×
Logo

আন্তর্জাতিক

হ্যারি পটারের পোশাক পরে থাই রাজতন্ত্রের সমালোচনা, আইনজীবীর ৩৪ বছরের কারাদণ্ড

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫২ পিএম

হ্যারি পটারের পোশাক পরে থাই রাজতন্ত্রের সমালোচনা, আইনজীবীর ৩৪ বছরের কারাদণ্ড

থাইল্যান্ডের প্রভাবশালী রাজতন্ত্রের ক্ষমতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। প্রতিবাদের মঞ্চে হাজির হয়েছিলেন জনপ্রিয় কল্পকাহিনির চরিত্র হ্যারি পটারের পোশাকে। সেই বক্তব্যের জেরে একের পর এক মামলার মুখোমুখি হয়েছেন মানবাধিকার আইনজীবী আর্নন নামপা। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত তার কারাদণ্ডের মেয়াদ দাঁড়িয়েছে ৩৪ বছরেরও বেশি।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ব্যাংককের একটি আদালত তাকে আরও দুই বছর আট মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। থাইল্যান্ডের রাজপরিবারের অবমাননাসংক্রান্ত কঠোর আইন ‘লে ম্যাজেস্টে’ বা দণ্ডবিধির ১১২ ধারা লঙ্ঘনের দায়ে এ সাজা দেওয়া হয়। 

২০২০ সালে, ব্যাংককের কেন্দ্রস্থলে, হ্যারি পটারের থিম নিয়ে আয়োজিত এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে রাজতন্ত্রের ক্ষমতা-সম্পদ নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।

৪২ বছর বয়সী, আর্ননের বিরুদ্ধে একই আইনে দায়ের হওয়া ১৪টি মামলার মধ্যে এটি একটি। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত তার মোট কারাদণ্ডের মেয়াদ ৩৪ বছর ছাড়িয়েছে। আরও দু'টি মামলার রায় এখনো অপেক্ষমাণ।

রায়ের পর সাংবাদিকদের আর্নন বলেন, ‘আমার কাছে এটি অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। দেশটি যদি আরও উদার হতো, তাহলে এসব বিষয় নিয়ে আমরা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারতাম।’

আর্ননের মামলার শুনানির দিনের দৃশ্যটি ছিল বেশ বিষণ্ন। আদালতকক্ষে, বন্দিদের প্রবেশের আগেই শোনা যাচ্ছিল তাদের পায়ের শিকলের শব্দ। প্রতিটি পদক্ষেপে গোড়ালিতে বাঁধা শিকল ঝনঝন করে উঠছিল।

আদালতে প্রবেশ করা পাঁচ বন্দির কাছে এ পরিবেশ নতুন নয়। একাধিক ফৌজদারি মামলার আসামি হিসেবে গত পাঁচ বছরের বেশির ভাগ সময় তাদের আদালতে যাওয়া-আসার মধ্যেই কাটছে।

তাদের একজন আর্নন নামপা। চশমা পরা, মাথার চুলে পাক ধরা এই মানবাধিকার আইনজীবীকে দেখতে আদালতে এসেছিল তার তিন বছর বয়সী ছেলে কার্ল। সঙ্গী লুকওয়ার সঙ্গে আসা ছেলেকে কাছে পেয়ে দুই হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরেন তিনি।

ব্যাংকক রিমান্ড কারাগারে গত তিন বছর ধরে বন্দি আর্নন। কারাগারে বসেই দুই সন্তান প্রান ও কার্লকে চিঠি লিখছেন তিনি।

একটি চিঠিতে সন্তানদের উদ্দেশে লিখেছেন, 

‘প্রিয় প্রান ও কার্ল, 

আমার আদরের সন্তানেরা, শীতের বাতাস শুধু শীতল আবহাওয়াই নিয়ে আসেনি, ফিরিয়ে এনেছে অতীতের অনেক স্মৃতিও। কার্ল, তুমি, পৃথিবীতে আসার পর প্রথম শীতে, আমরা ব্যাংককের বাইরে যে ভ্রমণে গিয়েছিলাম, সেই সময়টার কথা খুব মনে পড়ে। আমার কাছে সেটি ছিল এক জাদুকরি সময়। এখানে যত শীত কাটবে, স্বাধীনতা ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত ততবারই সেই স্মৃতিগুলো আমাকে মনে পড়বে।’

ইতি,

তোমার বাবা. . . 

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, শুনানির মতো আদালতের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমই এখন আর্ননের সন্তানদের সঙ্গে দেখা হওয়ার একমাত্র সুযোগ। রায়ের কয়েক সপ্তাহ আগে অনুষ্ঠিত ওই শুনানির দিনেই ছোট ছেলে কার্লকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। কার্ল প্রথমে কিছুটা সংকোচ বোধ করলেও পরে বাবার কোলে উঠতে এবং অন্য বন্দিদের সঙ্গে পরিচিত হতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

আর্ননের ১০ বছর বয়সী মেয়ে প্রান মাঝেমধ্যে কারাগারে বাবার সঙ্গে দেখা করতে যায়। বাবাকে নিয়ে ছবি আঁকে, রং করে। তবে আর্নন ও তার সঙ্গী লুকওয়ার ধারণা, কার্ল এখনো কারাগারে বাবাকে দেখতে যাওয়ার মতো বড় হয়নি। আপাতত ছোট্ট কার্লের কাছে আদালত মানে বাবার কর্মস্থল।

সেদিন আদালতে আর্ননের সমর্থকরাও উপস্থিত ছিলেন। ছোট আদালতকক্ষটি তাদের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে। বিচারক আসার আগে বন্দিদের সঙ্গে হাসি-আড্ডা ও গল্পে মেতে ওঠেন তারা। থাইল্যান্ডের সবচেয়ে ভীতিকর অভিযোগগুলোর একটির মুখোমুখি ব্যক্তিদের ঘিরে আদালতকক্ষের এমন অনানুষ্ঠানিক পরিবেশ ছিল বেশ ব্যতিক্রমী।

থাইল্যান্ডে রাজপরিবারের অবমাননাসংক্রান্ত আইনটির প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে, রাজতন্ত্র নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। ছয় বছর আগেও এ বিষয়ে মানুষের মতামত প্রকাশের জায়গা ছিল মূলত ব্যক্তিগত পরিসর। প্রকাশ্যে কিছু বলার পরিবর্তে অনেকে ফিসফিস করে নিজেদের মতামত জানাতেন। এমনকি, এক ঘটনায় যাত্রীর কাছে রাজপরিবার সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করার অভিযোগে এক ট্যাক্সিচালককেও কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।

তবে ২০২০ সালের ৩ আগস্ট পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে।

ওই সময় থাইল্যান্ডের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তৎকালীন রক্ষণশীল সরকারের প্রতি অসন্তোষ বাড়ছিল। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা জেনারেল প্রায়ুত চান-ওচার নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমছিল তরুণদের মধ্যে।

এর আগের বছর লাখো ভোটার ‘ফিউচার ফরোয়ার্ড’ নামের একটি নতুন রাজনৈতিক দলকে ভোট দিয়েছিলেন। দলটি ব্যাপক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে, একটি কারিগরি কারণ দেখিয়ে দলটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে দেশটির সাংবিধানিক আদালত।

এরপর করোনা মহামারির কারণে তিন মাসের জন্য বিক্ষোভ বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীরা আবারও রাজপথে নামেন। তাদের দাবির মধ্যে ছিল রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর ভূমিকার অবসান। তবে আর্নন নামপার মতে, শুধু সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেই চলবে না; আলোচনায় আনতে হবে রাজতন্ত্রের ক্ষমতা ও জবাবদিহির বিষয়টিও।

এ কারণেই ২০২০ সালের ৩ আগস্ট, ব্যাংককের এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে হ্যারি পটারের পোশাক পরে বক্তব্য দেন তিনি। সেখানে রাজতন্ত্রের অস্বচ্ছ ক্ষমতা ও বিপুল সম্পদ নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনার আহ্বান জানান আর্নন।

বক্তব্যে রাজা মহা ভাজিরালংকর্নের বিরুদ্ধে সরাসরি সমালোচনা করেননি শুধু; রাজপরিবারের সম্পদ ও সামরিক বাহিনীর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। বিশেষ করে, ক্রাউন প্রপার্টি ব্যুরোর অধীনে থাকা বিপুল সম্পদের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।

আর্ননের ওই বক্তব্য, থাই সমাজের দীর্ঘদিনের একটি নিষিদ্ধ আলোচনার বিষয়কে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। আধুনিক থাইল্যান্ডের ইতিহাসে রাজতন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে এমন প্রকাশ্য আলোচনা এর আগে খুব একটা দেখা যায়নি। 

এরপর পুরো বছরজুড়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ চলতে থাকে। সময়ের সঙ্গে রাজতন্ত্রের সংস্কার নিয়ে আন্দোলনকারীদের দাবিও আরও স্পষ্ট ও জোরালো হয়ে ওঠে।

২০২০ সালের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের আগে প্রায় তিন বছর ধরে রাজপরিবারের অবমাননাসংক্রান্ত আইনটির প্রয়োগ স্থগিত ছিল। রাজপ্রাসাদের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো অতীতে স্বীকার করেছিল, এ আইনে দণ্ডিত হওয়ার কারণে নেতিবাচক প্রচার তৈরি হলে তা রাজতন্ত্রের ভাবমূর্তির জন্য উপকারের বদলে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

কিন্তু ২০২০ সালের আন্দোলন পরিস্থিতি বদলে দেয়। ওই বছরের শেষ দিক থেকে আবারও ১১২ ধারায় মামলা শুরু হয় এবং দ্রুত তা বাড়তে থাকে। গ্রেফতার ও কারাদণ্ড এড়াতে অনেক তরুণ আন্দোলনকারী দেশ ছেড়ে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন।

থাইল্যান্ডের দণ্ডবিধির ১১২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘যে কেউ রাজা, রানি, সিংহাসনের উত্তরাধিকারী অথবা রাজপ্রতিনিধির মানহানি, অবমাননা বা হুমকি দিলে তাকে তিন থেকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হবে।’

তবে বাস্তবে আইনটির প্রয়োগ আরও বিস্তৃত। রাজপরিবারের কোনো সদস্য, রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান কিংবা এমনকি বহু আগে মারা যাওয়া রাজাদের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্যের কারণেও মামলা হয়েছে। এক ঘটনায় রাজার পোষা কুকুরকে নিয়ে মন্তব্যের অভিযোগেও মামলা দায়ের করা হয়েছিল।

আইনটির অস্পষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন থাই লইয়ার্স ফর হিউম্যান রাইটসের সহকারী পরিচালক আকারাচাই চাইমানিকারাকাতে। সংস্থাটি ১১২ ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা দিয়ে থাকে।

তিনি বলেন, ‘আইনের লিখিত ধারায় কী বলা আছে, তা আমি আপনাকে বলতে পারি। কিন্তু আদালত যখন 'মানহানি' বা 'অবমাননা' শব্দগুলোর ব্যাখ্যা দেয়, তখন সেগুলোর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া কঠিন। কারণ, আইনটি অত্যন্ত অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থক। এমনকি আইনটির বৈধতা বা প্রয়োগ নিয়েই প্রশ্ন তোলাও ১১২ ধারার আওতায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।’

এ আইনে অভিযুক্ত অধিকাংশ ব্যক্তিকেই জামিন দেওয়া হয় না। বছরের পর বছর ধরে মামলা চললেও তাদের কারাগারে থাকতে হয়। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই দীর্ঘ সময় বন্দিজীবন কাটাতে হচ্ছে অনেককে।

১১২ ধারার মামলায় অভিযুক্ত হয়ে থাইল্যান্ড ছেড়ে যাওয়া তরুণ আন্দোলনকারীদের একজন সুপিচা ‘মেলিন’ চাইলোম। উত্তর থাইল্যান্ডের চিয়াং মাইয়ের ২৪ বছর বয়সী এই তরুণী বর্তমানে কানাডার মন্ট্রিয়লে বসবাস করছেন। তার বিরুদ্ধে ১১২ ধারায় চারটি মামলা রয়েছে। এসব মামলার কারণে দেশে ফিরতে পারছেন না তিনি।

আর্নন নামপার রাজতন্ত্র সংস্কারের আহ্বান জানানোর মাত্র তিন সপ্তাহ পর চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বক্তব্য দিয়েছিলেন মেলিন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। স্কুলছাত্রী অবস্থায় আন্দোলনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেওয়ার সেই মুহূর্তটি আন্দোলনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনায় পরিণত হয়।

একজন স্থানীয় আলোকচিত্রী তার হাত উঁচিয়ে ‘হাঙ্গার গেমস’-এর জনপ্রিয় তিন আঙুলের প্রতীকী অভিবাদন জানানোর মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করেন। ছবিটি প্রকাশের পর সমাবেশস্থলে উপস্থিত জনতার উচ্ছ্বাসের সেই দৃশ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। 

একপর্যায়ে, ছবিটি, ২০২০ সালের আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়। একই সঙ্গে সারা দেশে পরিচিতি পান মেলিন।

এরপর আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন তিনি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন। থাইল্যান্ডের পুরোনো ও রক্ষণশীল শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানানোর পাশাপাশি রাজতন্ত্র সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মতামত জানতে জরিপও পরিচালনা করেন।

থাইল্যান্ডে রাজতন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলার কারণে আর্নন নামপার মতো অনেক আন্দোলনকারীকে দীর্ঘ কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছে। 

আবার কেউ কেউ মামলা ও গ্রেফতার এড়াতে দেশ ছেড়ে নির্বাসনে রয়েছেন। ২০২০ সালের ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই বিতর্ক দেশটির রাজনীতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতিতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখে চলেছে।

/এআই 

Logo