×
Logo

আন্তর্জাতিক

রয়টার্সের প্রতিবেদন

২শ' বছরের ইতিহাসে প্রথমবার টেনেসিতে কার্যকর হতে যাচ্ছে নারী বন্দির মৃত্যুদণ্ড

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪০ পিএম

২শ' বছরের ইতিহাসে প্রথমবার টেনেসিতে কার্যকর হতে যাচ্ছে নারী বন্দির মৃত্যুদণ্ড

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো কোনো নারী বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে যাচ্ছে। ৩০ বছর আগে, সহপাঠীকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্রিস্টা পাইকের বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা রয়েছে।

৫০ বছর বয়সী, পাইকের মৃত্যুদণ্ড টেনেসির রাজধানী ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশনে কার্যকর করার কথা। গতকাল মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টও শেষ মুহূর্তে মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে।

পাইকের ক্ষমা প্রার্থনার আবেদনও এর আগে প্রত্যাখ্যান করেন টেনেসির গভর্নর বিল লি। ওই আবেদনে তার আইনজীবীরা শৈশবের নির্যাতন, অবহেলা ও যৌন নিপীড়নের ইতিহাস তুলে ধরে মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার আবেদন জানিয়েছিলেন।

১৮ বছর বয়সে সহপাঠীকে হত্যা

১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে, পাইকের বয়স ছিল ১৮ বছর। তার ১৭ বছর বয়সী প্রেমিক এবং আরেক সহযোগীকে নিয়ে তারা ১৯ বছর বয়সী সহপাঠী কোলিন স্লেমারকে একটি নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যান। পরে সেখানে তাকে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়।

তিনজনই নক্সভিলের একটি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সহপাঠী ছিলেন। আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, পাইক তার প্রেমিক ট্যাডারিল শিপের সঙ্গে স্লেমারের সম্পর্ক নিয়ে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতেন।

হত্যাকাণ্ডটি সে সময় ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। তদন্ত ও বিচারকাজে উঠে আসে, হত্যার পর ভুক্তভোগীর বুকে পেন্টাগ্রামের আকৃতি খোদাই করা হয়েছিল এবং তার মাথার খুলির একটি অংশ স্মারক হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

পাইক ও শিপ হত্যার কথা স্বীকার করেন। ১৯৯৬ সালে, দু'জনকেই ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও শিপকে প্যারোলের সুযোগসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

অন্য সহযোগী শ্যাডোলা পিটারসন হত্যার সময় ১৮ বছর বয়সী ছিলেন। তিনি অন্য দু'জনের জন্য পাহারায় ছিলেন এবং পরে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে আদালতে সাক্ষ্য দেন। তাকে প্রবেশনে মুক্তি দেওয়া হয়।

শৈশবের নির্যাতনের ইতিহাস তুলে ধরে ক্ষমার আবেদন

টেনেসির মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের তালিকায় বর্তমানে একমাত্র নারী পাইক। ২০০১ সালে, কারাগারের আরেক বন্দীকে হত্যার চেষ্টা করার দায়েও তিনি দোষী সাব্যস্ত হন।

পাইককে মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দিতে তার আইনজীবীরা গভর্নরের কাছে ২২৬ পৃষ্ঠার আবেদন জমা দেন। এতে বলা হয়, শৈশবে তিনি সহিংসতা, অবহেলা ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ১১ ও ১৭ বছর বয়সে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

কারাগারে তার বাইপোলার ডিসঅর্ডার ও পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) শনাক্ত হয়েছিল বলেও আইনজীবীরা জানান। তারা আরও দাবি করেন, গর্ভাবস্থায় পাইকের মা অতিরিক্ত মদ্যপান করতেন, যা তার মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল এবং অল্প বয়সে আবেগ নিয়ন্ত্রণে তার সমস্যা তৈরি করেছিল।

গভর্নর লি ক্ষমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করার পর আইনজীবীরা বলেন, ১৮ বছর বয়সের সেই তরুণী এখন আর নেই। তাদের ভাষ্য, পাইক বর্তমানে ৫০ বছর বয়সী একজন অনুতপ্ত নারী, যিনি নিজের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে উপলব্ধি করেন, মানসিক চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং কারাগারে অন্য নারী বন্দীদের সহযোগিতা করছেন।

তবে নিহত কোলিন স্লেমারের মা মে মার্টিনেজ পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে নারী বন্দীর মৃত্যুদণ্ড বিরল

যুক্তরাষ্ট্রে নারী বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালে, সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড পুনরায় চালুর অনুমতি দেওয়ার পর দেশটিতে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৬শ' ৮৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাদের মধ্যে নারী মাত্র ১৮ জন।

টেনেসিতে পাইকের আগে ১৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ফলে বুধবারের নির্ধারিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পর অঙ্গরাজ্যটিতে কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে।

পাইকের মামলাটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জাতিসংঘের একদল মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ সম্প্রতি তার মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

এছাড়া যৌন সহিংসতা ও ট্রমা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরাও পাইকের পক্ষে কথা বলেছেন। তাদের দাবি, প্রাণঘাতী ইনজেকশনের প্রক্রিয়া শৈশবের যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের স্মৃতি উসকে দিয়ে তার জন্য গুরুতর মানসিক যন্ত্রণা তৈরি করতে পারে।

এর আগে, চলতি বছরের মে মাসে, টেনেসির কারা কর্মকর্তারা এক পুরুষ বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা স্থগিত করতে বাধ্য হন। প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার জন্য উপযুক্ত শিরা খুঁজে না পাওয়ায় ওই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। 

/এআই 

Logo