×
Logo

আন্তর্জাতিক

টাইমস অব ইসরায়েলের বিশ্লেষণ

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান নাকি আবারও ক্ষমতায়?

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৯ এএম

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান নাকি আবারও ক্ষমতায়?

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বলা হয় ‘রাজনীতির জাদুকর’। বারবার রাজনৈতিক সংকটে পড়েও ক্ষমতায় ফেরার নজির রয়েছে তার। তবে এবার কি সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান হতে যাচ্ছে?

ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে আজ ভোটগ্রহণ। স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভোট চলবে। ভোট শেষ হওয়ার পরপরই সম্ভাব্য ফলাফল প্রকাশ শুরু করবে দেশটির সম্প্রচারমাধ্যমগুলো।

৭ অক্টোবরের হামলা, গাজা ও লেবাননে যুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পর নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত চার বছর ধরে কট্টর ডানপন্থি ও কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের সমর্থনে সরকার পরিচালনা করছেন তিনি। তাই এবারের নির্বাচন শুধু তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, ইসরায়েলের আগামী দিনের গতিপথও নির্ধারণ করতে পারে।

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপে দেখা গেছে, ২০২২ সালের পর থেকে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা কমেছে। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান গাদি আইজেনকটের চেয়েও পিছিয়ে থাকতে পারেন তিনি। নির্বাচনের পর সরকার গঠনের মতো সমর্থন জোগাড় করাও কঠিন হতে পারে নেতানিয়াহুর জন্য।

তবে বিশ্লেষকেরা এখনই তার বিদায় নিশ্চিত বলে মনে করছেন না। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ও হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিডিওন রাহাতের মতে, তিনটি গোষ্ঠীর সমর্থন নেতানিয়াহুকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে। এগুলো হলো কট্টর অর্থোডক্স ইহুদি, কট্টর ডানপন্থি এবং তাঁর ব্যক্তিগত সমর্থকগোষ্ঠী।

কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের অনেকে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে ছাড় পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে, কট্টর ডানপন্থিদের অন্যতম লক্ষ্য পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ ও ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা। নেতানিয়াহুর শাসনামলে এসব লক্ষ্য এগিয়েছে।

রাহাতের মতে, নেতানিয়াহু এমন একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমর্থনবলয় তৈরি করেছেন, যেখানে তার অনুসারীরা বিশ্বাস করেন, ইসরায়েল পরিচালনার যোগ্য একমাত্র ব্যক্তি তিনিই। নেতানিয়াহুও নিজের পরিচয়কে রাষ্ট্রের পরিচয়ের সঙ্গে এক করে দেখেন। ফলে সামরিক ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য বা ব্যর্থতার চেয়ে পরিচয় ও আদর্শের বিষয়টি অনেক ভোটারের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তার সমর্থকদের অনেকে বিশ্বাস করেন, ইসরায়েলে একটি ‘ডিপ স্টেট’ বা অদৃশ্য ক্ষমতাকাঠামো রয়েছে, যারা নেতানিয়াহুর বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল তাকে নানা বাধার মুখে ফেলছে। তাই ৭ অক্টোবরের হামলার মতো বড় ব্যর্থতার জন্যও তাঁকে এককভাবে দায়ী করা উচিত নয়।

তেল আবিবের কাছাকাছি বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জোনাথন রাইনহোল্ডের মতে, ইসরায়েলের ইতিহাসে নেতানিয়াহুর মতো দক্ষ রাজনীতিক আর কেউ ছিলেন না। প্রতিপক্ষকে কৌশলে পেছনে ফেলা এবং নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার দক্ষতাই তাকে দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রে রেখেছে।

তবে গত চার বছরে নেতানিয়াহু সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে অসন্তোষ বেড়েছে। বিচারব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনার উদ্যোগকে অনেকেই গণতন্ত্রের জন্য হুমকি মনে করেন। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীতে জনবলের সংকট থাকা সত্ত্বেও কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের বিষয়টি সমাধান করতে পারেনি সরকার।

এছাড়াও কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। রাইনহোল্ডের আশঙ্কা, নেতানিয়াহু আবার প্রধানমন্ত্রী হলে এসব সমস্যা আরও গভীর হতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্থায়ী অংশ হয়ে উঠতে পারে।

এর আগেও একাধিকবার রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন নেতানিয়াহু। ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে ইসরায়েলে চার দফা নির্বাচন হয়। ২০২১ সালে সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের উদ্যোগে ক্ষমতা হারান তিনি। এর আগে ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী থাকার পর নির্বাচনে হেরে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল তাকে।

এবার দুর্নীতির মামলার বিচারপ্রক্রিয়া, যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে সমালোচনা, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কা এবং অভ্যন্তরীণ নীতির কারণে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন নেতানিয়াহু। সমালোচকদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের স্বার্থের চেয়ে জোটসঙ্গীদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক লক্ষ্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে তার সরকার।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কা নিয়েও কথা বলেছেন নেতানিয়াহু। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প ক্রিপ্টো অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা করেছেন তিনি।

এদিকে, চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছেন নেতানিয়াহু। তবে সেই সমর্থন ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলেনি বলে ইঙ্গিত দিয়েছে জনমত জরিপ।

গত ১৮ অক্টোবর ট্রাম্পের সমর্থন ঘোষণার পরদিন ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ নিউজের এক জরিপে দেখা যায়, ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, এই ঘোষণা তাদের ভোটের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলবে না। ১৭ শতাংশ বলেছেন, এতে নেতানিয়াহুকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা কমেছে। অন্যদিকে, প্রায় ১২ শতাংশ জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সমর্থন লিকুদ পার্টিকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় করেছে।

একই জরিপে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গাদি আইজেনকটের প্রতি সমর্থন বেশি দেখা গেছে। ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান। নেতানিয়াহুর পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন ৩৩ শতাংশ।

জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২১টি আসন পেতে পারে। বর্তমানে বিদায়ী পার্লামেন্ট নেসেটে দলটির আসনসংখ্যা ৩২। অন্যদিকে, আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি পেতে পারে ২৪টি আসন।

তবে তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের বারাক লিডারশিপ সেন্টারের প্রধান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উদি সোমারের মতে, নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ শুধু তার জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করছে না; বিরোধীদলগুলোর ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

সোমার মনে করেন, ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে নেতানিয়াহুর ব্যর্থতা থাকলেও বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদের ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। তার মতে, বিরোধীদলগুলো সরকারের ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং জনঅসন্তোষকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

সোমারের ধারণা, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট আসন হারালেও ইসরায়েলের রাজনীতিতে ডানপন্থি ঝোঁক, জোটসঙ্গীদের সঙ্গে জনমতের মিল এবং বিরোধী দলগুলোর দুর্বলতা তাকে আবারও ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে পারে। একসময় নেসেটে ২৪টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের নেতৃত্ব দেওয়া লাপিদের রাজনৈতিক প্রভাবও কমেছে। ভবিষ্যতে তার দলের আসনসংখ্যা মাত্র দুটিতে নেমে আসতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সোমার।

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত কোনো জনমত জরিপেই নেতানিয়াহু কিংবা বিরোধী জোটের সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। তাই বিশ্লেষকেরা এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না।

সম্ভাব্য পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন দুই বৃহত্তম দলের মধ্যে মধ্যপন্থি জোট গঠন অথবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে আরেকটি নির্বাচন। যেকোনো পরিস্থিতিতেই নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রাজনীতি থেকে অবসরের পরিকল্পনা নেই বলে ইতিমধ্যে জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারেন কিনা তিনি, নাকি এবারের নির্বাচনই তার ক্ষমতার দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটাবে।

/এসআইএন

Logo