সিএনএনের প্রতিবেদন
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বড় ইস্যু ট্রাম্প, অপরাধ-দুর্নীতি নিয়েও ভোটারদের অনাস্থা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম
দুর্নীতি কেলেঙ্কারি, তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ভোটারদের বাড়তে থাকা অনাগ্রহের মধ্যেই রোববার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিয়েছে ব্রাজিলের কোটি কোটি মানুষ। দেশটির রাজনীতিতে আবারও মুখোমুখি হয়েছে দুই পরিচিত রাজনৈতিক শিবির।
নির্বাচনে, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রয়েছেন বামপন্থি প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং ডানপন্থি সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো, যিনি কারাবন্দি সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে।
দুই প্রার্থীই, ব্রাজিলের জন্য ভিন্ন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের কথা বলছেন। অ্যামেরিকাস কোয়ার্টারলির প্রধান সম্পাদক ব্রায়ান উইন্টার বলেন, মূলত, এটি ব্রাজিল ও লাতিন আমেরিকা ভবিষ্যতে কোন পথে এগোবে, তা নিয়ে দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির লড়াই।
বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলে অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোট দেওয়া বাধ্যতামূলক। ফলে, দেশটির নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও সাধারণত আমেরিকা মহাদেশের অন্য দেশগুলোর তুলনায় প্রচুর।
তবে এবারের নির্বাচন শুধু ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে দেশটির অবস্থানও বদলে যেতে পারে। প্রশ্ন হলো, ব্রাজিল কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রক্ষণশীল জোটের দিকে ঝুঁকবে, নাকি লুলার নেতৃত্বে বহুমেরুকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির পথেই থাকবে?
৮০ বছর বয়সী, লুলা, চতুর্থ এবং সম্ভবত, শেষবারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার লড়াইয়ে নেমেছেন। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত, দুই মেয়াদে, ব্রাজিল শাসন করার পর রাজনৈতিক জীবনে বড় ধরনের প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে ২০২৩ সালে আবারও প্রেসিডেন্ট হন তিনি। দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে লুলাকে ৫৮০ দিন কারাগারে থাকতে হয়েছিল।
তবে ২০২১ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট তার বিরুদ্ধে দেওয়া সাজা বাতিল করে এবং রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়। এরপর ২০২২ সালের নির্বাচনে, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোকে হারিয়ে আবার ক্ষমতায় ফেরেন লুলা।
এবার তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো। বাবার গড়ে তোলা রাজনৈতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
জইর বলসোনারো, বর্তমানে, স্বাস্থ্যগত কারণে মানবিক বিবেচনায় গৃহবন্দি। ২০২২ সালের নির্বাচনে পরাজয় উল্টে দিতে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করার দায়ে তাকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ফলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই তার।
লুলা ও ফ্লাভিও'র পেছনে রয়েছেন আরও চার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। তারা হলেন মধ্যপন্থি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও জনপ্রিয় লেখক অগুস্তো কুরি, ডানপন্থি সাবেক গোইয়াস গভর্নর রোনালদো কাইয়াদো, ডানপন্থি রাজনৈতিক সংগঠন ‘মুভিমেন্তো ব্রাজিল লিভরে’র প্রতিষ্ঠাতা রেনান সান্তোস এবং মিনাস জেরাইস রাজ্যের সাবেক গভর্নর রোমেউ জেমা।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটের আগে প্রকাশিত সর্বশেষ কয়েকটি জনমত জরিপে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তবে কোনো প্রার্থীই ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়ার অবস্থানে না থাকায় নির্বাচন গড়াতে পারে দ্বিতীয় দফায়। সেই ভোট অনুষ্ঠিত হবে ২৫ অক্টোবর।
সিএনটি-এমডিএ জরিপে প্রথম দফায় বৈধ ভোটের হিসাবে লুলা পেয়েছেন ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোর সমর্থন ৪২ দশমিক ১ শতাংশ। অগুস্তো কুরি ৩ দশমিক ৬, রোনালদো কাইয়াদো ৩ দশমিক ৪ এবং রেনান সান্তোস ১ দশমিক ৭ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। রোমেউ জেমার সমর্থন ০ দশমিক ৯ শতাংশ।
দ্বিতীয় দফার সম্ভাব্য লড়াইয়ে এই জরিপে লুলার সমর্থন ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ, আর ফ্লাভিও বলসোনারোর ৪৩ দশমিক ১ শতাংশ। ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত ২ হাজার ৭ জনের ওপর জরিপটি চালানো হয়। এতে ভুলের সম্ভাব্য সীমা ২ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট।
তবে, বিশ্ব রাজনীতিতে ব্রাজিলের অবস্থান নিয়েও লুলা ও ফ্লাভিওর মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
লুলা বহুপাক্ষিকতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীনের মতো অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছেন। ২০০৯ সাল থেকেই চীন ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর দেশটির সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক ব্যবধান আরও বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লুলার সম্পর্কেও সাম্প্রতিক সময়ে টানাপোড়েন বেড়েছে। ব্রাজিলের পণ্য আমদানিতে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এবং লাতিন আমেরিকায় সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় মার্কিন নীতিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ব্রাজিলের বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এর পেছনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে চলমান বিচারকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে দেখার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। পরে নভেম্বরে ,ওই শুল্কের কিছু অংশ প্রত্যাহার করা হয়।
তবে চলতি গ্রীষ্মে আবারও কিছু ব্রাজিলীয় পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র, যা এখনো বহাল রয়েছে।
লুলা এর বিরোধিতা করে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন। তবে সেপ্টেম্বরে সিএনএনের ক্রিস্টিয়ান আমানপুরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চলায় আপাতত পাল্টা পদক্ষেপ স্থগিত রাখবেন।
এই বিরোধ ব্রাজিলের জাতীয়তাবাদী ও ডানঘেঁষা ভোটারদের মধ্যেও প্রভাব ফেলেছে। বিশ্লেষক ব্রায়ান উইন্টারের মতে, ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং ব্রাজিলের রাজনীতিতে মার্কিন হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা অনেক ক্ষেত্রে উল্টো লুলাকেই রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছে।
সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণেও লুলা বলেন, ‘ব্রাজিল কারও পেছনের উঠান নয়।’ দেশটির স্বার্থের বিরুদ্ধে বিদেশি শক্তির সঙ্গে কিছু ব্রাজিলীয় রাজনীতিকের অবস্থান নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। বক্তব্যটি ফ্লাভিও বলসোনারোকে লক্ষ্য করেই দেওয়া হয়েছে বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়।
ফ্লাভিও'র পাশে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু-মিলেই
ফ্লাভিও বলসোনারো নিয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ। তিনি ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং লুলার সঙ্গে মতবিরোধ থাকা অন্যান্য নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
গত জুলাইয়ে, নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর সময় নেতানিয়াহু ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ফ্লাভিওকে সমর্থন জানান। এর আগে, মে মাসে, ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে ওভাল অফিসে বৈঠক করেন ফ্লাভিও। বৈঠকে সংঘবদ্ধ অপরাধ, শুল্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ে আলোচনা হয়। পরদিন তিনি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও'র সঙ্গেও বৈঠক করেন।

আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই, যিনি বলসোনারো পরিবারের দীর্ঘদিনের মিত্র, জুলাইয়ে, ব্রাজিলে গিয়ে ফ্লাভিও'র প্রচারণায় সমর্থন জানান। এ সময় লুলাকে ‘দণ্ডিত অপরাধী’ এবং তার সরকারকে ‘চোর’ বলে মন্তব্য করেন মিলে। এর জেরে ব্রাজিল বুয়েনস আইরেস থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে।
লাতিন আমেরিকাজুড়ে সাম্প্রতিক নির্বাচনে ডানপন্থিদের উত্থানের মধ্যেই এই নির্বাচন হচ্ছে। ফলে ফ্লাভিও জয়ী হলে এই অঞ্চলে ডানপন্থি রাজনীতির আরও বিস্তার ঘটতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে ব্রাজিলের ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে অপরাধ ও নিজেদের নিরাপত্তা।
লুলার তুলনায় ফ্লাভিও এ বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বড় অপরাধী চক্রগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা, নতুন ফেডারেল কারাগার নির্মাণ এবং অপরাধের জন্য দায়বদ্ধতার ন্যূনতম বয়স ১৬ বছরে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
তার বাবা জইর বলসোনারোর রাজনৈতিক ব্র্যান্ডও মূলত কঠোর আইনশৃঙ্খলা নীতির ওপর দাঁড়িয়েছিল।
গত মে মাসে, ওয়াশিংটন সফরের সময় ফ্লাভিও ব্রাজিলের দুটি শক্তিশালী অপরাধী সংগঠনকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। কয়েক দিন পর যুক্তরাষ্ট্র ওই সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
লুলার সরকার অবশ্য এর বিরোধিতা করে বলেছে, ব্রাজিলের অপরাধী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদবিরোধী কাঠামো প্রয়োগ অনেকটা বিদেশি হস্তক্ষেপের অজুহাত হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতি ভালো, কিন্তু স্বস্তিতে নেই মানুষ
নির্বাচনের আরেকটি বড় ইস্যু জীবনযাত্রার ব্যয়। বেকারত্ব কম এবং মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে আসছে, এমন সরকারি পরিসংখ্যান থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক স্বস্তি তেমন দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, অনেক ব্রাজিলীয় মনে করছেন তাদের আয় দিয়ে আগের মতো জীবনযাত্রা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
লুলার প্রথম দুই মেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য কমার কারণে ব্যাপক সামাজিক অগ্রগতি হয়েছিল। কিন্তু এবার সেই ধরনের পরিবর্তন সাধারণ মানুষের কাছে ততটা দৃশ্যমান নয়।
অন্যদিকে ফ্লাভিওর চ্যালেঞ্জ হলো, বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রেখেও নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করা।
বিশ্লেষকদের মতে, তিনি বলসোনারো পরিবারের তুলনামূলক মধ্যপন্থি সদস্য। এতে মধ্যপন্থি ভোটারদের আকৃষ্ট করার সুযোগ যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি বাবার মতো উচ্ছ্বাসও তিনি তৈরি করতে পারছেন না।
নারী ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর ভোটও গুরুত্বপূর্ণ
নারী ভোটারদের সমর্থনও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলসহ পুরো আমেরিকা মহাদেশেই নতুন ডানপন্থি রাজনীতির জন্য নারী ভোটারদের কাছে পৌঁছানো একটি চ্যালেঞ্জ।
ফ্লাভিও'র স্ত্রী ফার্নান্দা বলসোনারোকে প্রচারণায় আরও দৃশ্যমান করা হয়েছে নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে। তবে তার সৎ মা মিশেল বলসোনারোর সঙ্গে রাজনৈতিক ও পারিবারিক বিরোধ সেই প্রচেষ্টাকে জটিল করেছে। মিশেল একজন প্রভাবশালী ইভানজেলিক্যাল নেতা (ধর্মীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব) এবং অতীতে রক্ষণশীল নারী ভোটারদের কাছে বলসোনারো পরিবারের জনপ্রিয়তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ধর্মীয় বিভাজনও ব্রাজিলের নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখছে। দেশটির ক্যাথলিক-ইভানজেলিক্যাল ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি।
সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ইভানজেলিক্যাল ভোটারদের মধ্যে ফ্লাভিও ৪৭ শতাংশ এবং লুলা ২৭ শতাংশ সমর্থন পাচ্ছেন। অন্যদিকে, ক্যাথলিক ভোটারদের মধ্যে লুলার সমর্থন ৪৫ শতাংশ, ফ্লাভিও'র ৩৩ শতাংশ।
জরিপ সংস্থা কুয়েস্টের প্রধান নির্বাহী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফেলিপে নুনেসের মতে, মেরুকরণ এখনো নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণ করছে, কিন্তু আগের তুলনায় কম তীব্রভাবে ভোটারদের সক্রিয় করছে।
বিশ্লেষক ব্রায়ান উইন্টার এই পরিস্থিতিকে ‘উদাসীন মেরুকরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, রাজনৈতিকভাবে ব্রাজিলীয়রা এখনো নিজেদের পছন্দের দলের ‘জার্সি’ পরে আছেন, কিন্তু আগের মতো উৎসাহ নিয়ে মাঠে নেই।
এর সঙ্গে ২০১৮ ও ২০২২ সালের নির্বাচনের বড় পার্থক্য রয়েছে। ২০১৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দা, অপরাধ এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেট্রোব্রাসকে ঘিরে বড় দুর্নীতি তদন্তের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় আসেন জইর বলসোনারো।
এছাড়া ২০২২ সালে, 'কোভিড-১৯' মহামারি মোকাবিলা নিয়ে সমালোচনা এবং গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে লুলার কাছে অল্প ব্যবধানে হেরে যান বলসোনারো।
দুর্নীতিতে ক্লান্ত ভোটার
এবারের নির্বাচনে ভোটারদের রাজনৈতিক ক্লান্তির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতির ইস্যুটি কোনো একটি শিবির এককভাবে নিজেদের পক্ষে নিতে পারছে না।
ব্রাজিলে কয়েক মাস ধরে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ব্যাংক মাস্টারের পতন এবং এর সাবেক প্রধান নির্বাহী ড্যানিয়েল ভোরকারোকে ঘিরে তদন্ত। দেশটির রাজনৈতিক, আর্থিক ও বিচারিক অঙ্গনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরায়েসও এই কেলেঙ্কারির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছেন। বলসোনারো সমর্থকদের কাছে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই লুলার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, কারণ সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টার মামলার তদন্তে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
ব্যাংক মাস্টারকে পতনের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করার সময় মোরায়েস ভোরকারোকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, এমন অভিযোগ নিয়ে আদালতে তদন্তের দাবি ওঠে।
একই সময়ে, মোরায়েসের স্ত্রীর পরিচালিত একটি আইন প্রতিষ্ঠান ব্যাংকটির সঙ্গে তিন বছরের ১৩ কোটি ১০ লাখ ব্রাজিলীয় রিয়াল বা প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের চুক্তিতে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
মোরায়েস কোনো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সেপ্টেম্বরে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করার সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়।
তবে তদন্তের সময় ভোরকারোর বিভিন্ন বার্তা প্রকাশ্যে আসার পর বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে ফ্লাভিও'র নির্বাচনী প্রচারণাতেও।
জইর বলসোনারোকে নিয়ে নির্মিত ‘ডার্ক হর্স’ চলচ্চিত্রে ভোরকারোর অর্থায়নকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি-অর্থপাচারের অভিযোগে ফ্লাভিও'র বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে। তিনি অবশ্য কোনো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই কেলেঙ্কারি কোনো একটি রাজনৈতিক পক্ষকে সরাসরি সুবিধা 'না' দিয়ে বরং পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাহীনতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ব্রাজিলের নির্বাহী পরিচালক ব্রুনো ব্রান্দাওয়ের মতে, রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে প্রতিটি পক্ষ শুধু প্রতিপক্ষের দুর্নীতি নিয়ে সরব হচ্ছে, নিজেদের শিবিরের অনিয়ম নিয়ে ঠিকই নীরব থাকছে।
এদিকে, ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংকটের কারণে প্রেসিডেন্টদের ক্ষমতাও কিছুটা দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে।
ফলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি, একই দিনে, অনুষ্ঠিত কংগ্রেস নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, পরবর্তী প্রেসিডেন্টকে শেষ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সরকার পরিচালনা করতে হবে, তা অনেকটাই নির্ধারিত হবে এই নির্বাচনের ফলেই।
/এআই