নতুন ‘লাল তারকা’ নেহা বোরা মোদির জন্য কতটা চিন্তার?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৬ পিএম
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের আন্দোলনে নতুন এক মুখ হয়ে উঠেছেন ২৯ বছর বয়সী নেত্রী নেহা বোরা। একসময় বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লির রাজপথে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। সম্প্রতি নেহা বোরার রাজনৈতিক আবহ ও উত্থান নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আলজাজিরা।
বামপন্থী ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) এই নেত্রীর উত্থান এমন এক সময়ে, যখন পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়ম, কর্মসংস্থান এবং ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কে মোদি সরকারকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন ইতোমধ্যে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। তবে নেহা বোরার এই জনপ্রিয়তা শেষ পর্যন্ত কতটা নির্বাচনী শক্তিতে রূপ নেবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
রাজপথ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেহা:
গত ১২ অক্টোবর ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধি হাজারও সমর্থককে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করেন। উদ্দেশ্য ছিল দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে আবেদন জমা দেওয়া। ওই মিছিলে রাহুলের পাশে দেখা যায় নেহা বোরাকে। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে তার উপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাসে দিল্লির জন্তর মন্তরে তরুণদের বিক্ষোভে আলোচনায় এসেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক গোষ্ঠী। তবে একই আন্দোলনের ধারায় নেহা বোরাও হয়ে উঠেছেন মোদি সরকারের নীতির বিরোধিতাকারী তরুণদের অন্যতম পরিচিত মুখ।
পুলিশের ধরপাকড় এড়িয়ে বিক্ষোভ সংগঠিত করা এবং আটক হওয়ার সময়ও স্লোগান দিতে থাকার দৃশ্য তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় করেছে। তার প্রতিবাদী মুহূর্তগুলো নিয়ে তৈরি হচ্ছে ভিডিও, ফ্যান এডিট এমনকি ভিডিও গেমও।

পুলিশের চোখ এড়িয়ে বিক্ষোভ:
গত ১০ অক্টোবর দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছিল। পুলিশ আগেভাগেই আন্দোলনকারীদের আটক করতে শুরু করে। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বিক্ষোভকারীদের আটক করা হয়, ছাত্রনেতাদের বাড়িতে আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়। এমনকি ককরোচ আন্দোলনের কয়েকজন নেতাকে বহনকারী একটি উড়োজাহাজ দিল্লিতে অবতরণের পর তাদের আটক করা হয়।
কিন্তু ওই দিন পুলিশের নজর এড়িয়ে যান নেহা বোর। পরে তাকে দক্ষিণ দিল্লিতে কয়েক শ সমর্থককে নিয়ে মিছিল করতে দেখা যায়। ইনস্টাগ্রামে সরাসরি সম্প্রচারও করেন তিনি। প্রায় আধা ঘণ্টা পর পুলিশ তাকে আটক করে। পরে অবশ্য ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ ধরনের কৌশলই তাকে আন্দোলনকারীদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে। আল জাজিরার ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের বাধা অতিক্রম করে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ আয়োজনের ঘটনায় তার পরিচিতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বামপন্থী রাজনীতির নতুন প্রজন্ম:
নেহা বোরার রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতা। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় এক দশক ধরে পড়াশোনা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত তিনি। বর্তমানে এআইএসএর জাতীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত এআইএসএ ভারতের বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির পরিচিত সংগঠন। সংগঠনটি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন হিসেবে পরিচিত। দলটির ঐতিহাসিক শিকড় নকশালপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলেও নব্বইয়ের দশকে দলটি সশস্ত্র সংগ্রামের পথ পরিত্যাগ করে সংসদীয় রাজনীতিতে অংশ নিতে শুরু করে।
নেহা বোরার মতে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী উত্তরাধিকার নিয়ে কথা বলার অধিকার বামপন্থীদেরও রয়েছে। আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যারা নিজেদের জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা বলে দাবি করে, তারা কেন স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারীদের বৈধতা অস্বীকার করতে চায়?
অন্যদিকে, ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বামপন্থী রাজনীতির বিরোধিতা করে আসছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি তার স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ‘আরবান নকশাল’ ও ‘ইন্টেলেকচুয়াল নকশাল’ শব্দ ব্যবহার করে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। বিরোধী ও সমালোচকদের বিরুদ্ধে এসব শব্দ প্রয়োগ নিয়ে ভারতের রাজনীতিতে বিতর্ক রয়েছে।
পারিবারিক দূরত্ব থেকে আন্দোলনের সামনের সারিতে:
ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের খাটিমায় জন্ম নেহা বোরার। তার বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় শৈশবে পরিবারের সঙ্গে বিভিন্ন শহরে থাকতে হয়েছে তাকে। কিশোর বয়সে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে পরিবারের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়।
চলতি বছরের মাঝামাঝি জন্তর মন্তরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে ২৩ দিনের অনশন করেন নেহা। তার এই অনশন জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি এনে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মীরা।
২০১৯ সালে ভারতের নাগরিকত্ব আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীর বিরুদ্ধে আন্দোলনেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। সমালোচকদের মতে, ওই সংশোধনী মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যমূলক হতে পারে। সেই আন্দোলনই তার রাজনৈতিক সচেতনতা ও সক্রিয়তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করে।

মোদির জন্য কতটা বড় রাজনৈতিক হুমকি?:
নেহা বোরার জনপ্রিয়তা বাড়লেও ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে বামপন্থী ছাত্রনেতৃত্বের সামনে বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এআইএসএর প্রভাব মূলত বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্ররাজনীতির কিছু অঞ্চলে সীমিত। সংগঠনটির মূল রাজনৈতিক দল সিপিআই (এমএল) লিবারেশনেরও জাতীয় পর্যায়ে প্রভাব তুলনামূলক কম। দলটির লোকসভায় দুজন সদস্য রয়েছেন; কোনো রাজ্যে এককভাবে সরকার গঠনের অভিজ্ঞতা নেই।
নয়াদিল্লিভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলির মতে, ছাত্ররাজনীতি থেকে নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশের জন্য প্রয়োজন বিস্তৃত সাংগঠনিক ভিত্তি এবং নির্দিষ্ট এলাকায় ভোটারদের সমর্থন। নেহা বোরার ক্ষেত্রে এখনও এমন শক্তিশালী নির্বাচনী ভিত্তি গড়ে ওঠেনি।
কংগ্রেসের মতো বৃহত্তর রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়া তার জন্য সম্ভাব্য একটি পথ হতে পারে। তবে সেখানেও প্রতিষ্ঠিত নেতাদের প্রভাব ও দলীয় কাঠামোর মধ্যে জায়গা করে নেওয়া সহজ হবে না।
তবু বিশ্লেষকদের মতে, নেহা বোরার প্রতি তরুণদের আগ্রহকে শুধু বামপন্থী রাজনীতির সমর্থন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মোদি সরকারের প্রতি অসন্তোষ, গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ এবং তরুণদের মধ্যে নতুন নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষাও তার জনপ্রিয়তার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
ভারতের তরুণদের আন্দোলনে নেহা বোরার উত্থান তাই শুধু একজন ছাত্রনেত্রীর পরিচিতি বাড়ার ঘটনা নয়; এটি বিরোধী রাজনীতির নতুন মুখ ও নতুন কৌশলেরও ইঙ্গিত। তবে এই জনপ্রিয়তা মোদি সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে কি না, তা নির্ভর করবে আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হয় এবং রাজপথের সমর্থনকে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া যায় কি না, তার ওপর।
/এমএমএইচ