×
Logo

আন্তর্জাতিক

‘জয় তো জয়ই’: বিরোধী জোটের বিজয় দাবি লাপিদের, সরকার গঠনে চাইলেন ধৈর্য

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৮ পিএম

‘জয় তো জয়ই’: বিরোধী জোটের বিজয় দাবি লাপিদের, সরকার গঠনে চাইলেন ধৈর্য

ইসরায়েলে, গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর), অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নেতানিয়াহুবিরোধী জোট নিরঙ্কুশ জয় না পেলেও, 'পয়েন্টের ভিত্তিতে জয়' নিশ্চিত করেছে। একইসঙ্গে, সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করার এ সময়ে জনসাধারণকে ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানিয়েছে দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা ও বি’ইয়াচাদ পার্টির দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ইয়াইর লাপিদ।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর), সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লাপিদ বলেন, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর), স্থানীয় সময় রাত ১০টার দিকে, সবাই টেলিভিশনের পর্দায় একটি সংখ্যার অপেক্ষায় ছিলেন। সংখ্যাটি ছিল ৬১। ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা। কিন্তু সেই সংখ্যা বিরোধী জোটের পক্ষে যেমন আসেনি, তেমনি নেতানিয়াহুর পক্ষেও আসেনি।

নির্বাচনের ফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলো সম্মিলিতভাবে ৬৭টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। তবে বিরোধী জোটের আসনসংখ্যা ৬৭ হলেও সরকার গঠনের সমীকরণ বেশ জটিল। 

কারণ, ইহুদি নেতৃত্বাধীন চারটি দলের মধ্যে তিনটি: ইয়াশার, বি’ইয়াচাদ ও ইসরায়েল বেইতেনু, আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আমের সঙ্গে জোট সরকার গঠনে আপত্তি জানিয়েছে।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৭টি আসন পেয়ে নির্বাচনে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে তার নেতৃত্বাধীন জোটের আসনসংখ্যাও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টির চেয়ে কম। ফলে কোনো পক্ষের সামনেই সরকার গঠনের পথ এখন পর্যন্ত পরিষ্কার নয়।

লাপিদ স্বীকার করেন, বিরোধী শিবিরের প্রত্যাশা ছিল নির্বাচনে স্পষ্ট ও তাৎক্ষণিক বিজয় অর্জনের। এমন একটি ফল, যার পর নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যাওয়া যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তেমনটি হয়নি। তবে তার মতে, কয়েকটি দিক বিবেচনায় বিরোধী জোটের জয় হয়েছে।

লাপিদ বলেন, নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন, যা তাদের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয়। এর মধ্যে ১৩টি আসন এমন দু'টি দলের দখলে, যারা নিজেদের জায়নবাদী হিসেবে বিবেচনা করেনা। দল দু'টি হলো ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম ও শাস পার্টি। নির্বাচনে তারা যথাক্রমে সাত ও ছয়টি আসন পেয়েছে।

লাপিদের হিসাব অনুযায়ী, এই ১৩টি আসন বাদ দিলে নেতানিয়াহুর হাতে থাকে মাত্র ৪০টি আসন। তার দাবি, যত চেষ্টাই করুন না কেন, এই আসনসংখ্যা নিয়ে নেতানিয়াহুর পক্ষে সরকার গঠন সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, বিদায়ী নেসেটে নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকারপন্থি দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা ছিল ৬৮। এবারের নির্বাচনে তা কমে ৫৩-তে নেমে এসেছে। ফলে এটি তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য আসনহানি।

এই পরিস্থিতি তুলে ধরে লাপিদ বলেন, ‘তাহলে আমরা জিতেছি। এটি নকআউট জয় ছিল না; বরং পয়েন্টের ব্যবধানে জয়। কিন্তু পয়েন্টও তো হিসাবের মধ্যে পড়ে। জয় তো জয়ই।’

বিরোধী জোটের নেতৃত্বে থাকা ইয়াশার পার্টির প্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হবে বলে জানিয়েছেন লাপিদ। তবে কাজটি কঠিন হবে এবং শেষ পর্যন্ত সফলতা আসবে কি না, তা নিশ্চিত নয় বলেও স্বীকার করেছেন তিনি।

এ অবস্থায় ইসরায়েলিদের কাছে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন বিদায়ী এই বিরোধীদলীয় নেতা।

লাপিদের ভাষায়, সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নির্বাচনী প্রচারের সম্পূর্ণ বিপরীত। নির্বাচনী প্রচার চলে প্রকাশ্যে, জনসমক্ষে ও গণমাধ্যমের সামনে। কিন্তু সরকার গঠনের আলোচনা হয় ছোট ছোট কক্ষে, ধীরগতিতে এবং ক্যামেরার আড়ালে।

তিনি বলেন, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই অনিশ্চয়তা পছন্দ করে না। তবে কেবল শিরোনাম কিংবা কোনো তথ্য ফাঁসের কারণে যদি এক মাস পর জানা যায় যে কৌশলগতভাবে, নীরবে ও নিখুঁতভাবে কাজ করতে না পারায় সরকার গঠনের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে, সেটি আরও বেশি হতাশাজনক হবে।

লাপিদ আরও বলেন, ‘আপনারা যদি জানতে চান, বর্তমানে যে নীরবতা শুনতে পাচ্ছেন, তার আড়ালে আদৌ কিছু ঘটছে কি না, তাহলে উত্তর হলো, হ্যাঁ।’

এদিকে, ইসরায়েলের বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়ার গোলান আবারও ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোকে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে কাজ করে সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। 

তার মতে, নির্বাচনে পাওয়া আসনসংখ্যার ভিত্তিতে আরব দলগুলোকে উপেক্ষা করা হলে তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হবে।

শুক্রবার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে গোলান বলেন, গণতান্ত্রিক ইসরায়েলে কোনো নাগরিককে শর্তসাপেক্ষ নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

তিনি লেখেন, মঙ্গলবারের নির্বাচনে সাখনিন কিংবা রাহাতের কোনো আরব নাগরিক যে ভোট দিয়েছেন, তার মূল্য তেলআবিব কিংবা সদেরোতের কোনো ইহুদি নাগরিকের দেওয়া ভোটের সমান।

গোলানের ভাষায়, ‘যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তারা সকালে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করবেন, অথচ সন্ধ্যায় নাগরিকদের জন্মপরিচয় কিংবা নামের কারণে লাখো মানুষের ভোটের অধিকার অস্বীকার করবেন, এমনটি হতে পারে না।’

নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন দল দুটি: জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম, সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেয়েছে। ইসরায়েলের পার্লামেন্টের ইতিহাসে আরব দলগুলোর জন্য এটি সর্বোচ্চ আসনসংখ্যা। বিদায়ী নেসেটে তাদের সম্মিলিত আসন ছিল ১০টি। অন্যদিকে, ইহুদি নেতৃত্বাধীন নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলো পেয়েছে ৪৮টি আসন।

বর্তমানে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠনে আগ্রহ প্রকাশ করা ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একমাত্র ডেমোক্র্যাটস পার্টি। ইয়াশারের গাদি আইজেনকোট, বি’ইয়াচাদের নাফতালি বেনেট এবং ইসরায়েল বেইতেনুর আভিগদর লিবারম্যান এ ধরনের জোটের সম্ভাবনা কার্যত নাকচ করে দিয়েছেন।

মঙ্গলবারের নির্বাচনে গোলানের দল আটটি আসন পেয়েছে। বৃহস্পতিবার তিনি আইজেনকট, লাপিদ এবং রা’আম পার্টির প্রধান মানসুর আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

নতুন সরকার গঠনের আলোচনা অনিশ্চয়তা ও নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে এগোতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া দুই মাসেরও বেশি সময় পর্যন্ত গড়াতে পারে। তবে সরকার গঠনের আলোচনা যে পর্যায়েই থাকুক, আগামী ১০ নভেম্বর নেসেটের নতুন সদস্যদের শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে।

এদিকে, নির্বাচনের পর, নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও সরকার গঠনের সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। 

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সপ্তাহে, অর্থমন্ত্রী ও কট্টর ডানপন্থি রিলিজিয়াস জায়নবাদ-জেহুত পার্টির নেতা বেজালেল স্মোট্রিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ও কট্টর ডানপন্থি ওতজমা ইয়েহুদিত পার্টির নেতা ইতামার বেন গভিরের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

বর্তমান জোটের বাইরে থাকা দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যে নিজের ডানপন্থি জোট অটুট রাখার বিষয়ে দুই নেতাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন নেতানিয়াহু।

নেতানিয়াহুপন্থি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১৪-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের সঙ্গে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা একসঙ্গে আছি এবং একসঙ্গেই থাকব।’

নির্বাচনে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও সামগ্রিকভাবে তার জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। ফলে সরকার গঠনের জন্য নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির চেষ্টা চালাতে হচ্ছে তাকে।

/এআই 

Logo