রয়টার্সের প্রতিবেদন
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পরও ইরাকের তেল আয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৭ পিএম
ইরাক থেকে দুই দশকের বেশি সময়ের সামরিক উপস্থিতি অবশেষে গুটিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দেশটির শেষ সামরিক ঘাঁটিগুলো থেকেও মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কথা রয়েছে। ইরান ও তাদের মিত্ররা এই ঘটনাকে নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখছে। তবে সামরিক উপস্থিতি শেষ হলেও, ইরাকের অর্থনীতিতে, ওয়াশিংটনের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না।
২০০৩ সালে, ইরাকে, মার্কিন আগ্রাসনের পর থেকে দেশটির তেল বিক্রির আয় ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের মাধ্যমে ইরাকের তেল আয়ের ডলার ব্যবস্থাপনার এই কাঠামো ওয়াশিংটনকে বাগদাদের অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিয়েছে।
কীভাবে ইরাকের তেল আয়ে নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের?
ইরাকের তেল আয়ের ব্যবস্থাপনায় নিউইয়র্ক ফেডের ভূমিকার সূত্রপাত ২০০৩ সালের মার্কিন আগ্রাসনের পর। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন প্রভিশনাল অথরিটি (সিপিএ) ‘ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর ইরাক’ (ডিএফআই) প্রতিষ্ঠা করে।
নিউইয়র্ক ফেডে রাখা এই তহবিলের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ সংগ্রহ করে পুনর্গঠন-উন্নয়ন কাজে ব্যবহার করা। একইসঙ্গে, সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলা ও আর্থিক দাবির হাত থেকে ইরাকের তেল আয়কে সুরক্ষা দেওয়াও ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ. ডব্লিউ. বুশের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়। এরপর দায়িত্বে আসা প্রতিটি মার্কিন প্রেসিডেন্টই সেই আদেশ নবায়ন করেছেন। পরবর্তী সময়ে ডিএফআই নিউইয়র্ক ফেডে থাকা ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি হিসাবে রূপ নেয়। বর্তমানে ইরাকের তেল আয়ের অর্থ সেখানেই রাখা হয়।
ইরাকের ওপর এতে কতটা প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের?
ইরাকের রাষ্ট্রীয় আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস তেল। দেশটির সরকারি বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে তেল থেকে। ফলে তেল বিক্রির অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে দেশটির অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত।
২০২০ সালে, ইরাক সরকার যখন মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল, তখন ওয়াশিংটন নিউইয়র্ক ফেডে থাকা ইরাকের তহবিলে দেশটির প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল বলে রয়টার্সকে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাগদাদ সেই অবস্থান থেকে সরে আসে।
যদিও দখলদারত্বের শুরুর সময়ের তুলনায় ইরাক এখন নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তবুও নিউইয়র্ক ফেডের সঙ্গে তেল আয়ের এই সংযোগ এখনো দেশটির অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ধরে রেখেছে।
এত বছরেও ব্যবস্থা বদলায়নি কেন?
ইরাকের কর্মকর্তাদের মতে, এই ব্যবস্থা দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একইসঙ্গে, তেল আয়ের ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আস্থা বাড়ায় এবং বাণিজ্য-আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলারে ইরাকের প্রবেশাধিকার সহজ করে।
এছাড়া ঋণদাতাদের দাবি, মামলা ও অন্যান্য আর্থিক ঝুঁকি থেকে তেল আয়ের অর্থ সুরক্ষিত রাখতেও এই ব্যবস্থা সহায়ক। পাশাপাশি, এটি ইরাকি দিনারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে এবং দেশটির অর্থনীতির ওপর আস্থা ধরে রাখতে ভূমিকা রাখে।
ইরাকি সরকারের জন্য এর আরেকটি দিক হলো, ইরান-সমর্থিত কিছু গোষ্ঠীর ডলারে সহজ প্রবেশের দাবিও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। গত বছর, ইরানের হয়ে অর্থপাচারের অভিযোগে কয়েকটি ইরাকি ব্যাংক ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
তবে মার্কিন ডলারের সরবরাহে কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে ইরাকে একটি অনানুষ্ঠানিক বা সমান্তরাল ডলার বাজারও তৈরি হয়েছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত সরকারি বিনিময় হার এবং কালোবাজারের হারের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়।
আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে লেনদেনের ক্ষেত্রে, এই অতিরিক্ত দামের ব্যবধানকে, মূলত, ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।
ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের সংঘাতে ইরাকও বারবার চাপে পড়েছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর বাগদাদের ওপর সেই চাপ আরও বেড়েছে।
বর্তমানে কীভাবে ব্যবস্থাপনা হচ্ছে?
ইরাকের তেল বিক্রির আয় এখনো নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের হেফাজতেই রয়েছে। অতীতে, ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ডলার সরবরাহের জন্য নিয়মিত ডলার নিলাম বা ‘ফরেন কারেন্সি উইন্ডো’ ব্যবহার করতো।
এই ব্যবস্থায় বেসরকারি ব্যাংক ও মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানগুলো ইরাকি দিনারের বিনিময়ে মার্কিন ডলার কেনার জন্য প্রতিদিন দরপত্রে অংশ নিতে পারতো।
তবে ২০২৫ সালের শুরুতে, ইরাক আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিলাম ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। ইরানের মতো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পক্ষগুলোর কাছে ডলার পাচারের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের পর এই পরিবর্তন আনা হয়।
ফলে ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটলেও দেশটির অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত তেল আয়ের ডলার ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এখনো বহাল রয়েছে।
/এআই