রয়টার্সের প্রতিবেদন
আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘিরে ষড়যন্ত্রে ইরানের সংশ্লিষ্টতার জোরালো সন্দেহ, দাবি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৬ পিএম
যুক্তরাজ্যের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে কথিত ষড়যন্ত্রের পেছনে ইরানের সংশ্লিষ্টতা থাকার সম্ভাবনা প্রবল বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।
তার মতে, ষড়যন্ত্রটি ইরান থেকে সমন্বয় করা হয়ে থাকতে পারে এবং প্রায় নিশ্চিতভাবেই এর নির্দেশনা এসেছে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কাছ থেকে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) পার্লামেন্টে বার্নহ্যাম বলেন, তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ষড়যন্ত্রটি ইরান থেকে সমন্বয় করা হয়ে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। আর এর পেছনে প্রায় নিশ্চিতভাবেই রয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর।
ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটিটি ইরানে হামলা চালাতে মার্কিন বোমারু বিমান ব্যবহারের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। গত ২৭ সেপ্টেম্বর, স্থানীয় সময় ভোরে, ঘাঁটির কাছাকাছি এলাকা থেকে সন্ত্রাসবাদ ও বিস্ফোরক-সংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহে পাঁচ ব্রিটিশ নাগরিককে গ্রেফতারের পর সেখানে বড় ধরনের নিরাপত্তা তৎপরতা শুরু হয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ঘাঁটিটিতে ড্রোন হামলা চালানোর একটি কথিত পরিকল্পনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ করা হচ্ছিল। গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেন, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি হুমকির কারণে ফেয়ারফোর্ড থেকে বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
তবে এ ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএর বরাতে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত সাইয়েদ আলী মুসাভি বলেন, এ ঘটনায় তেহরানের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ব্রিটিশ সরকারের কাছে অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা প্রমাণ থাকলে তা প্রকাশ করা উচিত।
ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি ঘিরে কথিত ষড়যন্ত্রের বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি। গ্রেফতার হওয়া পাঁচজনকে পরে কঠোর শর্তে পুলিশি জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া আরও দুজনকেও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের একজন ব্রিটিশ-ইরানি নাগরিক।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ওই পাঁচজনের সঙ্গে জব্দ করা ভ্যানগুলোতে পেট্রল পাওয়া গেলেও কার্যকর বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশ ও প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম—দুজনই এ ঘটনার পেছনে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ পার্লামেন্টে বলেন, ইরানে অবস্থানরত এক পরিচিত ব্যক্তি এ ঘটনার পেছনে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ওই ব্যক্তির নাম প্রকাশ করেননি তিনি।
বার্নহ্যাম বলেন, যুক্তরাজ্যের ভূখণ্ডে এ ধরনের হুমকি সহ্য করা হবে না। অপরাধী নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে ইরানের তৎপরতা দমনে সব ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে। এসব নেটওয়ার্ক এবং তাদের অর্থায়নের উৎসকে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ইরান ও আইআরজিসির ক্ষতি করার সক্ষমতা সীমিত করতে আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ প্রায় ৩০টি দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানের বিরুদ্ধে সহিংস হামলা ও গোপন তৎপরতা চালানোর অভিযোগের নিন্দা জানিয়েছে।
বিবৃতিতে প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্র, অগ্নিসংযোগ, নাশকতা, সাইবার হামলা এবং অন্যান্য সমন্বিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য ও তার অংশীদারদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ তোলা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এ ঘটনা থেকে যুক্তরাজ্য এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, নিজেদের সীমানার বাইরে গোপন নেটওয়ার্ক ও সহযোগী গোষ্ঠীর মাধ্যমে শত্রুতামূলক তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ আইআরজিসির রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ কয়েক বছর ধরেই দেশটিতে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র ও হত্যাচেষ্টায় ইরানের অপরাধী নেটওয়ার্ক ও সহযোগীদের ব্যবহারের অভিযোগ করে আসছে। এসব অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে তেহরান।
ব্রিটিশ সরকার গত বছর জানিয়েছিল, যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত ব্যক্তিদের হত্যা বা অপহরণের জন্য ইরান-সমর্থিত ২০টি বিশ্বাসযোগ্য হুমকির তথ্য তাদের কাছে ছিল।
চলতি বছরের জুলাইয়ে, নতুন আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে, আইআরজিসি এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী হারাকাত আসহাব আল-ইয়ামিন আল-ইসলামিয়া (হায়ি)-কে সমর্থন দেওয়া নিষিদ্ধ করে যুক্তরাজ্য।
গোষ্ঠীটি চলতি বছরের শুরুর দিকে ইহুদি ও ইসরায়েলি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা এবং ফারসি ভাষার গণমাধ্যমে সাতটি হামলার দায় স্বীকার করেছিল।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড জানিয়েছেন, এ ঘটনায় তিনি ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই ইরানি নাগরিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা দুই ব্যক্তি হলেন রুহুল্লাহ বাজঘান্দি এবং শাহরাম আলী রেজা তামারজাদেহ জাক্কি। ব্রিটিশ সরকারের দাবি, বাজঘান্দি আইআরজিসির পাল্টা গোয়েন্দা কার্যক্রমের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অন্যদিকে, জাক্কি ইতোমধ্যে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জিন্দাশতি অপরাধী নেটওয়ার্কের একজন সহযোগী। ইরানি ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে একাধিক ষড়যন্ত্রে এই নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
তবে ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি ঘিরে কথিত ষড়যন্ত্রের তদন্ত এখনো চলছে। এ ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ যেমন সামনে এসেছে, তেমনি তেহরানও তা অস্বীকার করেছে।
/এআই