×
Logo

আন্তর্জাতিক

সিএনএনের প্রতিবেদন

গাজা শান্তি চুক্তিতে কাজ করা ট্রাম্পের জামাতা কুশনারের ইসরায়েলি সামরিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৯ পিএম

গাজা শান্তি চুক্তিতে কাজ করা ট্রাম্পের জামাতা কুশনারের ইসরায়েলি সামরিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ

গাজা যুদ্ধ ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার সময় ইসরায়েলের সামরিক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগ থাকা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠেছে। 

সিএনএনের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কুশনারের মালিকানাধীন বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, অ্যাফিনিটি পার্টনার্স, ইসরায়েলভিত্তিক একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় অংশীদার। ওই প্রতিষ্ঠানটি ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে।

মার্কিন এই প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান অনুযায়ী, কুশনারের অ্যাফিনিটি পার্টনার্স, তেল আবিবভিত্তিক ফিনিক্স ফাইন্যান্সিয়াল-এ নিজেদের অংশীদারত্ব গত বছর দ্বিগুণ করে। সময়টি ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউসে ফেরার কিছুদিন আগে। পরে কুশনার ফিনিক্সকে অ্যাফিনিটির ‘সেরা বিনিয়োগ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ইসরায়েলের আর্থিক স্বচ্ছতা-সংক্রান্ত আইন ব্যবহার করে ফিনিক্সের কিছু বিনিয়োগের তথ্য পর্যালোচনা করেছে সিএনএন। এসব নথিতে প্রতিষ্ঠানটির পুরো বিনিয়োগের চিত্র 'না' থাকলেও দেখা যায়, ইসরায়েলের বৃহত্তম অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমস-এ ফিনিক্স শত শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

এছাড়া ড্রোন-যুদ্ধজাহাজ-ধ্বংসযজ্ঞে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিসহ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম সরবরাহ করে, এমন অন্তত আরও ৮টি কোম্পানিতে ফিনিক্সের অংশীদারত্ব রয়েছে বলে সিএনএনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

তবে সিএনএনের শনাক্ত করা ওই নয়টি কোম্পানিতে অ্যাফিনিটি পার্টনার্সের সরাসরি কোনো অংশীদারত্ব নেই। কিন্তু ফিনিক্স এসব বিনিয়োগ থেকে মুনাফা করলে অ্যাফিনিটিও তার সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার হিসেবে সেই মুনাফার সুফল পেতে পারে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে কুশনারের কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়ে। ২০২৫ সালের বসন্ত থেকে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন কুশনার। তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ বিভিন্ন নেতার সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

গাজা পুনর্গঠন এবং অঞ্চলটিকে একটি বৈশ্বিক পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনাও তিনি প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন। গত বছরের অক্টোবরে, ইসরায়েল-হামাসের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, সেটির পেছনেও কুশনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই চুক্তির পরও গাজায় প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।

সিএনএন জানিয়েছে, তাদের অনুসন্ধানে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে কূটনীতিক হিসেবে কুশনারের কর্মকাণ্ড সরাসরি পর্যালোচনা করা বিনিয়োগগুলোর ওপর প্রভাব ফেলেছে। তবে ফিনিক্সে বিনিয়োগ থেকে তার প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য আর্থিক লাভ করেছে।

চলতি বছরের জুলাইয়ে, অ্যাফিনিটি ফিনিক্সে তাদের অংশীদারত্বের এক-চতুর্থাংশ বিক্রি করে ৩৪ কোটি ডলারের বেশি আয় করে। প্রাথমিক বিনিয়োগের তুলনায় এটি পাঁচ গুণেরও বেশি রিটার্ন বলে জানিয়েছে সিএনএন।

কুশনারের একক মালিকানাধীন, অ্যাফিনিটি, জুলাই পর্যন্ত, ফিনিক্সের সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার ছিল। তখন ফিনিক্সে তাদের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ অংশীদারত্বের মূল্য ছিল ১০০ কোটি ডলারের বেশি।

কুশনার নিজেও তার ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আলোচনায় ভূমিকা: দুই বিষয় নিয়েই প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তার যুক্তি, আর্থিক স্বার্থ ও ব্যবসায়িক সহযোগিতাই দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করতে পারে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে, ‘নো প্রাইরস’ পডকাস্টে কুশনার বলেন, আরব ও ইসরায়েলিদের যখন কোনো ব্যবসায়িক সুযোগ নিয়ে একসঙ্গে বসানো হয়, তখন তারা অন্যান্য বিষয় ভুলে গিয়ে নিজেদের মধ্যে অনেক মিল খুঁজে পান।

তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের তার বিনিয়োগকারীরা এখন ইসরায়েলের দিকে তাকিয়ে ভাবছেন, যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেলে সেখান থেকে হয়তো অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব।

তবে কুশনারের ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে যুদ্ধকবলিত মধ্যপ্রাচ্যে তার অনানুষ্ঠানিক কিন্তু প্রভাবশালী কূটনৈতিক ভূমিকার সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা। তাদের মতে, এতে তিনি মার্কিন করদাতাদের স্বার্থে কাজ করছেন, নাকি নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থে, সে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক সিটিজেনস ফর রেসপনসিবিলিটি অ্যান্ড এথিকস ইন ওয়াশিংটন-এর প্রধান নৈতিকতা বিষয়ক আইনজীবী সিনথিয়া ব্রাউন বলেন, যুদ্ধ বা সরকারি নীতির কারণে সবসময়ই কেউ না কেউ লাভবান হয়। তবে যারা ওই নীতি নির্ধারণে সিদ্ধান্ত নেন, তাদেরই সেই নীতি থেকে লাভবান হওয়া উচিত নয়। আর এই বিষয়টিই এখানে মূল পার্থক্য করে দেয়।

তবে কুশনারের আইনজীবী সিএনএনকে বলেছেন, ফিনিক্স কোথায় বিনিয়োগ করবে, সে বিষয়ে কুশনার কখনো অংশ নেননি বা কোনো নির্দেশনা দেননি। 

সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ৯টি কোম্পানির কোনোটি কেনা, ধরে রাখা বা বিক্রির সিদ্ধান্তেও তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। এমনকি তিনি কখনো ফিনিক্সের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যও ছিলেন না বলে জানিয়েছেন আইনজীবী।

তার ভাষ্য, কুশনারের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড ফিনিক্সের এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগে প্রভাব ফেলেছে, অথবা ফিনিক্সের বিনিয়োগ কুশনারের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করেছে, এমন কোনো ইঙ্গিত দেওয়া সঠিক নয়, অন্তত এই মুহূর্তে।

তবে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ফোর্বসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কুশনার জানিয়েছিলেন, ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপটির সঙ্গে তার ‘খুব সক্রিয় যোগাযোগ’ রয়েছে এবং প্রতি কয়েক সপ্তাহ পরপর তিনি প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন।

কুশনারের আইনজীবীও সিএনএনকে নিশ্চিত করেছেন, ওই সময় তার বক্তব্য সঠিক ছিল। নিয়মিত ফিনিক্সের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কোম্পানির পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য কৌশলগত সুযোগ নিয়ে কুশনারের আলোচনা হতো বলেও জানিয়েছেন তিনি।

আইনজীবীর দাবি, স্বেচ্ছাসেবী জনসেবা ও কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে কুশনারের সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার পর ফিনিক্সের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তার যোগাযোগ অনেক কমে গেছে।

সিএনএনের অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কোম্পানিতে ফিনিক্সের বিনিয়োগ কুশনারের প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার হওয়ার আগেই করা হয়েছিল। আবার কিছু বিনিয়োগ করা হয়েছে পরে।

পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এমন একটি কোম্পানি, যা গাজায় ব্যবহৃত গোলাবারুদের জন্য 'ইলেকট্রনিক ফিউজ' তৈরি করে। আরেকটি কোম্পানি ইসরায়েলি ট্যাংকের 'গেয়ার-বক্স' উৎপাদন করে।

ফিনিক্সের প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে বিনিয়োগের শ্রেণিবিন্যাসে অসঙ্গতি দেখা গেছে বলে জানিয়েছে সিএনএন। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছে জানতে চাওয়া হলেও তারা বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেনি।

তবে ইসরায়েলের দুই ফরেনসিক হিসাবরক্ষক পৃথকভাবে নথিগুলো পর্যালোচনা করে জানিয়েছেন, কিছু অসঙ্গতি থাকলেও সিএনএন যে নথিগুলো বিশ্লেষণ করেছে, সেগুলো ফিনিক্সেরই বিনিয়োগের তথ্য বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন।

এছাড়াও এসব নথিতে ফিনিক্সের পুরো বিনিয়োগ পোর্টফোলিও'র কোন নির্দিষ্ট তথ্য নেই। অবসরকালীন হিসাবের সম্পদ কিংবা মিউচুয়াল ফান্ড, করপোরেট বন্ড ও অন্যান্য সিকিউরিটিজের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোতে থাকা অংশীদারত্বও এতে অন্তর্ভুক্ত নয় বলে জানিয়েছেন ওই হিসাবরক্ষকেরা।

সিএনএনের অনুসন্ধান নিয়ে ফিনিক্স সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে প্রতিষ্ঠানটির একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ফিনিক্স একটি ‘নিয়ন্ত্রিত’ প্রতিষ্ঠান এবং শেয়ারহোল্ডারদের মূল্য মূলত বিনিয়োগ থেকে পাওয়া রিটার্নের পরিবর্তে কোম্পানির পরিচালনাগত কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের আইনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অ্যাফিনিটি পার্টনার্স কিংবা কুশনারের জন্য তাদের কোথায় বিনিয়োগ রয়েছে তা প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক নয়। গত মার্চে, কুশনার জানিয়েছিলেন, তার প্রতিষ্ঠান তখন পর্যন্ত ২৮টি বিনিয়োগ করেছে। তবে মোট বিনিয়োগের তুলনায় ফিনিক্সে অ্যাফিনিটির অংশীদারত্ব কতটা বড়, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

কুশনারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ও স্বেচ্ছাসেবী কূটনৈতিক ভূমিকার মধ্যে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ নাকচ করেছে হোয়াইট হাউস।

হোয়াইট হাউসের প্রধান উপ-প্রেস সচিব আনা কেলি বলেন, কুশনারের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের অনুরোধে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে পরিচালিত তার কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক নেই।

তিনি আরও বলেন, কুশনারের আগের কূটনৈতিক উদ্যোগগুলোর সাফল্যের রেকর্ড রয়েছে। এর মধ্যে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সম্পাদনে সহায়তার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি।

/এআই 

Logo