স্টেথোস্কোপ থেকে ব্যালট, ট্রাম্পের স্বাস্থ্যনীতির বিরুদ্ধে নির্বাচনী মাঠে চিকিৎসকেরা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের স্বাস্থ্যনীতি ও বিজ্ঞানবিরোধী অবস্থানের প্রতিবাদে রাজনীতির মাঠে নামছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি নতুন প্রজন্ম। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির হয়ে কংগ্রেসের আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বেশ কয়েকজন চিকিৎসক।
স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি, টিকানীতিতে পরিবর্তন এবং চিকিৎসাবিষয়ক সিদ্ধান্তে বৈজ্ঞানিক মতামত উপেক্ষার অভিযোগকে নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে সামনে আনছেন তারা।
চিকিৎসকদের এই অংশগ্রহণকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন প্রবণতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আমেরিকান কলেজ অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির এক হিসাব অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ২৫ জন চিকিৎসক কংগ্রেসের সদস্য নির্বাচিত হতে পারেন। বাস্তবায়িত হলে এটি হবে দেশটির আইনসভায় চিকিৎসক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড।
যদিও বর্তমানে কংগ্রেসে চিকিৎসকদের বড় অংশই রিপাবলিকান দলের সদস্য, তবে এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রার্থী হওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
উল্লেখযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কয়েকটি আসনেও রয়েছেন চিকিৎসক প্রার্থীরা। মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে চিকিৎসক ও সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবদুল এল-সাইয়েদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
অন্যদিকে, সাউথ ক্যারোলাইনায় শিশু বিশেষজ্ঞ অ্যানি অ্যান্ড্রুজের প্রার্থিতায় রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সিনেট আসনটিও নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে এসেছে।
বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ থেকেই চিকিৎসকদের রাজনীতিতে আসার আগ্রহ বাড়ছে।
শুধু স্বাস্থ্যসেবার বাড়তি খরচ নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত তথ্য ও গবেষণাকে উপেক্ষা করার প্রবণতার বিরুদ্ধেও সরব হচ্ছেন তারা।
ভ্যাকসিন নীতির পক্ষে কাজ করা সংগঠন ভ্যাক্স প্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও মহামারিবিদ এরিক ফেইগল-ডিং বলেন, বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন, ভুল তথ্য ও অপতথ্যের বিস্তার ঠেকাতে শুধু গবেষণাগারে থাকলে চলবে না; জনপরিসরেও তাদের সক্রিয় হতে হবে।
তার মতে, চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য দলীয় অবস্থান নেওয়া নয়; বরং দায়িত্বশীল স্বাস্থ্যনীতি প্রতিষ্ঠার পক্ষে কথা বলা।
স্বাস্থ্যনীতি এখন মার্কিন নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু
যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের কাছে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বরাবরই নির্বাচনের প্রধান ইস্যু। তবে স্বাস্থ্যসেবাও এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের ৮ অক্টোবরের এক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ইস্যুর তালিকায় স্বাস্থ্যসেবার অবস্থান তৃতীয়। এর আগে রয়েছে অর্থনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।
জরিপে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের ৮২ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রিপাবলিকান সমর্থকদের ক্ষেত্রে এ হার ৫৩ শতাংশ।
বস্টন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব পাবলিক হেলথের নীতিবিশেষজ্ঞ ম্যাট মোত্তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি দলীয় বিভাজনের রূপ নিয়েছে।
তার ভাষায়, স্বাস্থ্য সব সময়ই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল, কিন্তু সব সময় দলীয় বিভাজনের বিষয় ছিল না। এখন রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও মানুষের অবস্থান ক্রমেই আলাদা হয়ে যাচ্ছে।
১৯৯৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও স্বাস্থ্যসেবা ছিল গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। তৎকালীন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের স্বাস্থ্য সংস্কার উদ্যোগকে রিপাবলিকানরা সমাজতান্ত্রিক নীতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। ওই নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পায় রিপাবলিকানরা। ঘটনাটি মার্কিন রাজনীতিতে ‘রিপাবলিকান বিপ্লব’ নামে পরিচিত।
এরপর ২০১০ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইন বা অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট (এসিএ) পাস হলে স্বাস্থ্যনীতি আবারও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে আসে। ২০১০ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা আইনটির বিরোধিতা করে প্রচার চালায়। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের নীতির বিরোধিতা করে ডেমোক্র্যাটরাও স্বাস্থ্যসেবাকে নির্বাচনী ইস্যুতে পরিণত করে।
‘মেক আমেরিকা হেলদি এগেইন’ ঘিরে বিতর্ক
এবারের নির্বাচনে ট্রাম্প প্রশাসনের স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় মার্কিন স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে অসন্তুষ্ট ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন ট্রাম্প।
সে সময় টিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশকারী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রকে নিজের নির্বাচনী প্রচারে যুক্ত করেন তিনি। কেনেডি ‘মেক আমেরিকা হেলদি এগেইন’ বা ‘মাহা’ স্লোগানের মাধ্যমে সমর্থকদের সংগঠিত করেন। ট্রাম্পের জনপ্রিয় ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগানের আদলে তৈরি করা হয় এই প্রচারাভিযান।
নির্বাচনে জয়ী হলে কেনেডিকে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক স্বাধীনতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর তাকে স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন তিনি।
এরপর থেকে কেনেডি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে টিকাদানসংক্রান্ত নির্দেশনা সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের (এনআইএইচ) মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ব্যয় সংকোচনের উদ্যোগও নিয়েছে প্রশাসন।
এছাড়া গত বছর ট্রাম্পের উদ্যোগে পাস হওয়া ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্বাস্থ্যবিমায় সরকারি ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর লাখ লাখ মার্কিন নাগরিকের বিমা প্রিমিয়ামও বেড়েছে।
ডেমোক্র্যাট চিকিৎসক প্রার্থীরা এসব সিদ্ধান্তের বিরোধিতাকে নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, এসব পদক্ষেপের ফলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
মোত্তার মতে, সরকারের এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, চিকিৎসক প্রার্থীরা সেটিকে রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
হাম ও খাদ্যবাহিত রোগকে প্রচারের ইস্যু করছেন চিকিৎসক প্রার্থীরা
সাউথ ক্যারোলাইনায় সিনেট প্রার্থী শিশু বিশেষজ্ঞ অ্যানি অ্যান্ড্রুজ রাজ্যের সাম্প্রতিক হাম পরিস্থিতিকে স্বাস্থ্যনীতির ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন।
২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে রাজ্যটিতে হামের প্রায় ৯৯৭টি সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এক নিবন্ধে অ্যান্ড্রুজ লেখেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিবর্তনের কারণে নয়, বরং রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনের কারণেই একসময় নিয়ন্ত্রণে আসা প্রাণঘাতী রোগ আবার ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপর্যায়ে চিকিৎসাবিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা করা হচ্ছে। বিপরীতে, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ও অবৈজ্ঞানিক ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মিশিগানের সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদও স্বাস্থ্যঝুঁকিকে নির্বাচনী প্রচারের অংশ করেছেন। তিনি সম্প্রতি সাইক্লোস্পোরা নামের একটি পরজীবীর সংক্রমণ বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। দূষিত তাজা শাকসবজি, বিশেষ করে লেটুসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে এই পরজীবী। এতে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।
সেপ্টেম্বরে এক নির্বাচনী সমাবেশে এল-সাইয়েদ বলেন, তিনি নির্বাচিত হলে প্রায় ৫০ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম ডেমোক্র্যাট হবেন।
যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যপণ্য পরিদর্শনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় এ ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারণে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের ফলের ওপর। তবে এবারের প্রচারে স্বাস্থ্যসেবা, টিকানীতি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার গুরুত্ব যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে, তা স্পষ্ট।
/এআই