এখনো পরমাণু অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেনি সৌদি: ইউএস ইন্টেলিজেন্স
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১৬ পিএম
সৌদি আরব এখনো পরমাণু অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেনি বলে সতর্ক করেছে ইউএস ইন্টেলিজেন্স। মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেওয়া গোপন নথিতে এমন মূল্যায়ন উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। এ নিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন-সৌদি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রস্তাব পর্যালোচনার অংশ হিসেবে কংগ্রেসে এসব গোপন নথি জমা দেওয়া হয়। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, সৌদি আরব ভবিষ্যতে পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি গড়ে তোলার পথ পুরোপুরি বন্ধ করেছে, এমন নিশ্চয়তা গোয়েন্দা মূল্যায়নে পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় মার্কিন কোম্পানিগুলো সৌদি আরবে কয়েক হাজার কোটি ডলারের পারমাণবিক জ্বালানি প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পেতে পারে। চুক্তিটি নিয়ে উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো, এর আওতায় সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা ৫ শতাংশের নিচে রাখার কথা রয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত পর্যালোচনা ও লিখিত সমঝোতার মাধ্যমে তা ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।
তবে ২০ শতাংশ মাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে এখনো অস্ত্র তৈরির উপযোগী মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। অস্ত্র তৈরির জন্য সাধারণত এর চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হয়।
মার্কিন আইনপ্রণেতাদের আপত্তি
চুক্তিটি বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসের ৯০ দিনের পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আইনপ্রণেতারা চুক্তিটি ঠেকাতে উদ্যোগ নিতে পারবেন।
ম্যাসাচুসেটসের সিনেটর এড মার্কি ও ওরেগনের সিনেটর জেফ মার্কলির নেতৃত্বে একদল ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে চিঠি দিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, প্রস্তাবিত চুক্তি সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা দিতে পারে, যা ভবিষ্যতে পরমাণু অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি করবে।
সিনেটরদের চিঠিতে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন আগের নীতির তুলনায় অপেক্ষাকৃত শিথিল বিধিনিষেধ গ্রহণ করছে এবং সৌদি আরবের দাবির কাছে ছাড় দিচ্ছে।
মার্কলি দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, সৌদি আরবের পরমাণু কর্মসূচির উদ্দেশ্য নিয়ে শুধু দেশটির সরকারের আশ্বাসের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভর করা উচিত নয়। বেসামরিক উদ্দেশ্যেই যদি এই কর্মসূচি পরিচালিত হয়, তাহলে সৌদি আরব কেন নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা চায়, সেটিও প্রশ্নের বিষয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে সৌদি সরকার দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেয়নি। তবে পত্রিকাটিকে দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী আবদুল আজিজ বিন সালমানের আগের একটি বক্তব্যের দিকে নির্দেশ করা হয়েছে।
ওই বক্তব্যে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী বলেছিলেন, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি হবে ‘শান্তিপূর্ণ’ এবং সর্বোচ্চ মাত্রার দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে এটি পরিচালিত হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরও চুক্তিটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দফতরটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের কোনো পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচিকে সমর্থন করে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না।
ওয়াশিংটনের দাবি, প্রস্তাবিত চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবে সম্ভব এমন কঠোরতম পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধী মানদণ্ড বজায় রাখা হবে।
পরমাণু স্থাপনায় নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন
চুক্তির আরেকটি বিষয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ‘অ্যাডিশনাল প্রটোকল’ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা চুক্তিতে রাখা হয়নি।
এই প্রটোকল কার্যকর হলে আইএইএ কোনো দেশের পারমাণবিক স্থাপনা ও গবেষণাকেন্দ্রে তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত পরিদর্শন ও নজরদারির সুযোগ পায়।
সাবেক আইএইএ মহাপরিচালক হান্স ব্লিক্সসহ ২০ জন পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ বিশেষজ্ঞ চলতি সপ্তাহে মার্কিন কংগ্রেসে পাঠানো এক চিঠিতে সতর্ক করেছেন, প্রস্তাবিত পরিদর্শন ব্যবস্থা সৌদি আরব গোপনে কোনো অঘোষিত স্থাপনায় পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে কি না, তা শনাক্ত করা কঠিন করে তুলতে পারে।
ইরানকে ঘিরেও বাড়ছে উদ্বেগ
সৌদি আরবের পরমাণু আকাঙ্ক্ষা নিয়ে উদ্বেগের পেছনে ইরানও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০১৮ সালে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছিলেন, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করলে সৌদি আরবও একই পথে যাবে।
এদিকে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো হলেও সেসব স্থাপনার ধ্বংসস্তূপের নিচে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত টিকে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর ফলে সৌদি আরবের সম্ভাব্য পরমাণু সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের উদ্বেগ আরও বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, সৌদি আরব পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের পথে এগোলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, প্রস্তাবিত পারমাণবিক চুক্তির লক্ষ্য শুধু জ্বালানি খাতে সহযোগিতা নয়; এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার করা এবং রিয়াদকে রাশিয়া-চীনের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা বাড়ানো থেকে দূরে রাখাও উদ্দেশ্য।
চুক্তিটির সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টিও জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্প বলেছেন, সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ পারমাণবিক চুক্তির একটি শর্ত। তবে ইসরায়েলি সরকার ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে আসায় সৌদি আরব এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে সম্মত হয়নি।
/এআই