×
Logo

আন্তর্জাতিক

মার্কিন কর্মকর্তাদের হত্যাচেষ্টায় ইরানের তৎপরতা বেড়েছে, গোয়েন্দা সতর্কতা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৩ পিএম

মার্কিন কর্মকর্তাদের হত্যাচেষ্টায় ইরানের তৎপরতা বেড়েছে, গোয়েন্দা সতর্কতা

ইরান, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে, মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা প্রধান জে ক্লেটন। 

তার ভাষ্য, মার্কিন নাগরিকদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরান ও ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হুমকির মুখে মধ্যপ্রাচ্যের চারটি দেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে কর্মীর সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাঠানো এক স্মারকলিপিতে এ সতর্কবার্তা দেন ক্লেটন। এতে তিনি বলেন, মার্কিন কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রচেষ্টা ইরান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে বলে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি প্রথম প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।

স্মারকলিপিতে ক্লেটন আরও উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশে মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে ইরানের প্রাণঘাতী হামলার পরিকল্পনা চলছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় পররাষ্ট্র দফতরের আরও বেশি কর্মকর্তার সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে প্রয়োজনীয় তথ্যের গোপনীয়তার মাত্রা যথাসম্ভব কমিয়ে আনার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।

এর কিছুক্ষণ আগে জর্ডান, লেবানন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলোতে কর্মীর সংখ্যা কমানোর ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর। বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে বার্তা সংস্থা এপিকে তিন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান ও ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের কাছ থেকে পাওয়া হুমকির সঙ্গে দূতাবাসগুলোতে কর্মী কমানোর সিদ্ধান্তের সম্পর্ক রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যসহ আরও কয়েকটি দেশে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তাঝুঁকি, গত ফেব্রুয়ারিতে, যুদ্ধ শুরুর পর, সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মূল্যায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার জ্যেষ্ঠ সহযোগীদের নিয়মিতভাবে এ বিষয়ে গোয়েন্দা ব্রিফিং দেওয়া হচ্ছে। গত তিন সপ্তাহ ধরে, বিশ্লেষকেরা মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হুমকিসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য পর্যালোচনা করছেন। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রাষ্ট্রদূতদের মতো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও রয়েছেন বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ইরানের কোনো কোনো অপারেটিভ বা গোপন তৎপরতায় যুক্ত ব্যক্তি থাকতে পারেন বলে গোয়েন্দা তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন স্থানও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে।

তবে আরেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, বিদেশের মাটিতে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা সীমিত। তার মতে, হামলা চালানোর বিষয়ে তেহরানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর করার সামর্থ্য তুলনামূলকভাবে কম।

এর আগে, চলতি মাসেই, ইরানের পক্ষ থেকে হামলার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়ার পর যুক্তরাজ্যের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি থেকে নিজেদের বোমারু বিমান সরিয়ে নেয় মার্কিন বিমানবাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ওই ঘাঁটি ব্যবহার করে আসছিল। স্থাপনাটিতে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে দ্য টাইমস অব ইসরায়েল।

মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে চলতি সপ্তাহের শুরুতেই সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের জরুরি নয়, এমন কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয় ওয়াশিংটন। হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলার প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ নির্দেশের আওতায় রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের পাশাপাশি জেদ্দা ও ধাহরানের মার্কিন কনস্যুলেটের কর্মীরাও রয়েছেন।

চলতি মাসে, ইরান-সমর্থিত হুতিদের কাছ থেকে প্রায় প্রতিদিনই হামলার মুখে পড়েছে সৌদি আরব। এসব হামলার মধ্যে গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালানো হামলাটি ছিল বিশেষভাবে প্রাণঘাতী। এতে অন্তত ১২ জন নিহত এবং কয়েকশ' মানুষ আহত হন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবে সংঘটিত প্রাণঘাতী হামলাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে এক মার্কিন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, হুতিদের হামলার হুমকি এবং ইরানের সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনার কারণে সৌদি আরবে মার্কিন উপস্থিতি কমিয়ে কেবল জরুরি দায়িত্বে থাকা কর্মীদের রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে সৌদি আরবের সঙ্গে অন্য চারটি দেশের পরিস্থিতিতে পার্থক্য রয়েছে। জর্ডান-লেবানন-কাতার-সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন দূতাবাসগুলোর কার্যক্রম সীমিত করা হলেও সেখানকার কর্মীদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়নি। 

এসব দূতাবাস আগে থেকেই ‘রেস্ট্রিকটেড অপারেশনস’ বা সীমিত কার্যক্রমের আওতায় ছিল। ফলে সেখানে কর্মীর সংখ্যা আগেই কমানো হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্তের পরও দূতাবাসগুলো খোলা থাকবে।

এ সপ্তাহে কর্মী কমানোর ঘোষণা দেওয়ার সময় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বিশেষভাবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের কাছ থেকে বেড়ে যাওয়া হুমকির কথা উল্লেখ করে। তবে সরাসরি ইরানের কাছ থেকে মার্কিন কর্মীদের জন্য আসা হুমকির বিষয়টি তখন উল্লেখ করা হয়নি।

এদিকে, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট এবং হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত বেড়েছে। এর অংশ হিসেবে সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে গোষ্ঠীটি। গত ১০ অক্টোবর, রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলাও এ ধারাবাহিকতার অংশ।

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সমর্থন পেয়ে আসছে। ফলে গোষ্ঠীটির হামলার হুমকিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এদিকে, সম্ভাব্য নতুন মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার সঙ্গে দূতাবাসগুলোতে কর্মী কমানোর সিদ্ধান্তের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জোর দিয়ে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তবে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ তৈরি করেছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যা সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করছেন ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দলের নেতারা। এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধটি রাজনৈতিকভাবেও অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

তবে ইরানে আবারও সামরিক হামলা চালানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি ট্রাম্প। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর পরিকল্পনা তৈরি করেছে। যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি ট্রাম্প।

শুক্রবার ফ্লোরিডায় এক সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের প্রশংসা করেন তিনি। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচালিত ওই অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে 

ট্রাম্প বলেন, 'আমরা হয়তো আবারও ছোটখাটো একটি ‘এপিক ফিউরি’ অভিযান চালাতে পারি, অথবা তারা সমঝোতায় আসবে। তারা বুদ্ধিমান হলে শুধু বলবে, ‘চলুন, এবার কাজে নামা যাক।'

এদিকে, যুদ্ধের অচলাবস্থা কাটিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানকে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় ফেরানোর চেষ্টা করছেন মধ্যস্থতাকারীরা। তবে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা কূটনৈতিক উদ্যোগকে আরও জটিল করে তুলছে।

/এআই

Logo