ইসরায়েলের নির্বাচনে শুরু হয়েছে ভোটগ্রহণ, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম
ইসরায়েলের ২৬তম নেসেট নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন দেশটির নাগরিকেরা। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছেন দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলা, গাজায় দীর্ঘ সামরিক অভিযান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার প্রেক্ষাপটে তার নেতৃত্বের মূল্যায়ন করছেন ভোটাররা।
তবে রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও সহজে হার মানার মানুষ নন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা এই নেতা প্রায় ১৯ বছর দেশটির ক্ষমতায় রয়েছেন।
দেশটিতে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রভাব আরও গভীর হওয়া এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তির কারণে সরকার গঠনের দৌড়ে এখনো সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারেন তিনি।
জনমত জরিপে, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তাদের ডানপন্থি মিত্রদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের নেতৃত্বে রয়েছেন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক চিফ অব স্টাফ গাদি আইজেনকট। নিরাপত্তা বিষয়ে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত এই নেতার প্রতি ডানপন্থি ও মধ্যপন্থি: দুই শিবিরের ভোটারদেরই সমর্থন রয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল ৭টায়, ভোটকেন্দ্র খোলার পর ভোটগ্রহণ শুরু হয়। রাত ১০টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহু যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছেন। ট্রাম্পও নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে অংশ নিয়েছেন।
এর আগে, রোববার (২৫ অক্টোবর) নেতানিয়াহু বলেন, তিনি ক্ষমতায় থাকলেই ইরানের হুমকি ‘চূড়ান্তভাবে’ দূর করতে ট্রাম্প আবারও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। অর্থাৎ, ইরানকে মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়টিকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন তিনি।
তবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছেন আইজেনকট। তার অভিযোগ, নেতানিয়াহু ‘ভীতি ছড়ানো, মিথ্যা ও হুমকির প্রচারণার’ ওপর নির্ভর করছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইসরায়েলের জনগণ যাঁকেই নেতা হিসেবে বেছে নিক না কেন, ট্রাম্প তার সঙ্গে ‘পূর্ণ সহযোগিতার’ ভিত্তিতে কাজ করবেন বলে তিনি আত্মবিশ্বাসী।
সরকার গঠনে ডানপন্থিদের ওপর নির্ভর করতে পারেন নেতানিয়াহু
নির্বাচনের পর সরকার গঠনের জন্য নেতানিয়াহুকে আবারও উগ্র ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে পশ্চিমা কয়েকটি দেশ তাঁদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে জনমত জরিপে বেন-গভিরের দল ‘জিউইশ পাওয়ার’-এর সমর্থন বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকট: কেউই এখন পর্যন্ত সরকার গঠনের বিষয়ে নিশ্চিত অবস্থানে নেই। ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে সরকার গঠন করতে না পারলে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আগামী বছর আবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য নাগরিকের সংখ্যা ৭৩ লাখ। তাদের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার ভোটার এবারই প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছেন।
১৯৪৮ সালে, ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটির সবচেয়ে অস্থির সময়গুলোর একটি পেরিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের নির্বাচন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলার ভয়াবহতা, এরপর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং নেতানিয়াহুর ডানপন্থি সরকারের নীতিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ বিভাজন, সবকিছুই নির্বাচনের আলোচনায় প্রভাব ফেলছে।
নেতানিয়াহুর বিরোধীদের অনেকের কাছে এবারের নির্বাচনের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন হলো, ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার দায় কে নেবে। ওই হামলাকে ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মী ও আইজেনকটের সমর্থক মালি হাজাজ বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা। কারণ, সেখান থেকেই আমাদের ক্ষত নিরাময়ের প্রক্রিয়া শুরু হবে।’
ভোটার লিসা টর্টরও নেতানিয়াহুর বিদায় চান। তার আশা, নতুন সরকার গঠিত হলে ইসরায়েল এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ইহুদিদের ওপর নেতানিয়াহুর নীতির কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, ১৮ বছর বয়সী লিকুদ সমর্থক নফ গ্যাবাই মনে করেন, ৭ অক্টোবরের হামলার জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করা ঠিক নয়। তার ভাষায়, ‘ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্য নেতানিয়াহুই সঠিক ব্যক্তি।’
গ্যাবাই আরও বলেন, ‘নেতানিয়াহু যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্ভব সর্বোত্তম কাজটিই করেছেন।’
ভোটারদের এই বিপরীতমুখী অবস্থানই এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে ইসরায়েলি সমাজের গভীর বিভাজন তুলে ধরছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলায় প্রায় ১ হাজার ২শ' মানুষ নিহত হন এবং আরও ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।
এর জবাবে গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। ওই অভিযানে উপত্যকাটির বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ইসরায়েলি হামলায় সেখানে ৭৪ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
গাজার পাশাপাশি লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধেও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েল। এছাড়া ইরানের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি হামলার পর ২০২৫ সালে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ১২ দিনের বিমান অভিযান চালানো হয়।
চলতি বছর, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ যুদ্ধেও অংশ নেয়।
এসব সামরিক পদক্ষেপকে নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা তার নিরাপত্তানীতির সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন। তবে সমালোচকদের কাছে যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি, ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আইজেনকট বলেছেন, ইসরায়েলের পরবর্তী সরকারকে যেকোনো মূল্যে ইরানকে সামরিক পর্যায়ে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রাখতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ অথবা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে কূটনৈতিক সমঝোতার মতো কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষেও তিনি অবস্থান জানিয়েছেন।
ইসরায়েলের প্রায় সব ইহুদি-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলের মতো আইজেনকটও ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের শান্তি আলোচনার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধিতা করেন। তবে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার সমালোচনা করেছেন তিনি। ২০২৩ সালের পর থেকে এ ধরনের সহিংসতা বেড়েছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কেও চাপ তৈরি করেছে।
নেতানিয়াহুর জোটের দুই উগ্র ডানপন্থি নেতা বেন-গভির ও স্মোত্রিচের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন আইজেনকট।
অন্যদিকে, লিকুদ পার্টির একসময়ের শক্তিশালী সমর্থনভিত্তি হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতেও নেতানিয়াহুর প্রতি অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। তার কিছু হতাশ সমর্থক ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
দুর্নীতির অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিচারপ্রক্রিয়াও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর চাপ তৈরি করছে। এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। তবে অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে তার প্রতি সমর্থন কমেছে বলে মনে করছেন কিছু পর্যবেক্ষক।
এবারের নির্বাচনে ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভোটার উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নাগরিকত্বের দিক থেকে তারা ইসরায়েলি হলেও তাদের জাতিগত পরিচয় ফিলিস্তিনি। এই জনগোষ্ঠীর ভোটার উপস্থিতি বেশি হলে পার্লামেন্টের জটিল আসনবিন্যাসে আইজেনকটের সরকার গঠনের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
যদিও আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন আইজেনকট। তার যুক্তি, এসব দলের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক মূল্যবোধের মিল নেই। তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আরব দলগুলো আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে।
ইসরায়েলের শালোম হার্টম্যান ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোৎস আসা-এল বলেন, ‘আমার ধারণা, যেকোনো পক্ষই খুব সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। বিপুল ব্যবধানে কোনো পক্ষের জয়ের সম্ভাবনা নেই।’
ফলে এবারের নির্বাচনের ফল শুধু নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না; বরং যুদ্ধ-পরবর্তী ইসরায়েলের নিরাপত্তানীতি, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির অবস্থানের দিকনির্দেশনাও এতে প্রভাবিত হতে পারে।
/এআই