×
Logo

আন্তর্জাতিক

ইতালিতে বোরকা নিষেধাজ্ঞা

প্রধানমন্ত্রী মেলোনির কাছে মুসলিমদের প্রশ্ন, এটি কি আসলেই সমস্যা?

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩২ পিএম

প্রধানমন্ত্রী মেলোনির কাছে মুসলিমদের প্রশ্ন, এটি কি আসলেই সমস্যা?

ইতালিতে বোরকা-নিকাব নিষিদ্ধের সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার, স্কুলে, পুরো মুখ ঢাকা পোশাক নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিলেও, দেশটির কিছু মুসলিম নাগরিক বলছেন, এটি বাস্তব কোনো সমস্যা নয়; বরং একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে তৈরি করা বিতর্ক।

মিলানের ব্যস্ত নাভিগলি এলাকার একটি শান্ত প্রাঙ্গণে অবস্থিত আল-ওয়াহিদ মসজিদে শুক্রবারের নামাজে অংশ নেওয়া মুসল্লিরাও সরকারের এই সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের ৫৮ বছর বয়সী গণিত শিক্ষিকা মুলায়কা লরা এনরিয়েলো বলেন, কিছু শিক্ষার্থী হিজাব পরলেও পুরো মুখ ঢাকা পোশাক পরা কোনো শিক্ষার্থীকে তিনি তার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে দেখেননি।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, 'যেসব মেয়ে স্কুলে হিজাব পরতে চায়, তারা তা পরে। তাদের কেউ বাধা দেয় না: শিক্ষকও নয়, শিক্ষার্থীরাও নয়।' 

গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) নিজ দল ন্যাশনালিস্ট কনজারভেটিভ ব্রাদার্স অব ইতালি (এফডিআই)-এর এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বোরকা-নিকাব নিষিদ্ধের প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি এটিকে নারীর সমতার দিকে একটি পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করেন।

মেলোনি বলেন, 'স্কুলে যেতে হলে মুখ খোলা রাখতে হবে। আর ইতালিতে কোনো বাস্তব বা কথিত ঐতিহ্যের নামে কেউ কোনো তরুণীকে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে বাধ্য করতে পারে না।'

তবে ইতালির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনসার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ জন নারী শিক্ষার্থী পুরো মুখ ঢাকা পোশাক ব্যবহার করেন।

এনরিয়েলো বলেন, প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞাটি তার কাছে অমানবিক মনে হয়েছে।

তিনি বলেন, 'কোনো মেয়ে যদি বোরকা পরে স্কুলে আসে, আমি তাকে বাড়ি ফিরে যেতে বলতে পারি না। শিক্ষক হিসেবে, আমাকে তাকে এমন একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দেখতে হবে, যে হয়তো মনে করছে সে ভালো কিছু করছে।' 

মিলানের ওই মসজিদের ইমাম ইয়াহিয়া পাল্লাভিচিনি বলেন, এই নিষেধাজ্ঞা একটি 'মিথ্যা সমস্যা' তৈরি করছে। 

তার মতে, খুব অল্পসংখ্যক মানুষ ব্যবহার করেন, এমন একটি পোশাককে কেন্দ্র করে জনমত তৈরি করা হচ্ছে, যা ইসলাম সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে বিকৃত করছে।

তিনি বলেন, 'এটি এমন একটি সমাজের মডেল উপস্থাপনের চেষ্টা, যেখানে ভিন্ন কিছু হলেই সেটিকে বোরকার মতো একটি বিষয় ব্যবহার করে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়।'

পাল্লাভিচিনি, যিনি ইতালিয়ান ইসলামিক রিলিজিয়াস কমিউনিটির ভাইস প্রেসিডেন্টও, বলেন, এই উদ্যোগ একটি ছোট মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের জন্য 'বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার' উদাহরণ।

শুধু মেলোনির দল নয়, ইউরোপের আরও কিছু ডানপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠী মুসলিম নারীদের কিছু পোশাককে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে তুলে ধরে আসছে।

পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক রেনাতা পেপিচেল্লি বলেন, এই প্রদর্শন ১৯৫৮ সালে আলজেরিয়ায় ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের সময়কার ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। সে সময় কিছু আলজেরীয় নারী ফ্রান্সের প্রতি সমর্থন দেখাতে প্রকাশ্যে পর্দা খুলে ফেলেছিলেন; অনেক ক্ষেত্রে তা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে করা হয়েছিল।

তার মতে, নারীর পর্দা এখনও একটি 'রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র' হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং এটি সরিয়ে ফেলা সামাজিক কর্তৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

পেপিচেল্লি বলেন, 'মেলোনির আনা নিষেধাজ্ঞাকে এই রাজনৈতিক পরিবেশের অংশ হিসেবেই দেখতে হবে।'

তবে সরকারি আদেশে সরাসরি বোরকা বা নিকাব শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। এতে বলা হয়েছে, স্কুলে এমন কোনো পোশাক পরে অংশ নেওয়া যাবে না, যাতে পুরো মুখ ঢাকা থাকে এবং পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হয়।

বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের গবেষক নিকো তন্তি বলেন, নির্দেশনাটি কার্যকর হলেও, সংসদ এর প্রয়োজনীয়তা, উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারের সঙ্গে এর সম্পর্ক পর্যালোচনা করতে পারে।

তিনি জানান, ইতালির আইনে আগে থেকেই এমন পোশাক পরার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে, যা ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন করে তোলে। তবে 'যৌক্তিক কারণ' থাকলে তা ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তন্তি বলেন, 'ধর্মীয় স্বাধীনতা ও জনশৃঙ্খলার মধ্যকার বিতর্কে এই বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সময়ের সঙ্গে আদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে ধর্মীয় অনুশীলনকে অনেক ক্ষেত্রে বৈধ কারণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।'

বিশ্লেষকদের মতে, বোরকা নিষেধাজ্ঞার সময়কাল রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে।

২০২৭ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হওয়ার মধ্যে মেলোনি ডানপন্থি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে রয়েছেন। সাবেক জেনারেল রবার্তো ভানাচ্চির ন্যাশনাল ফিউচার পার্টি ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠার পর জনমত জরিপে প্রায় ৮ শতাংশ সমর্থন পেয়েছে।

লুইস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ইতিহাসের অধ্যাপক লোরেঞ্জো ক্যাস্তেলানি বলেন, মেলোনি এই উদ্যোগের মাধ্যমে আরও কঠোর জাতীয়তাবাদী অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।

/এআই 

Logo