×
Logo

আন্তর্জাতিক

মক্কার পথে প্রাচীন হজযাত্রার নিদর্শন, ওয়াদি আল-উসাইলাহতে মিলেছে ৬০ শিলালিপি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫৪ পিএম

মক্কার পথে প্রাচীন হজযাত্রার নিদর্শন, ওয়াদি আল-উসাইলাহতে মিলেছে ৬০ শিলালিপি

সৌদি আরবের মক্কার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ওয়াদি আল-উসাইলাহ উপত্যকায় সন্ধান মিলেছে প্রাচীন ইসলামী যুগের হজযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনের। সেখানে পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা ৬০টিরও বেশি প্রাচীন ইসলামী শিলালিপি এবং দুটি ঐতিহাসিক কূপ পাওয়া গেছে। 

প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, এসব নিদর্শন প্রাচীন আরবি লিপির বিকাশ এবং মক্কার উদ্দেশে যাতায়াতকারী হজযাত্রীদের পথ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে।

সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) জানিয়েছে, প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ ও দুই কিলোমিটার প্রশস্ত এই উপত্যকাটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি যাত্রাপথ ছিল। ইরাক ও আশপাশের অঞ্চল থেকে মক্কার উদ্দেশে আসা পথিক ও হজযাত্রীদের কাফেলা এই পথ ব্যবহার করত।

পাহাড়ের পাথুরে দেয়ালে খোদাই করা শিলালিপিগুলো সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীর বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসলামী বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, এগুলো প্রথম ও দ্বিতীয় হিজরি শতকের সময়কার। 

এসব শিলালিপিতে ইসলামের প্রাথমিক যুগের বিভিন্ন ব্যক্তির উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি প্রাচীন আরবি লিপির গঠন, বিন্যাস ও নান্দনিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন ও বিকাশ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

দুর্গম ও শুষ্ক এই ভূখণ্ড পাড়ি দিতে যাত্রী ও হজযাত্রীদের জন্য পানির ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে বিভিন্ন সময়ে মুসলিম শাসকরা এই পথজুড়ে পানি সরবরাহের অবকাঠামো গড়ে তোলেন।

ওয়াদি আল-উসাইলাহতে থাকা চারটি ঐতিহাসিক কূপের মধ্যে দুটি এখনো টিকে আছে। কূপ দুটি শিলালিপি খোদাই করা পাহাড়ি এলাকার কাছেই অবস্থিত। এর কয়েকটি আব্বাসীয় খেলাফতের সময়কার বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শিলালিপি ও ঐতিহাসিক কূপগুলো সংরক্ষণে মক্কা নগরী ও পবিত্র স্থানগুলোর জন্য গঠিত রয়্যাল কমিশন একটি বিস্তৃত সংরক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করছে। ক্ষয় ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন যাতে নষ্ট না হয়, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০-এর আওতায় দেশটির প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং টেকসই সাংস্কৃতিক পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, ওয়াদি আল-উসাইলাহর সংরক্ষণ কার্যক্রমও তার অংশ বলে জানিয়েছে এসপিএ।

ওয়াদি আল-উসাইলাহর আবিষ্কার সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাচীন লেখা ও মানববসতির ইতিহাস নিয়ে চলমান প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

চলতি বছরের জুলাইয়ে, এসপিএ'র এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, কিং সালমান বিন আবদুল আজিজ রয়্যাল রিজার্ভে হাজার হাজার প্রাচীন শিলালিপি ও পাথরে খোদাই করা চিত্র রয়েছে। এর মধ্যে থামুদিক ও নাবাতীয় লিপির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাণী, শিকারের দৃশ্য এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চিত্রও রয়েছে। ওই সংরক্ষিত এলাকায় এখন পর্যন্ত ৪০০টিরও বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনা শনাক্ত করা হয়েছে। এর কিছু নিদর্শনের বয়স খ্রিস্টপূর্ব ৮ হাজার বছর পর্যন্ত বলে ধারণা করা হয়।

আরব উপদ্বীপে লেখার বিকাশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন রয়েছে সৌদি আরবের নাজরান অঞ্চলে। ২০২৪ সালের, সেপ্টেম্বরে এসপিএ জানায়, ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা হিমা কালচারাল এরিয়া মূলত একটি বিশাল উন্মুক্ত জাদুঘরের মতো। সেখানে প্রাচীন দক্ষিণ আরবীয়, থামুদিক ও ইসলামী লিপিতে লেখা অসংখ্য শিলালিপি ও পাথুরে চিত্র রয়েছে।

নাজরানে বিভিন্ন সময়ের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। এসবের মধ্যে গোত্রীয় চিহ্ন এবং থামুদিক, সাবাইয়ান, হিময়ারি ও প্রাচীন ইসলামী লিপিতে লেখা বিভিন্ন শিলালিপি রয়েছে। পাথরের গায়ে আঁকা চিত্রগুলোতে মানুষ, উট, ঘোড়া, বুনো ছাগল, শিকারের দৃশ্য এবং যুদ্ধের চিত্রও দেখা যায়। এসব নিদর্শন প্রাচীন মানুষের জীবনযাপন ও বস্তুগত সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা দেয়।

এছাড়া ২০২৪ সালে তাবুক অঞ্চলের আলকান গ্রামে একটি দ্বিভাষিক শিলালিপির সন্ধান পাওয়া যায়। এসপিএর তথ্য অনুযায়ী, খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর ওই শিলালিপিতে থামুদিক লিপিতে দুটি লাইন এবং প্রাচীন আরবি লিপিতে একটি লাইন রয়েছে।

হেরিটেজ কমিশনের মতে, তাবুকের এই আবিষ্কার থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে পঞ্চম শতাব্দীতেও প্রাচীন আরবি লিপির পাশাপাশি থামুদিক লিপির ব্যবহার অব্যাহত ছিল। একই সময়ে দুটি লিখনপদ্ধতির সহাবস্থান এবং পরবর্তী সময়ে আরবি অক্ষরের গঠন কীভাবে বিকশিত হয়েছে, সে সম্পর্কেও নতুন তথ্য দিয়েছে এই আবিষ্কার।

প্রত্নতাত্ত্বিক এসব আবিষ্কার থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, সৌদি আরবের পাহাড়, উপত্যকা ও মরুভূমিগুলো শুধু প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য নয়, এসব স্থান আরব উপদ্বীপের লিখিত ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার।

বিশেষকরে, ওয়াদি আল-উসাইলাহতে প্রাচীন ইসলামী শিলালিপির সঙ্গে টিকে থাকা পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উপস্থিতি ইসলামের শুরুর শতাব্দীগুলোতে মক্কার সঙ্গে হজযাত্রী ও অন্যান্য পথিকদের যোগাযোগব্যবস্থা কেমন ছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে। একই সঙ্গে এসব নিদর্শন সংরক্ষণ ভবিষ্যৎ প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও পর্যটনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

/এআই 

Logo