নেতানিয়াহুর ভাগ্য নির্ধারণে ইসরায়েলের নির্বাচনে রেকর্ড ভোটার উপস্থিতি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৬ পিএম
যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের মূল্যায়ন এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে ভোটারদের ব্যাপক সাড়া দেখা গেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ভোটগ্রহণ শুরুর প্রথম সাত ঘণ্টাতেই ভোট দিয়েছেন যোগ্য ভোটারদের ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ, যা দেশটির নির্বাচনী ইতিহাসে রেকর্ড গড়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। ভোটগ্রহণ শেষ হতে তখনও বাকি ছিল আট ঘণ্টা।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর এটিই দেশটির প্রথম নির্বাচন। ওই হামলায় ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিনের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি গাজা, লেবানন ও ইরানে পরবর্তী যুদ্ধের প্রভাবও এবারের নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভোটকেন্দ্রগুলোর বাইরে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে ছিল তীব্র আগ্রহ ও উদ্বেগ।
নির্বাচনের ফলাফল নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি তাঁর সরকারের বিতর্কিত নীতি ও যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্তেরও মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হচ্ছে। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোটের নীতিগুলো ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বিভাজন বাড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটিকে আরও বিচ্ছিন্ন করেছে বলে সমালোচনা রয়েছে। তবে নেতানিয়াহু তাঁর নেতৃত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়ে দাবি করেছেন, ইসরায়েলের শত্রুদের মোকাবিলা করার মতো দৃঢ়তা ও সক্ষমতা একমাত্র তাঁরই রয়েছে।
ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু মোট ১৯ বছর দেশটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাজনৈতিক টিকে থাকার ক্ষেত্রে তিনি বরাবরই সফল। তাঁর জাতীয়তাবাদী রাজনীতিও দেশটির রাজনীতিতে ক্রমেই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইসরায়েলের খণ্ডিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণে ডানপন্থি, কট্টর ডানপন্থি ও অতি-রক্ষণশীল দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত তাঁর জোটকে ক্ষমতাচ্যুত করা বিরোধীদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট। সাবেক এই সামরিক প্রধান ও নিরাপত্তাবিষয়ক কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত নেতা ডানপন্থি ও মধ্যপন্থি দলগুলোর পাশাপাশি ক্রমেই প্রান্তিক হয়ে পড়া বামপন্থিদের অবশিষ্ট অংশের সমর্থন নিয়ে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান। জনমত জরিপে দুই নেতার মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। তবে কারও জন্যই সরকার গঠন সহজ হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচনে রেকর্ড ভোটার উপস্থিতি ফলাফলে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে পূর্বাভাস দিতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন বিশ্লেষকেরা। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিকদের মধ্যে ভোটদানের হার বেড়ে গেলে নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোটের আসন কমতে পারে। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুকে সরিয়ে নতুন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আরব দলগুলোর সমর্থন নেওয়ার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। তবে ইসরায়েলের ইহুদি রাজনৈতিক নেতাদের অনেকের কাছেই এ ধরনের সমর্থন নেওয়া বিতর্কিত বিষয়।
ভোটগ্রহণ শুরুর পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় পর সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় নেতানিয়াহু তাদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বামপন্থি ও আরব বংশোদ্ভূত ইসরায়েলিদের মধ্যে ভোটদানের হার বেশি। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব বংশোদ্ভূত।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমাদেরও ভোটদানের হার বেশি করতে হবে। আপনাদের সবাইকে ভোটকেন্দ্রে ছুটে যেতে হবে। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।’
এবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার চালিয়েছেন নেতানিয়াহু । ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ট্রাম্প তার মিত্র হিসেবে পাশে ছিলেন। ট্রাম্পও ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান প্রসঙ্গে বলেছেন, তাদের ‘কাজ শেষ করতে হবে’।
তবে ১২০ আসনের ইসরায়েলি পার্লামেন্টে নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকট— কেউই যদি সরকার গঠনের মতো জোট তৈরি করতে না পারেন, তাহলে নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকতে পারেন নেতানিয়াহু।
২০০৯ সালের পর থেকে বিরোধীরা মাত্র একবার তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরাতে পেরেছে। সে সময় দুই বছরের মধ্যে চারটি নির্বাচন হলেও কোনো পক্ষই স্থিতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা হারানোর ১৮ মাস পর আবারও প্রধানমন্ত্রীর পদে ফিরে আসেন নেতানিয়াহু।
‘নতুন চেতনা’ দেখছেন আইজেনকট
নেতানিয়াহুর বিরোধীদের অনেকের কাছে এবারের নির্বাচনের অন্যতম প্রধান বিষয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ওই দিন হামাসের হামলায় ইসরায়েলের প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন। বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠন জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে নেতানিয়াহুর সরকার এ ধরনের তদন্তের বিরোধিতা করে আসছে।
দক্ষিণ ইসরায়েলের কিবুতজ নির ওজ সফরের সময় আইজেনকট বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, আজকের দিন শেষে আমরা পরিবর্তন দেখতে পাব—ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্য একটি নতুন চেতনার সূচনা হবে। গত তিন বছর এবং সেই ভয়াবহ দিনের ঘটনাগুলোর ভুল সংশোধনে এটি ভূমিকা রাখবে।’
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় লক্ষ্যবস্তু হওয়া নির ওজে তার সঙ্গে ছিলেন গাদি মোজেস। হামলার দিন হামাস যাদের অপহরণ করে গাজায় নিয়ে গিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে মোজেসও ছিলেন। ওই হামলায় মোট ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
আইজেনকটের মতে, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানও ব্যর্থ হয়েছে, কারণ হামাস এখনো সেখানে ক্ষমতায় রয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ওই যুদ্ধে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। সরকার গঠনের ১৮ মাসের মধ্যে গাজায় হামাসের সামরিক ও শাসনক্ষমতা ভেঙে দেওয়ার বা ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতি আবারও দিয়েছেন আইজেনকট।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর জোটের কট্টর ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন-গভির মঙ্গলবার সকালে অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিরিয়াত আরবা বসতিতে ভোট দেন। তার পূর্বাভাস, নেতানিয়াহুই আবার প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং তার দল নতুন সরকারের ডানপন্থি অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।
আরব ভোটারদের উপস্থিতি হতে পারে নির্ণায়ক
ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভোটার উপস্থিতি এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আরব দলের প্রার্থী আহমেদ তিবি বলেন, আরব ভোটারদের রেকর্ড উপস্থিতি ‘বিকল্প সরকার গঠন এবং ভয়াবহ বাস্তবতা পরিবর্তনের পথ তৈরি করবে’।
তবে আইজেনকট আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তার যুক্তি, এসব দলের সঙ্গে মূল্যবোধের মিল নেই। যদিও কিছু সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমীকরণে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আরব দলগুলোর সমর্থনে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
নেতানিয়াহু বারবার আরব বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি ভোটারদের দেশের জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার বিরোধীদের অভিযোগ, এ ধরনের বক্তব্য বর্ণবাদী মনোভাব প্রকাশ করে। মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ছবি প্রকাশ করেন। ছবিতে নিকাব পরা নারীসহ আরবদের ভোটকেন্দ্রের বাইরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই চলছে।
এদিকে, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির পতাকাবাহী গাড়ি জেরুজালেমের রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। গাড়িগুলোতে মাইকে আজান বাজানোর পাশাপাশি বলা হচ্ছিল, ‘এখনই ঘর থেকে বেরিয়ে আসুন। আরবরা ভোট দিচ্ছে।’
ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কয়েক দশকের শান্তি আলোচনার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধী আইজেনকটও। ইসরায়েলের প্রায় সব ইহুদি রাজনৈতিক দলের নেতার মতো তিনিও এই সমাধানের বিরোধিতা করেন। তবে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতার সমালোচনা করেছেন তিনি। ২০২৩ সালের পর থেকে এ সহিংসতা বেড়েছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি করেছে। নেতানিয়াহুর জোটের কট্টর ডানপন্থি অংশীদারদেরও বিরোধিতা করেন আইজেনকট।
গাজা, লেবানন ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। ওই অভিযানে উপত্যকাটির বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এক বছর আগে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির আওতায় বর্তমানে গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইসরায়েলের দখলে রয়েছে। হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা থমকে আছে।
এ ছাড়া লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ওপরও বড় ধরনের আঘাত হেনেছে ইসরায়েল। বর্তমানে লেবাননের একটি বিস্তীর্ণ এলাকা ইসরায়েলের দখলে রয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি হামলার ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে ১২ দিনের বিমান অভিযান চালানো হয়। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ যুদ্ধও সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
এসব যুদ্ধ, নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচনকে নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে রেকর্ড ভোটার উপস্থিতি শেষ পর্যন্ত তাঁর ক্ষমতায় থাকা কিংবা বিরোধীদের সরকার গঠনের সম্ভাবনাকে কতটা প্রভাবিত করবে, তা নির্ভর করছে চূড়ান্ত ফলাফল ও পরবর্তী জোট গঠনের সমীকরণের ওপর।
(সূত্র: রয়টার্স)
/এনএ