জার্মানিতে জেন-জি বিক্ষোভে সহিংসতা, ফ্রাঙ্কফুর্টে দোকানপাটে লুটপাট
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:১৫ এএম
শিক্ষার মানোন্নয়ন ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে জার্মানির বিভিন্ন শহরে রাজপথে নেমেছেন হাজারো তরুণ। তবে জেন-জি নেতৃত্বাধীন এ বিক্ষোভে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা। শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাতে দেশটির আর্থিক কেন্দ্র ফ্রাঙ্কফুর্টে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা কয়েকটি দোকানে লুটপাট চালান। ভাঙচুর করা হয় আরও কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে পুলিশ। খবর রয়টার্সের।
বার্তা সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ফ্রাঙ্কফুর্টে অন্তত দুটি দোকানে লুটপাট চালানো হয়েছে। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরও কয়েকটি দোকান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তৎপরতা চালিয়েছে পুলিশ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ফ্রাঙ্কফুর্ট পুলিশ জানায়, শহরে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। কেন্দ্রীয় এলাকায় বেশ কয়েকটি দোকানের জানালা ভাঙচুর করা হয়েছে। জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের লক্ষ্য করে পেট্রলবোমাও ছোড়া হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা এড়িয়ে চলার অথবা সেখান থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
জার্মানির ৩৪টি শহরে এ বিক্ষোভের আয়োজন করে ‘জেন-জি রেগেল্ট’ নামের একটি প্রচারাভিযান গোষ্ঠী। জার্মান ভাষায় যার অর্থ ‘জেন-জিই দায়িত্ব নিচ্ছে’। বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও মিউনিখসহ বড় শহরগুলোতে কর্মসূচি পালিত হয়। বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরোধিতা, শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় কমানোর দাবি জানায় সংগঠনটি।
শনিবার বিকেলের হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আয়োজকদের প্রাথমিক প্রত্যাশার চেয়ে কম ছিল। আয়োজকেরা শুরুতে ১ লাখ ৮২ হাজার মানুষের অংশগ্রহণের আশা করলেও ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখ ও বার্লিনে পুলিশের হিসাবে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ১৮ হাজার। অন্যদিকে, আয়োজকদের ওয়েবসাইটে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছিল প্রায় ৩৬ হাজার।
হ্যালোইন উৎসবের সঙ্গে একই সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া বিক্ষোভগুলো দিনের বেশির ভাগ সময় শান্তিপূর্ণ ছিল বলে জানিয়েছে জার্মান কর্তৃপক্ষ। তবে উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলো আন্দোলনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা। হামবুর্গে কয়েকটি ব্যারিকেডে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
শনিবার বার্লিনে এক সমাবেশে ‘জেন-জি রেগেল্ট’-এর মুখপাত্র লিনা ফ্রিডরিখ বলেন, যুদ্ধ ও জবরদস্তির পরিবর্তে শান্তি ও স্বাধীনতার দাবিতে তারা রাজপথে নেমেছেন। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে আরও সহায়তা নিশ্চিত করা তাদের প্রধান দাবি। বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরোধিতা করার পাশাপাশি সমাজের সবার মধ্যে দায়িত্বের বোঝা ন্যায্যভাবে বণ্টনের আহ্বান জানান তিনি।
উগ্রপন্থিদের সম্পৃক্ততা নিয়ে সতর্কতা
জার্মানির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠীগুলোর একাংশ এবং বিদেশি উগ্রপন্থি আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সংগঠন বিক্ষোভে সমর্থন জোগাড়ের চেষ্টা করেছে।
হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোসেক বলেন, ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভে দোকানপাট লুট, বাড়িঘর ও পুলিশের গাড়িতে আগুন এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার দৃশ্য সবার মনে রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিকে জার্মানির জন্য কোনো আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কায় জার্মানির বিভিন্ন শহরের কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আগেভাগেই দোকানের জানালা বন্ধ করে দেয় এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে। বার্লিনের অভিজাত কুরফুরস্টেনডাম শপিং বুলেভার্ডের কয়েকটি দোকানও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়।
তরুণদের ক্ষোভের কারণ অর্থনৈতিক চাপ ও শিক্ষাব্যবস্থা
ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জার্মানিতে তরুণ প্রজন্মের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের বিষয়টিকে সামনে আনছে আন্দোলনকারীরা। তাদের অভিযোগ, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের উদ্বেগের যথাযথ সমাধান আসছে না; বরং ব্যয় সংকোচনের পাশাপাশি তরুণদের ওপর নতুন নতুন চাপ তৈরি করা হচ্ছে।
মিউনিখের সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল ১৮ বছর বয়সী স্টিভের। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, তাদের উদ্বেগের জবাবে সরকার ব্যয় কমানো এবং আরও বোঝা চাপানো ছাড়া কিছুই করছে না। দাবি উপেক্ষা করা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সমাবেশ করার সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ অব্যাহত রাখবেন তারা।
জার্মানির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একই সঙ্গে অবসর গ্রহণকারী বেবি বুমার প্রজন্মের সংখ্যা বাড়ছে এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমছে। ফলে পেনশন ও সরকারি সেবার ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
তবে ‘জেন-জি রেগেল্ট’ আন্দোলনটি প্রকৃত অর্থেই তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনের অংশগ্রহণ থাকায় আন্দোলনের নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। জার্মানির জাতীয় স্কুল শিক্ষার্থী সংগঠন বিএসকে এ উদ্যোগ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছে। সংগঠনটি আগামী ২০ নভেম্বর আলাদা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করেছে।
এদিকে, বার্লিনের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী শন বেকার শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ক্যাম্পাসের জরাজীর্ণ ভবনগুলোর অবস্থা তুলে ধরতে। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ভবনের ভেতরের কক্ষগুলো দেখে মনে হয়, সেগুলো পরিত্যক্ত। অথচ শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সেখানেই পড়াশোনা করতে হয়।
চলতি বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আন্দোলন নির্বাচনের মাধ্যমে দেশটির দীর্ঘদিনের শাসকের ক্ষমতাচ্যুতিতে ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে, ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি সেবার মান নিয়ে প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সহিংসতা ও লুটপাটে রূপ নিয়েছে।
/এনএ