×
Logo

আন্তর্জাতিক

ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতিতে রাজি ইউক্রেন-রাশিয়া, নভেম্বরে শান্তি আলোচনা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৯ এএম

ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতিতে রাজি ইউক্রেন-রাশিয়া, নভেম্বরে শান্তি আলোচনা

যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের ওলেশকি শহরে সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে মস্কো ও কিয়েভ। আগামী ২৭ অক্টোবর থেকে এ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা। এর আওতায় শহরটিতে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এদিকে, যুদ্ধ অবসানে আগামী নভেম্বরের প্রথমার্ধে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর কথা জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। খবর, রয়টার্সের।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) উভয়পক্ষের তরফ থেকেই যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সম্মতির কথা জানানো হয়। হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ওলেশকিতে সাময়িকভাবে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ রাখতে রাজি হয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। এর মাধ্যমে শহরটিতে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং নির্ধারিত নিরাপদ পথ দিয়ে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হবে।

রুশ বাহিনীর প্রধান জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভ দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের টেলিগ্রাম চ্যানেলে জানান, স্থানীয় সময় ২৭ অক্টোবর ভোর ৪টা থেকে গোলাবর্ষণ বন্ধ রাখবে রুশ সেনারা। একই সময় থেকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার কথা জানিয়েছে ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফও। শহরটির বাসিন্দাদের সহায়তায় সম্ভাব্য সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা।

ইউক্রেনের মানবাধিকারবিষয়ক ন্যায়পাল দিমিত্রো লুবিনেতসও ২৭ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের কথা জানিয়েছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, এ কার্যক্রমের আওতায় শহরে প্রবেশের সড়কগুলো থেকে মাইন অপসারণ, খাদ্য সরবরাহ এবং বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া হবে। এরই মধ্যে ড্রোনের মাধ্যমে দুই দফায় ওলেশকিতে খাবার পাঠানোর কথা জানিয়েছে ইউক্রেন।

খাদ্যসংকটে ওলেশকি

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ওলেশকি শহরটি। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে খাদ্যসংকট আরও তীব্র হওয়ার কথা জানিয়েছেন বাসিন্দারা।

হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা খেরসান শহরের বিপরীতে দিনিপ্রো নদীর অপর পাশে অবস্থিত ওলেশকিতে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার মানুষ রয়েছেন। যুদ্ধের আগে শহরটির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ হাজার।

ওলেশকিকে বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা সম্মুখসারির যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর হিসেবে এক বিবৃতিতে বর্ণনা করেছেন মেলানিয়া ট্রাম্প। তিনি বলেন, শহরটিতে অবশিষ্ট বাসিন্দাদের অধিকাংশই বয়স্ক। তাদের জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা, ওষুধ, খাবার ও বিশুদ্ধ পানি প্রয়োজন।

যুদ্ধের মধ্যে রাশিয়ার হাতে আটক ইউক্রেনীয় শিশুদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন মেলানিয়া ট্রাম্প। দুই পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতির সমন্বয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। গত সপ্তাহে পোপ লিও ওলেশকির পরিস্থিতি নিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলেছেন।

নভেম্বরে নতুন করে শান্তি আলোচনা

এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। শুক্রবার জেলেনস্কি জানান, ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা আগামী নভেম্বরের প্রথমার্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আবুধাবি অথবা সুইজারল্যান্ডে এ বৈঠক হতে পারে।

আলোচনার পর তিন দেশের নেতাদের মধ্যে বৈঠক আয়োজনের আশা প্রকাশ করেছেন জেলেনস্কি। তবে এ উদ্যোগের অগ্রগতি রাশিয়ার অবস্থানের ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে বলে মনে করেন তিনি। চলতি মাসে একই ধরনের একটি বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে নরওয়েতে বৈঠকের পর জেলেনস্কির এ ঘোষণা আসে। পরে উইটকফ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে সেন্ট পিটার্সবার্গে বৈঠক করেন। শুক্রবার উইটকফ ও যুক্তরাষ্ট্রের আরেক বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনারের সঙ্গেও কথা বলেছেন বলে জানান জেলেনস্কি।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেন, যেকোনো শান্তিচুক্তিতে ইউক্রেনের জন্য শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা থাকতে হবে। পাশাপাশি দেশটির সেনাবাহিনীকে সক্ষম রাখতে আগামী ১০ বছরের জন্য অর্থায়নের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। যুদ্ধবিরতি ও সংঘাতের অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি আলোচনায় ইউরোপের অংশগ্রহণও প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত হিসেবে বিবেচিত এ যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আগের কয়েক দফা আলোচনা হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আলোচনাগুলোও কার্যত অচলাবস্থায় পড়ে। রাশিয়া এখনো ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দনবাসের পুরো এলাকা ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে, যার কিছু অংশ এখনো রুশ বাহিনীর দখলে নেই। তবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসছে কিয়েভ।

ওয়াশিংটন-কিয়েভ সম্পর্কে টানাপোড়েন

নতুন শান্তি উদ্যোগের মধ্যেই সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কয়েকটি পদক্ষেপকে রাশিয়ার প্রতি অনুকূল হিসেবে দেখছে কিয়েভ।

এর মধ্যে ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগে ব্যবহৃত স্পেসএক্সের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থায় গতি ও ব্যবহারের ওপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা অন্যতম। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা শুক্রবারও জানিয়েছেন, এসব বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে। এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, স্টারলিংক সেবা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।

শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, এ বিষয়ে তিনি এখনো স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে প্রয়োজন হলে কথা বলে সমস্যার সমাধান করবেন। গত ১৩ অক্টোবর থেকে বিধিনিষেধগুলো কার্যকর রয়েছে।

এ ছাড়া রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে ডিজেল সরবরাহের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের ঘোষণাও দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধের কারণ হয়েছে। ইউক্রেন এ উদ্যোগের সমালোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুক্রবার রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক জানান, রাশিয়ার ডিজেল নিয়ে প্রথম তিনটি ট্যাংকার উত্তর আমেরিকার পথে রয়েছে।

এদিকে, শুক্রবার রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে বন্দি বিনিময় হয়েছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই পক্ষই ২৭০ জন করে সেনাসদস্য বিনিময় করেছে। আগস্টের পর এটিই প্রথম বন্দি বিনিময়। ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্জন’ বলে উল্লেখ করেছেন জেলেনস্কি।

ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত প্রসিকিউটর আন্তন কোভালস্কি টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেছেন, রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর থেকে দেশটিতে ১৯ হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৭৬২টি শিশু রয়েছে বলেও জানান তিনি।

/এনএ

Logo