেকর্ড ভাঙতে যাচ্ছে। এবারের নির্বাচনে মোট ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২শ' কোটি ডলারে (১২ বিলিয়ন) পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে নির্বাচনী অর্থায়ন পর্যবেক্ষণকারী স্বাধীন সংস্থা ওপেনসিক্রেটস।
তাদের হিসাবে, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচন।
নির্বাচনের দিনকে সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আসনে প্রার্থীদের পক্ষে বিপুল অর্থ ঢালছে বিভিন্ন বহিরাগত রাজনৈতিক সংগঠন। এসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে সুপার পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা সুপার পিএসি। নির্বাচনী প্রচারে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের কারণে এবারের নির্বাচনে মোট ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।
ব্যক্তিগত দাতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন ধনকুবের ও ব্যবসায়ী ইলন মাস্ক। রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে প্রায় ৫০ কোটি ডলার দিয়েছেন তিনি। বিশেষকরে, টেক্সাসের নির্বাচনে, তার অর্থায়ন বেশি। রাজ্যটিতে, মাস্কের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম রয়েছে।
কত অর্থ ব্যয় হয়েছে?
যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী প্রচারের জন্য প্রার্থী, রাজনৈতিক দল এবং পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটিগুলো (পিএসি) সরাসরি কত অর্থ অনুদান দিতে পারবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে সুপার পিএসিগুলোর ক্ষেত্রে নিয়ম কিছুটা আলাদা। ব্যক্তি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক কমিটির কাছ থেকে তারা সীমাহীন অর্থ অনুদান হিসেবে নিতে পারে।
তবে সুপার পিএসিগুলো সরাসরি কোনো প্রার্থীকে সেই অর্থ দিতে পারে না। বরং বিভিন্ন প্রচারমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে প্রার্থীদের সমর্থনে অর্থ ব্যয় করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের (এফইসি) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে, ৯৫০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে পিএসি ও সুপার পিএসিগুলোর ব্যয়ই ৫৫০ কোটি ডলারের বেশি, যা মোট ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি। নির্বাচনের আগের কয়েক মাসে এসব সংগঠনের ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
প্রার্থী, রাজনৈতিক দল এবং বাইরের সংগঠনগুলোকে তাদের নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব এফইসির কাছে জমা দিতে হয়। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে মোট ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না।
এদিকে, আগের নির্বাচনগুলোর ব্যয়ের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে ওপেনসিক্রেটস পূর্বাভাস দিয়েছে, এবারের নির্বাচনে মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১ হাজার ১৯০ কোটি ডলারে। ২০২২ সালের সর্বশেষ মধ্যবর্তী নির্বাচনে যে অর্থ ব্যয় হয়েছিল, এবারের পরিমাণ তার চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি অর্থ দিয়েছেন যেসব ধনকুবের
উদারপন্থী ঘরানার গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত, শীর্ষ ৪০ জন দাতা নির্বাচনী প্রচারে ২৪০ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোনো প্রচারাভিযানের এ পর্যায়ে এত বিপুল অর্থ অনুদানের ঘটনা আগে ঘটেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ মাইকেল বেকেল বলেন, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে, প্রচার ব্যয় অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এবারের নির্বাচনে অর্থের বড় অংশ আসছে সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছ থেকে।
শুধু ব্যক্তিই নন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও পিএসিগুলোকে অর্থ সহায়তা দিচ্ছে। এর মধ্যে ধনকুবের জর্জ সরোসের প্রতিষ্ঠিত জিওসোর করপোরেশন এবং ফান্ড ফর পলিসি রিফর্মের নাম উল্লেখযোগ্য। প্রতিষ্ঠান দুটি সম্মিলিতভাবে উদারপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে ১০ কোটি ২০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছে।
সরোসের বাইরে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বড় দাতা নিউইয়র্ক সিটির সাবেক মেয়র ও ব্যবসায়ী মাইকেল ব্লুমবার্গ। তিনি ৬ কোটি ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, রিপাবলিকানদের পক্ষে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছেন বেশ কয়েকজন ধনকুবের। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী জেফ ইয়াস এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক রিচার্ড ও এলিজাবেথ উহেলিন এবারের নির্বাচনী প্রচারে রিপাবলিকানপন্থী বিভিন্ন সংগঠনকে ১০ কোটি ডলারের বেশি দিয়েছেন বলে এফইসির নথিতে উঠে এসেছে।
তবে ব্যক্তিগত দাতাদের মধ্যে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন ইলন মাস্ক। অক্টোবর পর্যন্ত তার দেওয়া অনুদানের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি ডলার।
মাস্কের অর্থের বড় অংশ গেছে ২০২৪ সালে তার প্রতিষ্ঠিত সুপার পিএসি ‘আমেরিকা পিএসি’তে। এছাড়া রিপাবলিকান-সমর্থিত ‘সেনেট লিডারশিপ ফান্ডেও’ অর্থ দিয়েছেন তিনি।
ইলনের অর্থায়নের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সেখানে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকোর বিরুদ্ধে।
এ নির্বাচনে আমেরিকা পিএসির বিনিয়োগের পরিমাণ ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি। এছাড়া মিশিগান ও ওহাইওর সিনেট নির্বাচন, প্রতিটিতে প্রায় ১ কোটি ডলার করে বিনিয়োগ করেছে সংগঠনটি।
এবারের নির্বাচনে ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ওপেনসিক্রেটসের ব্রেন্ডন জে গ্লাভিন জানান, ক্রিপ্টো খাতের প্রতিষ্ঠান রিপল ও কয়েনবেস সম্মিলিতভাবে ৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার দিয়েছে। এই অর্থ দিয়ে সুপার পিএসিগুলো ক্রিপ্টোশিল্পের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
নির্বাচনী প্রচারে কোথায় খরচ হচ্ছে এত অর্থ?
ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে বিভিন্ন ধরনের প্রচার কার্যক্রম চালায় প্রার্থী ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো। মাঠপর্যায়ে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য কর্মী নিয়োগ, নির্বাচনী সমাবেশ ও প্রচার অনুষ্ঠান আয়োজন এবং অভ্যন্তরীণ জনমত জরিপ পরিচালনায় অর্থ ব্যয় করা হয়।
তবে নির্বাচনী প্রচারের সবচেয়ে বড় অংশের অর্থ খরচ হয় বিজ্ঞাপনে। বিশেষ করে টেলিভিশনে প্রচারিত বিজ্ঞাপনই ব্যয়ের প্রধান খাত।
বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডইমপ্যাক্টের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত এবারের নির্বাচনী চক্রে বিজ্ঞাপন খাতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ১১৫ কোটি ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ মাইকেল বেকেল বলেন, বিজ্ঞাপন খাতে ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ এখনো প্রচলিত সম্প্রচারভিত্তিক টেলিভিশনের পেছনে যাচ্ছে। তবে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে ব্যয়ের পরিমাণও ক্রমাগত বাড়ছে।
অ্যাডইমপ্যাক্টের বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, বিজ্ঞাপনের পেছনে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে মিশিগান, টেক্সাস ও ওহাইওর সিনেট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এরপর রয়েছে আইওয়া ও মেইন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন।
সব মিলিয়ে, ধনকুবেরদের বিপুল অর্থায়ন, সুপার পিএসিগুলোর সক্রিয়তা এবং বিজ্ঞাপননির্ভর প্রচার কৌশলের কারণে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ব্যয় নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে যাচ্ছে।
নির্বাচনী অর্থায়নের এই রেকর্ড যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় দাতাদের আর্থিক প্রভাব এবং প্রচারাভিযানে বিপুল অর্থের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
/এআই