×
Logo

আন্তর্জাতিক

রয়টার্সের প্রতিবেদন

সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে ফের হামলা, নিহত ১

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪২ এএম

সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে ফের হামলা, নিহত ১

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নতুন করে হামলায় একজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১১ জন। এ হামলার এক দিন আগে ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। 

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ধারাবাহিক এসব হামলায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী জানিয়েছে, রোববার (১১ অক্টোবর) রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের 'টার্মিনাল-৪' লক্ষ্য করে একটি অজ্ঞাত বস্তু নিক্ষেপ করা হয়। এতে সেখানে আগুন ধরে যায়। 

সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ঘটনায় একজন নিহত হওয়ার পাশাপাশি আরও ১১ জন আহত হয়েছেন।

এদিকে, সৌদি জোট বাহিনী জানিয়েছে, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি এলাকায় একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। পরে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে একটি ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করার কথাও জানানো হয়। এছাড়া খামিস মুশাইত শহর লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করা হয়েছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) স্থানীয় সময় ভোরে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় আভা শহরে জরুরি সতর্কবার্তা জারি করা হয়। তবে পরে বিপদের আশঙ্কা কেটে গেছে বলে জানিয়েছে সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ।

সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন

সৌদি আরব, ইয়েমেনে, হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বিমান অভিযান চালাচ্ছে। অন্যদিকে, হুতিরা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সৌদি-সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে স্থলযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে, সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

শনিবার (১১ অক্টোবর) রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার পর সৌদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ধর্মীয় তীর্থযাত্রীরা বিমানবন্দরের একটি প্রবেশপথে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। 

ইসলামের দুই পবিত্রতম স্থান সফরের উদ্দেশ্যে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তারা। এ সময় হঠাৎ উজ্জ্বল কমলা রঙের বিস্ফোরণের ঝলক দেখা যায়। আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করেন লোকজন। ভিডিওতে বিমানবন্দরের ছাদের কিছু অংশ ধসে পড়তেও দেখা যায়।

হামলার পর বিমানবন্দরটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও হামলার দায় স্বীকার হুতিদের

রোববার (১১ অক্টোবর) টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে, শনিবারের (১০ অক্টোবর) হামলার দায় স্বীকার করেন হুতি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি। 

তিনি দাবি করেন, সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের দাম্মাম বিমানবন্দর এবং দেশটির বৃহৎ তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর দুটি স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছে তাদের গোষ্ঠী।

তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে সৌদি সরকারের মিডিয়া অফিস ও আরামকোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি।

রোববার (১১ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাতে,  দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বিমানবন্দরের স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং নিরাপত্তা পরিদর্শনের কাজ চলছে।

ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে দাম্মাম বিমানবন্দরে চলাচলের প্রস্তুতি নেওয়া একটি উড়োজাহাজের ভেতর থেকে তিনি কয়েকটি পার্ক করে রাখা উড়োজাহাজের পাশে রানওয়েতে একটি বস্তু আঘাত হানতে দেখেন। এতে আগুন ধরে যায়। পরে উড়োজাহাজটি আবার নির্ধারিত গেটে ফিরে আসে। যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে বিমানবন্দর ত্যাগ করতে বলা হয়।

ফ্লাইট চলাচলের তথ্য সরবরাহকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, রোববার দাম্মাম বিমানবন্দরে একাধিক ফ্লাইটের অবতরণ ও উড্ডয়নে বিলম্ব হয়। বাতিলও করা হয় বেশ কয়েকটি ফ্লাইট। সৌদি আরবের তৃতীয় বৃহত্তম এই বিমানবন্দরে হামলার পর বিমান চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

এর আগে, রোববার সৌদি আরবের বিমানবন্দর ব্যবহার না করার বিষয়ে নতুন করে সতর্কবার্তা দেয় হুতি বিদ্রোহীরা। এক বিবৃতিতে গোষ্ঠীটি জানায়, তাদের সতর্কবার্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত। ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য হামলা প্রতিহত করতে ব্যর্থ হলে তার দায় সৌদি আরবকেই নিতে হবে।

এদিকে, সৌদি আরবে, অবস্থিত ব্রিটিশ দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ব্রিটিশ নাগরিকদের জেদ্দা, দাম্মাম এবং মদিনা ছাড়া দেশটির অন্যান্য বিমানবন্দরে অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে, সৌদি আরবের উদ্দেশে বা দেশটির আকাশসীমার ওপর দিয়ে উড়োজাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে মার্কিন বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও দেশটির এয়ারলাইনসগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে।

‘এর চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি আসতে পারে’

গত মাসে, লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী কৌশলগত এলাকায় হুতিরা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার পর ইয়েমেনে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে সৌদি আরব। হুতিদের লক্ষ্য করে বিমান হামলার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযানেও সমর্থন দিচ্ছে রিয়াদ।

হুতিদের দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনে ১২৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ইয়েমেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোববার আল-মাসিরা টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছে, সৌদি আরব, ইয়েমেনে, আগ্রাসন ও হস্তক্ষেপ বন্ধ না করলে সামনে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এদিকে, শনিবার (১১ অক্টোবর) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রও যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ইরানবিরোধী যুদ্ধের প্রভাবও ছড়িয়ে পড়েছে এই সংঘাতে।

অন্যদিকে, টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। এ সময় সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সংলাপ এগিয়ে নিতে সহায়তার বিষয়ে তেহরানের প্রস্তুতির কথা জানান তিনি।

হামলার মধ্যেও চলছে জ্বালানি সম্মেলন

নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যেও রোববার রিয়াদে নির্ধারিত সময়েই শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ডব্লিউপিসি এনার্জির পাঁচ দিনব্যাপী সম্মেলন। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে একটি কনভেনশন সেন্টারে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একই দিনে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ফোরামের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এতে কোন কোন দেশের মন্ত্রীরা অংশ নিয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সম্মেলনের সহ-আয়োজক ইতালির জ্বালানিমন্ত্রী জিলবার্তো পিকেত্তো ফ্রাতিন শুক্রবার জানিয়েছিলেন, তিনি ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে বৈঠকে অংশ নেবেন।

এদিকে, জার্মানির অর্থনীতিমন্ত্রী ক্যাথারিনা রাইখের দেশে ফেরার জন্য বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছেন দেশটির কর্মকর্তারা। সোমবার রিয়াদ থেকে বার্লিনে ফেরার কথা ছিল তার। তবে জার্মানির অর্থনীতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তার ফ্লাইট উড্ডয়ন করতে 'না' পারার আশঙ্কা রয়েছে।

নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে রিয়াদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রাজধানীর স্কুলগুলোতে সশরীরে ক্লাসের পরিবর্তে অনলাইনে পাঠদান চলবে।

/এআই

Logo