×
Logo

আন্তর্জাতিক

স্পেনে দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৮, আহত ৮০

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪২ এএম

স্পেনে দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৮, আহত ৮০

স্পেনে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রেনের সঙ্গে দ্রুতগতির যাত্রীবাহী ট্রেনের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮ জনে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৮০ জন, যাদের মধ্যে ১৫ জনের অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর। দুর্ঘটনার পর দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বগিগুলোতে আরও মরদেহের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। চলতি বছরে দেশটিতে এটি দ্বিতীয় প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনা। আর ২০১৩ সালের পর ইউরোপে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনা।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে স্পেনের কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা অঞ্চলের গ্রামীণ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি ট্রেনের কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে ঢাল বেয়ে নিচে পড়ে যায়। সংঘর্ষের পরপরই সেখানে অ্যাম্বুলেন্স, উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার ও মরদেহ পরিবহনের গাড়ি পৌঁছায়।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, পুরো স্পেন এই শোকে শোকাহত। মাদ্রিদের দক্ষিণে দুর্ঘটনাস্থলের কাছ থেকে টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, এ মর্মান্তিক ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে। তদন্তে কোনো ধরনের ত্রুটি বা ব্যর্থতা উঠে এলে তা মোকাবিলা করা হবে। তবে চলতি বছরে ঘটে যাওয়া দুটি রেল দুর্ঘটনার কারণ পরস্পর সম্পর্কহীন বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সানচেজ বলেন, দেশের উচ্চগতির রেলব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করার প্রয়োজন হলে তা করা হবে। তার ভাষায়, স্পেনের মতো একটি দেশের জন্য একই বছরে দুটি উচ্চগতির ট্রেন দুর্ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

লাল সংকেত উপেক্ষা করে ট্রেন চালুর অভিযোগ

স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানিয়েছেন, সামনে একটি ট্রেন স্থির দাঁড়িয়ে থাকায় রেনফে পরিচালিত ট্রেনটিকে লাল সংকেত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সংকেত সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও ট্রেনটিকে চলার অনুমতি দেওয়া হয়।

মাদ্রিদে সাংবাদিকদের পুয়েন্তে বলেন, কম্পিউটার যোগাযোগব্যবস্থায় ত্রুটির কারণে লাল সংকেত জারি হয়েছিল এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে রেনফের ট্রেনটি আবার চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা ভুল ছিল।

রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রেনফে এক বিবৃতিতে জানায়, চলার অনুমতি পাওয়ার পর তাদের ট্রেনটি সামনে থাকা ইরিও পরিচালিত ট্রেনটির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। তবে ইরিওর ট্রেনটি কেন দাঁড়িয়ে ছিল, তা তাদের জানা নেই। দুর্ঘটনার প্রকৃত ধারাবাহিকতা, ওই সময় রেল চলাচলের পরিস্থিতি এবং সংঘর্ষের কারণ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ইরিও জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর তারা জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে রেল অবকাঠামো পরিচালনাকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আদিফ এবং ইরিও এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।

বগির মধ্যে আটকে পড়েন যাত্রীরা

দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত বগিগুলোতে আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধারে তল্লাশি চালান। কাস্তিয়া-লা মাঞ্চার আঞ্চলিক সরকারের প্রধান এমিলিয়ানো গার্সিয়া-পাখে নিহতের সংখ্যা ৬৮-তে পৌঁছানোর কথা জানান। তবে অন্ধকার নেমে আসার পরও উদ্ধারকর্মীরা তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত বগিগুলো সরানোর পর আরও মরদেহ পাওয়া যেতে পারে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন না তারা।

দুর্ঘটনায় আহত যাত্রীদের কয়েকজনের শরীরে রক্তের দাগ ছিল, কারও শরীরে ছিল ব্যান্ডেজ। তাদের কাছের একটি সড়ক দিয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়। স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া জানান, আহত ৮০ জনের মধ্যে ১৫ জনের অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর।

ট্রেনের এক যাত্রী ৬২ বছর বয়সী সালভাদর আরিজা দুর্ঘটনার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, দরজার কাছাকাছি থাকায় বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। অন্য যাত্রীরা বের হওয়ার জন্য জানালা ভাঙছিলেন। অনেকেই আসনগুলোর মধ্যে আটকে পড়ায় নড়াচড়া করতে পারছিলেন না।

আরেক যাত্রী রাফায়েল বার্সেলো জানান, কফি খেতে নিজের আসন থেকে উঠে যাওয়ায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। তার ভাষ্য, তারা সকালের নাশতা করছিলেন এবং কফি পান করছিলেন। হঠাৎ প্রবল ধাক্কায় যাত্রীরা ছিটকে পড়েন। তার বগিতেই অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করেন তিনি।

স্বজনদের অপেক্ষা, স্থগিত রেল টিকিট বিক্রি

দুর্ঘটনায় নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনদের একটি স্কুলে অপেক্ষা করার ব্যবস্থা করা হয়। উর্দা এলাকার ওই স্কুলে আনা স্বজনদের একজন আনা নামের এক নারী জানান, তার স্বামী পেপের কোনো খোঁজ তখনও পাওয়া যায়নি। শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় স্বামীর নাম না থাকলেও উদ্ধারকারীরা তাদের পোষা কুকুর ত্রেসেকে খুঁজে পেয়েছেন।

নিহত ও নিখোঁজ যাত্রীদের পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় বিশেষ হটলাইন চালু করেছে রেনফে। পাশাপাশি মাদ্রিদ-আন্দালুসিয়া উচ্চগতির রেলপথে আগামী ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত টিকিট বিক্রি স্থগিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

দুর্ঘটনার দিন স্পেনের বিরোধী দল পিপলস পার্টি তাদের সব নির্বাচনী প্রচার কর্মসূচি বাতিলের ঘোষণা দেয়। আগামী মাসে দেশটিতে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।

চলতি বছরেই একই রেলপথে আরেক দুর্ঘটনা

স্পেনে চলতি বছরের জানুয়ারিতেও উচ্চগতির ট্রেনের দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন। সে সময় একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। দুটি দুর্ঘটনাতেই একই রেলপথে চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্রেন জড়িত থাকায় রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

জানুয়ারির দুর্ঘটনার পর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত সিভিল গার্ডের একটি প্রাথমিক প্রতিবেদনে রেললাইনের ত্রুটি, রেল বা রেললাইনের দুটি অংশের সংযোগস্থলে ওয়েল্ডিংয়ের ত্রুটিকে সম্ভাব্য প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে তদন্তকারীরা আরও সাতটি সম্ভাবনাও খোলা রেখেছিলেন।

স্পেনের রেল নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে লাইনচ্যুতি ও সংঘর্ষসহ বিভিন্ন ধরনের রেল দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৬ সালে এ ধরনের দুর্ঘটনা ছিল ৪৫টি, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭টিতে। গত বছর দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৬৯টি।

একই বছরে দুটি উচ্চগতির ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় দেশটির রেল নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সানচেজ জানিয়েছেন, তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

(সূত্র: রয়টার্স)

/এনএ 

Logo