×
Logo

আন্তর্জাতিক

৭ অক্টোবরের হামলার আগে নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম

৭ অক্টোবরের হামলার আগে নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট

ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার প্রায় ১০ দিন আগে সংগঠনটি বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। তবে সেই সতর্কবার্তা ইসরায়েলের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের জানাননি নেতানিয়াহু এবং তা ঠেকাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপও নেননি বলে দাবি করা হয়েছে ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজ।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজের প্রতিবেদনে নতুন একটি বইয়ের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানানো হয়। ‘কিডন্যাপড: ৮৪৩ ডেইজ অব অ্যাব্যান্ডনমেন্ট’ নামের বইটি লিখেছেন সাংবাদিক শ্লোমি এলদার ও রুথ ইউভাল। বইটি তৈরিতে ইসরায়েল ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কয়েক ডজন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে, আমিরাতের প্রেসিডেন্ট ও নেতানিয়াহুর মধ্যে প্রায় ৪৫ মিনিটের একটি ফোনালাপ হয়। এতে মোহাম্মদ বিন জায়েদ, যিনি এমবিজেড নামে পরিচিত, হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে নেতানিয়াহুকে জানান।

এ ধরনের হামলা ব্যাপক রক্তপাত ঘটাতে পারে, পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এবং ইসরায়েল-আরব সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-কেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছিলেন তিনি।

নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়ায় বিস্মিত এমবিজেড

হারেৎজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়ায় বিস্মিত হয়েছিলেন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, গাজা পরিস্থিতির ওপর জেরুজালেমের নজর রয়েছে। হামাস কোনো পদক্ষেপ নিলে সেটি গাজার বদলে পশ্চিম তীরে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি এবং যেকোনো পরিস্থিতির জন্য ইসরায়েল প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।

তবে কয়েক দিন পরই ঘটে যায় ইতিহাসের অন্যতম বড় হামলা।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, হামাসের নেতৃত্বে সশস্ত্র সদস্যরা ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে সীমান্ত পেরিয়ে বহুমুখী হামলা চালায়। এতে প্রায় ১ হাজার ২শ' মানুষ নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। 

পাশাপাশি, ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। ওই হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাত পরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে।

সিনওয়ারের কাছ থেকেই সতর্কবার্তার সূত্র

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামাসের সম্ভাব্য হামলা সম্পর্কে এমবিজেডের কাছে তথ্যটি পৌঁছায় ইয়াহিয়া সিনওয়ারের কাছ থেকেই।

২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে বন্দিবিনিময় নিয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু অগ্রগতি না হওয়ায় সিনওয়ার ক্ষুব্ধ ছিলেন। আলোচনায় ইসরায়েলি জিম্মিদের বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তির বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

হারেৎজের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরাসরি যোগাযোগের বিষয়টি এড়াতে ফাতাহর একজন জ্যেষ্ঠ মধ্যস্থতাকারী, যাকে ‘কোল আইজ’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে, হামাসের পলিটব্যুরোর সদস্য গাজি হামাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। হামাদ হিব্রু ভাষায়ও পারদর্শী ছিলেন।

তবে বাস্তবে আলোচনাটি প্রায় সরাসরি ইসরায়েল-হামাস যোগাযোগের পর্যায়েই পৌঁছে গিয়েছিল। গাজায় সাবেক এক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তার বাড়িতে বৈঠক হতো। ইসরায়েলের শিন বেতের জিম্মি বিষয়ক দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা আদি রোটেম ফোনে এতে যুক্ত থাকতেন।

২০২৩ সালের গ্রীষ্ম নাগাদ একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সিনওয়ার প্রথমে ৫০০ বন্দির মুক্তি দাবি করলেও পরে ৫০ জনকে মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাবে রাজি হন। অন্যদিকে শিন বেত ৩০ জন বন্দির মুক্তিতে সম্মত হওয়ার দিকে এগোচ্ছিল। এর মধ্যে ২০ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন। এ প্রস্তাবে নেতানিয়াহুর অনুমোদনও ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর ‘ভূমিকম্পের’ হুমকি

তবে জিম্মি ও নিখোঁজদের বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক বারবার পিছিয়ে দেন নেতানিয়াহু, এমনটাই দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

ইসরায়েলি নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, হামাসের সঙ্গে চুক্তি করলে তার সরকারের কট্টরপন্থি সদস্যদের বিরোধিতার আশঙ্কা ছিল নেতানিয়াহুর। পাশাপাশি আলোচনার তথ্য সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও তিনি বলতেন।

একপর্যায়ে সেপ্টেম্বরের শুরুতে সিনওয়ার মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। একজন জ্যেষ্ঠ শিন বেত কর্মকর্তা তাকে তখন ‘রাডার থেকে পুরোপুরি অদৃশ্য’ হয়ে যাওয়া ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন।

তবে এর মধ্যেই সিনওয়ার ‘কোল আইজ’-এর সঙ্গে গোপনে দুই দফা বৈঠক করেন বলে বইটিতে দাবি করা হয়েছে। প্রথম বৈঠকে তিনি ইসরায়েলকে সতর্ক করতে বলেন, বন্দিবিনিময় চুক্তিতে অগ্রগতি না হলে বড় ধরনের চমক অপেক্ষা করছে।

সিনওয়ারের কথায়, তাদের একটি ‘জিলজাল’—অর্থাৎ ভূমিকম্পের মতো বড় কিছু—এর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

‘কোল আইজ’ বিষয়টি আমিরাতের প্রেসিডেন্টের একজন ফিলিস্তিনি উপদেষ্টাকে জানান। উপদেষ্টার কাছে ‘জিলজাল’ শব্দটির অর্থ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার এবং মধ্যস্থতাকারীর ব্যাখ্যায় এর অর্থ ছিল যুদ্ধ।

এরপর এমবিজি বিষয়টি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেন। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি আরেক বৈঠকে সিনওয়ার আরও বড় ও ভয়াবহ একটি অভিযানের প্রস্তুতির কথা জানান। এবারও তিনি ‘জিলজাল’ শব্দটি ব্যবহার করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

সরাসরি নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট

দ্বিতীয় দফার তথ্য পাওয়ার পর আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা তাকে জানান যে সিনওয়ার সম্ভবত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এরপর এমবিজেড সরাসরি নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।

প্রতিবেদনে ওই বৈঠকে উপস্থিত উপদেষ্টার বরাতে বলা হয়, এমবিজেড নেতানিয়াহুকে জানান—তার মূল্যায়ন অনুযায়ী সিনওয়ার বড় কোনো ঘটনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং ইসরায়েলের এ বিষয়ে প্রস্তুত থাকা উচিত।

একইসঙ্গে গাজায় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির উদ্যোগ নেওয়া এবং পশ্চিম তীরের উত্তেজনা কমানোর পরামর্শ দেন তিনি, যাতে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে না যায়।

শুধু নেতানিয়াহু নন, এমবিজেড তার উদ্বেগ সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম জে. বার্নসের সঙ্গেও শেয়ার করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তিনি নেতানিয়াহুকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, গাজায় ‘বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে’।

নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের না জানানোয় প্রশ্ন

হারেৎজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমবিজেডের সতর্কবার্তা নেতানিয়াহু শিন বেত প্রধান রোনেন বার কিংবা তৎকালীন সামরিক বাহিনীর প্রধান হার্জি হালেভিকে জানাননি।

এমনকি, ১ অক্টোবর, শিন বেতের সাবেক প্রধান রোনেন বার, হামাসের বিরুদ্ধে আগাম পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দেন। হামাসের শীর্ষ নেতাদের হত্যার মতো পদক্ষেপও সেই প্রস্তাবের অংশ ছিল। তবে নেতানিয়াহু তখন কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি শুধু প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করতে বলেন এবং পরে বিবেচনার কথা জানান।

শিন বেতের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হারেৎজকে বলেন, তারা যদি এমবিজেডের সতর্কবার্তা সম্পর্কে আগে জানতেন, তাহলে সিনওয়ারের কাছ থেকে আসা আগের বার্তাটিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হতে পারত।

তার মতে, এতে সিনওয়ার কেন হঠাৎ সেপ্টেম্বরের শুরুতে উত্তেজনা কমানোর আলোচনা থেকে সরে গেলেন, সেটিও হয়তো পরিষ্কার হতো। তখন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পরিস্থিতির ভিন্ন ব্যাখ্যায় পৌঁছাতে পারত এবং ইসরায়েলের সামগ্রিক গোয়েন্দা মূল্যায়নও বদলে যেতে পারত।

মিশরের কাছ থেকেও সতর্কবার্তার দাবি

৭ অক্টোবরের হামলার আগে ইসরায়েলকে সতর্ক করার দাবি অবশ্য এবারই প্রথম নয়।

হারেৎজ জানিয়েছে, হামলার মাত্র ১০ দিন আগে মিশরের গোয়েন্দা প্রধান আব্বাস কামেলও নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলে গাজা থেকে ‘অস্বাভাবিক কিছু’ কিংবা ‘ভয়াবহ কোনো অভিযান’ ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছিলেন, এমন খবর হামলার পর ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।

তবে নেতানিয়াহু ওই ফোনালাপের কথা অস্বীকার করেছিলেন।

নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের পাল্টা দাবি

হারেৎজের প্রতিবেদনের জবাবে নেতানিয়াহুর কার্যালয় পুরো ঘটনাটিকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দাবি, সংশ্লিষ্ট সময়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কোনো কথা হয়নি এবং এমবিজেডের কাছ থেকে তিনি কোনো সতর্কবার্তাও পাননি।

অন্যদিকে, সাবেক শিন বেত প্রধান রোনেন বার এবং তৎকালীন আইডিএফ প্রধান হার্জি হালেভিও জানিয়েছেন, এমবিজেডের কথিত সতর্কবার্তা সম্পর্কে তাদের জানানো হয়নি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে অবশ্য এ প্রতিবেদন নিয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনটি সত্য হলে ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ইসরায়েলি নেতৃত্বের কাছে একাধিক সম্ভাব্য সতর্কবার্তা পৌঁছেছিল, এমন প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসছে। একইসঙ্গে এসব তথ্যের কতটা গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছিল এবং কেন সেগুলো অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, তা নিয়েও বিতর্ক আরও জোরালো হতে পারে।

/এআই 

Logo