×
Logo

আন্তর্জাতিক

৬শ’ মিটার দূরে লক্ষ্যভেদে সক্ষম ‘ফায়ার স্টর্ম ২৫০’

মেশিনগান সজ্জিত ড্রোনের সফল পরীক্ষা ইসরায়েলের

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৬ পিএম

মেশিনগান সজ্জিত ড্রোনের সফল পরীক্ষা ইসরায়েলের

মেশিনগান সজ্জিত একটি ড্রোনের পরীক্ষামূলক গুলি ছোড়ার কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (আইএআই) ও মার্কিন অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিগ সাওয়ার। 

‘ফায়ার স্টর্ম ২৫০’ নামের এই ড্রোনে যুক্ত করা হয়েছে সিগ সাওয়ারের দূরনিয়ন্ত্রিত অস্ত্রব্যবস্থা এবং নতুন 'এম-২৫০' মেশিনগান।

ওয়াশিংটনে, অনুষ্ঠিতব্য 'আউসা ২০২৬' প্রদর্শনীর আগে, ইসরায়েলে এ পরীক্ষা চালানো হয়। 

দ্য জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষায় ড্রোনটির উড্ডয়ন অবস্থায় লক্ষ্য শনাক্ত, লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং তাতে গুলি ছোড়ার সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে। এ সময় ড্রোনটি একটি কৃত্রিম যুদ্ধক্ষেত্রের সিমুলেশন তৈরি করে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করে।

পরীক্ষার সময়, ড্রোনটি নির্দিষ্ট এলাকার আকাশে অবস্থান করে নিজস্ব ক্যামেরার সাহায্যে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে। এরপর একক গুলি ও আধা-স্বয়ংক্রিয়: দুই পদ্ধতিতেই গুলি ছোড়ে। 

বিভিন্ন উচ্চতা ও দূরত্ব থেকে গুলি চালিয়ে অস্ত্রটির নির্ভুলতা, স্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নিরাপদে পরিচালনার সক্ষমতা যাচাই করা হয়।

এটি এখনো কার্যকরী প্রোটোটাইপ বা পরীক্ষামূলক সংস্করণ পর্যায়ে চয়েছে। 

তবে দুই প্রতিষ্ঠানই জানিয়েছে, পরীক্ষায় আকাশ থেকে নজরদারি এবং স্থিতিশীল, দূরনিয়ন্ত্রিত অস্ত্রব্যবস্থাকে একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার মূল ধারণাটির কার্যকারিতা যাচাই করা গেছে। এর ফলে ছোট সামরিক ইউনিটগুলো কাছাকাছি অবস্থানে থাকা বাহিনীকে সহায়তা দেওয়ার জন্য নিজস্ব ড্রোন ব্যবহার করতে পারবে।

FIRESTORM 250 is intended to be deployed with small tactical units for overwatch, intelligence gathering, force protection, border defense and special‑operations surveillance.
ড্রোনটি ছোট আকারের মিলিটারি ট্যাকটিক্যাল ইউনিটের সঙ্গে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এটি শত্রুর গতিবিধির ওপর নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সেনাসদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সীমান্ত প্রতিরক্ষা এবং বিশেষ অভিযান চলাকালে নজরদারির কাজে ব্যবহারের উপযোগী। ছবি: জেরুজালেম পোস্ট। 

'ফায়ার স্টর্ম ২৫০' তৈরি করা হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে আকাশে অবস্থান করে নজরদারি এবং সশস্ত্র গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। এতে বহু ধরনের জ্বালানিতে চলতে সক্ষম অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। 

একবার জ্বালানি নিয়ে, ড্রোনটি, সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টা আকাশে থাকতে পারে। ওয়ার জোনেই, এতে পুনরায় জ্বালানি ভরা সম্ভব। ফলে, ব্যাটারি চার্জের জন্য অপেক্ষা কিংবা বিশেষায়িত সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমবে।

ড্রোনটির ভিটিওএল সক্ষমতা থাকায় রানওয়ে বা প্রচলিত বিমান পরিচালনার সহায়তা ছাড়াই সামনের সারির অবস্থান থেকে এটি উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে।

সিগ সাওয়ারের 'এম-২৫০' এয়ারবর্ন লাইট মেশিনগানে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী '৭.৬২×৫১' মিলিমিটার অথবা '৬.৮×৫১' মিলিমিটার ক্যালিবারের সর্বোচ্চ ২০০ রাউন্ড গুলি বহনের ব্যবস্থা রাখা যায়। 

২শ' মিটার উচ্চতায় অবস্থান করে ৪০০-৬০০ মিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিশানা করার সক্ষমতা রয়েছে অস্ত্রটির। মেশিনগান, গোলাবারুদ ও মাইক্রোলাইট দূরনিয়ন্ত্রিত অস্ত্রব্যবস্থাসহ পুরো ড্রোনটির ওজন ৫৩ পাউন্ড।

ড্রোনটির সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য এবং গুলি চালানোর নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত উপাত্ত একত্র করে লক্ষ্যবস্তুর একটি সমন্বিত চিত্র তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রকেরা তাৎক্ষণিক দৃশ্য, লক্ষ্যবস্তুর গতিবিধি অনুসরণের তথ্য এবং গুলি চালানোর বিভিন্ন বিকল্প দেখতে পান। 

এছাড়াও অ্যালগরিদমের সাহায্যে ড্রোনটি আকাশে স্থির থাকা কিংবা চলাচলের সময়ও গুলি চালানোর নির্ভুলতা বজায় রাখার চেষ্টা করে।

আউসা প্রদর্শনীতে, ডিফেন্স অ্যান্ড টেককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিগ সাওয়ারের প্রতিরক্ষা পণ্যবিষয়ক ব্যবস্থাপক মাইক জোসলিন বলেন, ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থানগুলোর একটি হলো অস্ত্রের রেঞ্জের ভেতরে থাকা। মূল ধারণাটি হলো, যাতে সেনাকে সরাসরি গুলির ঝুঁকিতে পড়তে না হয়, সেজন্যই এমন উদ্ভাবন।’

তিনি আরও বলেন, ‘সেনাকে নিজের হাতে বন্দুক ধরে রাখার পরিবর্তে সেটি নিয়ন্ত্রণের ইন্টারফেসটি হাতে রাখতে হবে।’

তবে পুরো ব্যবস্থায় মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয়েছে। নিয়ন্ত্রকেরা সরাসরি সেন্সরের ছবি, লক্ষ্যবস্তুর গতিবিধি এবং গুলি চালানোর বিকল্পগুলো দেখতে পারবেন। প্রতিবার গুলি চালানোর আগে তাদের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।

সিগ সাওয়ারের ইসরায়েল শাখার মহাব্যবস্থাপক সাল্লি ওকানিন বলেন, পরীক্ষাটি দেখিয়েছে, হালকা ওজনের অস্ত্র ছোট আকারের চালকবিহীন আকাশযানের সক্ষমতা কতটা বাড়াতে পারে।

তিনি বলেন, ‘ফায়ার স্টর্ম ২৫০' বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তিগুলোকে একত্র করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, আইএআইয়ের ড্রোন প্ল্যাটফর্ম এবং 'এম-২৫০' মেশিনগান সংযুক্ত সিগ সাওয়ারের মাইক্রোলাইট দূরনিয়ন্ত্রিত অস্ত্রব্যবস্থা। এর মাধ্যমে অভিযান পরিচালনায় নতুন মাত্রার নমনীয়তা তৈরি হবে।’

ওকানিনের মতে, পুরোনো ব্যবস্থার তুলনায়, এই প্ল্যাটফর্মের পাল্লা বেশি এবং ওজন কম। এতে ছোট সামরিক ইউনিটের সুবিধা বাড়বে, পাশাপাশি ড্রোনের নতুন ব্যবহারও সম্ভব হবে।

আইএআইয়ের সামরিক উড়োজাহাজ বিভাগের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান মোশে লেভি বলেন, এ প্রদর্শনী কৌশলগত চালকবিহীন ব্যবস্থার নকশা তৈরির ক্ষেত্রে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

তিনি বলেন, ‘চালকবিহীন ব্যবস্থার পরবর্তী প্রজন্মকে শুধু স্বয়ংক্রিয়তার ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করা হবে না; বরং তথ্য সংগ্রহ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতাকে কতটা কার্যকরভাবে একত্র করা যায়, তার ওপরও নির্ভর করবে।’

লেভির ভাষ্য, 'ফায়ার স্টর্ম ২৫০' এসব সক্ষমতাকে একটি সমন্বিত কার্যক্রমের মধ্যে নিয়ে এসেছে। এর ফলে সামরিক বাহিনী নিজেদের কার্যপরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি চারপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবিচ্ছিন্ন ধারণা রাখতে পারবে। তবে কখন অস্ত্র ব্যবহার করা হবে, সে সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাতেই থাকবে।

তিনি আরও বলেন, বাস্তবসম্মত অভিযান পরিস্থিতিতে চালানো পরীক্ষামূলক গুলি এই পদ্ধতির সম্ভাবনা তুলে ধরেছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিগ সাওয়ারের সঙ্গে আইএআইয়ের এই সহযোগিতা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের চালকবিহীন আকাশযানের বহর সম্প্রসারণ করছে।

সিগ সাওয়ারের অ্যাডভান্সড কনসেপ্টস বিভাগের পরিচালক রায়ান স্কট বলেন, ‘ড্রোনই আধুনিক যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে ২২ বছর কাজ করা এবং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চালকবিহীন ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে স্কটের। তিনি জানান, আড়াইশ' বছরের পুরোনো প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বছর ধরে ড্রোনের নকশা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে।

তার মতে, প্রতিষ্ঠানের এই নতুন উদ্যোগ সেনাদের সহায়তায় তাদের উদ্ভাবনী সক্ষমতার পরিচয় দেয়।

ফায়ার স্টর্মের পাশাপাশি, প্রদর্শনীতে, নিজেদের স্থির ডানাবিশিষ্ট ‘স্কাইথ’ প্ল্যাটফর্ম এবং এম-হর্নেট ২২ এলআর অস্ত্র সংযুক্ত ‘সেবার’ কোয়াডকপ্টারও প্রদর্শন করেছে সিগ সাওয়ার। এছাড়া চালকবিহীন আকাশযান প্রতিরোধে তৈরি তাদের এক্স-রে-৯ প্ল্যাটফর্মের প্রোটোটাইপও দেখানো হয়।

ইসরায়েলের কাছে ড্রোন বিক্রির সম্ভাবনা নিয়ে স্কট বলেন, ‘ইসরায়েল যদি আমাদের ড্রোন চায়, তাহলে আমরা সেগুলো বিক্রি করবো।’

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাতের প্রতি নিজের সমর্থনের কথা তুলে ধরে জোসলিন বলেন, ‘ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো একই মাত্রার আবেগ আর কোথাও দেখা যায় না। দেশের সেবা করার বিষয়টি তাদের সংস্কৃতিরই অংশ।’

/এআই 

Logo