×
Logo

আন্তর্জাতিক

নিউ ইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদন

ড্রোন ঠেকাতে হরমুজে লেজার অস্ত্র মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের, ম্যানেজে ব্যবহার হচ্ছে এক্সবক্স কন্ট্রোলার

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৭ পিএম

ড্রোন ঠেকাতে হরমুজে লেজার অস্ত্র মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের, ম্যানেজে ব্যবহার হচ্ছে এক্সবক্স কন্ট্রোলার

রাতের আকাশ আলোকিত করে শত্রুর ড্রোন ধ্বংস করছে লেজার। ছবি: ইউএস নেভি।

ইরানের ড্রোন থ্রেট মোকাবিলায় অত্যাধুনিক লেজার অস্ত্র ব্যবহার করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এসব লেজার অস্ত্র তৈরিতে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প হাতে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। 

বিশেষজ্ঞদের দাবি, প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অনেক কম খরচে ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম এই প্রযুক্তি।

সম্প্রতি ইরানের নাগরিকেরা আকাশে বেশ কিছু চোখধাঁধানো লেজার আলোর দৃশ্য দেখেছেন। তবে সেগুলো কোনো কনসার্টের আলোকসজ্জা নয়। 

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোন ধ্বংস করছে বলে জানিয়েছে সেন্টকম।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর লেজার অস্ত্র তৈরির প্রকল্পটি প্রায় পাঁচ দশক ধরে চলছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের দাবি, সক্ষমতার দিক থেকে এই প্রযুক্তি বিশ্বের অন্য যেকোনো সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত ব্যবস্থার তুলনায় অনেক এগিয়ে।

USS Portland (LPD 27) testing a laser weapon system in the Pacific Ocean.
মধ্যপ্রাচ্যে ইঙ্কামিং ড্রোনকে ব্লাইন্ড করে দেওয়ার জন্য ‘ড্যাজলার’ নামে পরিচিত লেজার অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। ছবি: ইউএস নেভি।

সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করা ডিরেক্টেড এনার্জি কনসালট্যান্টসের প্রেসিডেন্ট মার্ক নাইস দ্য পোস্টকে বলেন, ‘আমরা খুব নির্দিষ্টভাবে ড্রোন শনাক্ত ও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারি। এরপর লেজারের আলো ঠিক সেই জায়গায় ফেলা যায়, যেখানে প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ড্রোনের সেন্সর অকার্যকর করা অথবা পুরো ড্রোনটিকেই ধ্বংস করা সম্ভব।’

কীভাবে কাজ করে লেজার অস্ত্র?

লেজার প্রযুক্তিতে জেনারেটর কিংবা ব্যাটারি থেকে শক্তি নিয়ে সেটিকে আলোককণায় বা ফোটনে রূপান্তর করা হয়। এরপর এসব ফোটনকে একটি শক্তিশালী একক রশ্মিতে কেন্দ্রীভূত করা হয়। খালি চোখে এই রশ্মি সাধারণত দেখা যায় না; এটি মূলত ইনফ্রারেড আলোর মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়।

লক্ষ্যবস্তুর ওপর এই লেজার রশ্মি নির্দিষ্ট সময় ধরে স্থির রাখা হয়। এতে তাপমাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে বস্তুটি গলে যেতে পারে কিংবা বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস হতে পারে।

Collage of a laser weapon system firing, with inset images of the system's components.
মার্কিন নৌবাহিনীর একটি ভিডিওর স্থিরচিত্রে দেখা যাচ্ছে, ইউএসএস পোর্টল্যান্ডে স্থাপিত ‘লেজার ওয়েপন সিস্টেম ডেমোনস্ট্রেটর এমকে-২ মড-০’ থেকে সলিড-স্টেট লেজার নিক্ষেপ করা হচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যবহৃত ‘অপটিক্যাল ড্যাজলার’ ধেয়ে আসা হুমকিকে অকার্যকর ও দুর্বল করতে সক্ষম। ছবি: ইউএস নেভি। 

‘এটি মূলত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত আলো। লক্ষ্যবস্তুকে ধ্বংস করতে কয়েক সেকেন্ড ধরে লেজার রশ্মি নির্দিষ্ট জায়গায় ধরে রাখতে হয়,’ বলেন লেজার যুদ্ধবিষয়ক নিউজলেটার ‘লেজার ওয়ার্স’-এর লেখক জ্যারেড কেলার।

তার ভাষ্য, ‘এখন পরীক্ষাগারের বাইরে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সময় এসেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির একটি হলো সেনাবাহিনীর প্রায় ৫০ কোটি ডলারের চুক্তি। এর মাধ্যমে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত লেজার অস্ত্র তৈরি করা হবে, যা লক্ষ্যবস্তুর ওপর ফোটন কেন্দ্রীভূত করে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক প্রভাব তৈরি করতে পারবে।’

এক্সবক্সের কন্ট্রোলারেই চালানো হচ্ছে অস্ত্র

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এসব অত্যাধুনিক লেজার অস্ত্রের কিছু ব্যবস্থা পরিচালনা করছেন মার্কিন সেনারা পুনর্বিন্যাস করা এক্সবক্স গেম কনসোলের কন্ট্রোলার ব্যবহার করে।

কেলার বলেন, ‘ভিডিও গেম শিল্প অনেক গবেষণা করে সবচেয়ে কার্যকর কন্ট্রোলার তৈরি করেছে। তাই সামরিক বাহিনীও ভাবছে, কাজটি যখন একটি এক্সবক্স কন্ট্রোলার বা কাছাকাছি ধরনের কন্ট্রোলার দিয়েই করা যায়, তখন নতুন করে বিশেষায়িত কোনো কন্ট্রোল সিস্টেম তৈরির প্রয়োজন কী?’

তার দাবি, ‘আপনি যদি হ্যালো গেমে স্পার্টান লেজার ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে বাস্তব জীবনেও হয়তো এসব অত্যাধুনিক অস্ত্র চালাতে পারবেন।’

মেক্সিকোর মাদক চক্রও হয়ে উঠেছে প্রযুক্তি পরীক্ষার অংশ

লেজার প্রযুক্তির সাম্প্রতিক অগ্রগতির পেছনে কিছুটা ভূমিকা রয়েছে মেক্সিকোর মাদক চক্রগুলোরও। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে মাদক কারবারিদের পাঠানো ড্রোন ধ্বংস করতে প্রযুক্তিটি পরীক্ষা করছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স সাউদার্ন বর্ডার। এখন পর্যন্ত অন্তত ১১টি ড্রোন লেজার ব্যবহার করে ভূপাতিত করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

আমেরিকান ফরেন পলিসি কাউন্সিলের প্রতিরক্ষা বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো ব্রেন্ট জিয়ারনিক দ্য পোস্টকে বলেন, ‘মাদক চক্রের হুমকি দূর করতে বা তাদের কার্যক্রমে সামান্য হলেও বাধা দিতে আমরা যা কিছু করতে পারি, সেটিই ইতিবাচক। এগুলো বেশ কার্যকর বলেই মনে হচ্ছে। লেজার দিয়ে ড্রোন ভূপাতিত করা এখন আর কেবল কল্পনা নয়।’

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে ব্যবহৃত এই প্রযুক্তি এখন পর্যন্ত মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বদলে যেতে পারে যুদ্ধের ধরন

বিশেষজ্ঞদের মতে, লেজার অস্ত্র ভবিষ্যতে যুদ্ধের কৌশল ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

জিয়ারনিক বলেন, ‘সলিড-স্টেট লেজারে চলমান যন্ত্রাংশ খুবই কম। এর মধ্য দিয়ে পর্যাপ্ত শক্তি প্রবাহিত করা গেলে এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদের মজুত রাখার প্রয়োজনও নাও থাকতে পারে। এতে সামরিক সরবরাহ ও রসদ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।’

মার্ক নাইসের মতে, ‘আমরা যখন লেজারের শক্তি ও পাল্লা বাড়াব, তখন আরও উন্নত এবং প্রাণঘাতী হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতাও বাড়বে।’

তবে এখনই কাঁধে ঝোলানো লেজার অস্ত্র কিংবা বাজুকা নিয়ে সৈন্যদের যুদ্ধক্ষেত্রে নামার সম্ভাবনা নেই। মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা লেজার ব্যবস্থা আকারে বড় এবং বেশ ভারী। ফলে এগুলো যুদ্ধজাহাজে স্থাপন করতে হয়।

এই ব্যবস্থাগুলো দেখতে অনেকটা গতিসীমা শনাক্তকারী ক্যামেরার মতো। এগুলোকে বলা হয় হাই-এনার্জি লেজার উইথ ইন্টিগ্রেটেড অপটিক্যাল ড্যাজলার অ্যান্ড সার্ভেইল্যান্স। 

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ব্যবস্থায় ৬০ কিলোওয়াট ক্ষমতার উচ্চশক্তির লেজার ব্যবহার করা হয়, যা লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম।

এখন পর্যন্ত প্রকাশিত বেশিরভাগ ভিডিওতে ছোট আকারের ড্রোনের ওপর লেজার অস্ত্রের পরীক্ষা বা ব্যবহার দেখা গেছে। তবে বোয়িং সম্প্রতি কমপ্যাক্ট লেজার ওয়েপন সিস্টেম নামে একটি নতুন ব্যবস্থা উন্মোচন করেছে, যা ১ হাজার ৩শ' পাউন্ড বা প্রায় ৫৯০ কেজি পর্যন্ত ওজনের 'গ্রুপ-৩' ক্লাস ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়েছে।

লেজার অস্ত্রের প্রদর্শনীতে মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী

লেজার অস্ত্রের এই প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথও।

কেলার বলেন, ‘জুনে নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ডস মিসাইল রেঞ্জে লেজার অস্ত্রের একটি প্রদর্শনীতে অংশ নেন পিট হেগসেথ। তিনি একটি কন্ট্রোলার হাতে নিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটের প্রশিক্ষণের পর একটি ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হন বলে আমি মনে করি।’

তবে শক্তিশালী এই প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। লেজার অস্ত্র কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য পরিষ্কার আকাশ প্রয়োজন। পাশাপাশি একই সময়ে বিপুলসংখ্যক ড্রোনের সমন্বিত হামলা বা ‘ড্রোন সোয়ার্ম’ মোকাবিলাতেও এসব অস্ত্রের সক্ষমতা সীমিত।

এবার কি মহাকাশেও লেজার অস্ত্র?

লেজার অস্ত্রের পরবর্তী মোতায়েন পৃথিবীর বাইরে মহাকাশেও হতে পারে। মার্কিন স্পেস ফোর্স সম্প্রতি পৃথিবীর কক্ষপথে সক্রিয় অস্ত্র মোতায়েনের কথা নিশ্চিত করেছে। সেই ব্যবস্থায় লেজার প্রযুক্তি রয়েছে কি না, সে বিষয়ে শুরুতে মন্তব্য করতে চাননি মার্ক নাইস।

তবে ভবিষ্যতে মহাকাশে লেজার অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই।’

কেলার বলেন, পরীক্ষাগার থেকে লেজার প্রযুক্তিকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমানে যে গতি দেখা যাচ্ছে, তা রোনাল্ড রিগ্যানের ‘স্টার ওয়ার্স’ কর্মসূচির সময়ের পর আর দেখা যায়নি।

তার ভাষায়, ‘আমি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লেজার প্রেসিডেন্টও বলতে পারি।’

/এআই 

Logo