বোম্বার্ডিয়ারকে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
'যুক্তরাষ্ট্রে বিমান বেচতে হলে বানাতে হবে দেশেই, নাহলে বিক্রি বন্ধ'
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩১ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জেট বিক্রি অব্যাহত রাখতে হলে দেশটির মাটিতেই বিমান তৈরি করতে হবে কানাডার উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোম্বার্ডিয়ারকে। তা না হলে মার্কিন বাজারে প্রতিষ্ঠানটির বিমান বিক্রির সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বোম্বার্ডিয়ারের বিমান আর বিক্রি করতে দেওয়া হবে না। তার অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির পণ্যের মান যথেষ্ট ভালো নয়।
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ চাইলে, বোম্বার্ডিয়ারকে, সেখানেই উৎপাদন করতে হবে। একইসঙ্গে আমেরিকাকে ‘পিগি ব্যাংক’ বা অর্থের ভাণ্ডার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করার কথাও বলেন তিনি।
ওয়াশিংটন ও অটোয়ার মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার মধ্যেই ট্রাম্পের এই বক্তব্য এলো। তার দ্বিতীয় মেয়াদে বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের যে নীতি নেওয়া হয়েছে, বোম্বার্ডিয়ার নিয়ে নতুন হুমকিকে তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এরইমধ্যে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর নতুন করে পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা।
প্রশ্ন উঠছে কীভাবে কার্যকর হবে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত? মূলত, এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানায়নি হোয়াইট হাউস।
বিশেষকরে, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) অনুমোদিত বোম্বার্ডিয়ারের বিমানগুলোর সরবরাহ কীভাবে বন্ধ করা হবে, সেটিও স্পষ্ট নয়।
এছাড়া বোম্বার্ডিয়ারের বিমান যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তির (ইউএসএমসিএ) আওতাভুক্ত। এই চুক্তি বাস্তবায়নে ট্রাম্প নিজেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
মার্কিন অ্যারোস্পেস বিশ্লেষক রিচার্ড আবুলাফিয়া মনে করেন, ট্রাম্পের ঘোষণার কারণে বোম্বার্ডিয়ারের ব্যবসায়িক জেটের ক্রেতারা তাদের অর্ডার বাতিল করবেন, এমন সম্ভাবনা বাস্তবে অনেক কম।
তার মতে, এসব বিমান বিক্রি ঠেকানোর বাস্তব উপায়ও ট্রাম্পের হাতে কতটা রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
আবুলাফিয়া আরও জানান, বোম্বার্ডিয়ারের অধিকাংশ ব্যক্তিগত জেটে ব্যবহৃত ইঞ্জিনই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি। এসব ইঞ্জিন সরবরাহ করে হানিওয়েল অ্যারোস্পেস ও জিই অ্যারোস্পেস।
ট্রাম্পের হুমকির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে বোম্বার্ডিয়ারের উপস্থিতি বেশ বড়। মন্ট্রিয়লভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটির যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩ হাজার ৫শ' কর্মী রয়েছে। দেশটিতে তাদের প্রায় ২ হাজার ৮শ' সরবরাহকারীও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় বোম্বার্ডিয়ারের কারখানা ও সেবা কেন্দ্র রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দেশটিতে তাদের ষষ্ঠ সার্ভিস সেন্টার চালুর কাজও করছে। তাদের বহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেট 'গ্লোবাল ৮০০০'-এর ডানা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে তৈরি করা হয়।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে বোম্বার্ডিয়ার জানায়, প্রতি বছর, তারা মার্কিন সরবরাহকারীদের পেছনে ২.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের কর্মী, গ্রাহক এবং যেসব স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তারা কাজ করে, তাদের ওপর বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বোম্বার্ডিয়ারের একটি প্রতিরক্ষা বিভাগও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসে তাদের একটি কারখানা রয়েছে, যেখানে কানাডায় তৈরি বিমানকে বিশেষ সামরিক ও অন্যান্য মিশনের উপযোগী করে প্রস্তুত করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি শিল্পের মতো দেশটির উড়োজাহাজ ও মহাকাশ খাতও কানাডার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। ফলে কানাডায় তৈরি উড়োজাহাজের ওপর নতুন করে বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে এর প্রভাব মার্কিন শিল্পেও পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সংগঠন অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির অ্যারোস্পেস ও প্রতিরক্ষা খাতে ১০৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। ২০২৫ সালে এ খাতের রফতানি আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ এখন পর্যন্ত অ্যারোস্পেস খাতকে তুলনামূলকভাবে কমই প্রভাবিত করেছে। উড়োজাহাজ ও যন্ত্রাংশের স্বাভাবিক সরবরাহও বড় ধরনের শুল্কের আওতায় পড়েনি।
বোম্বার্ডিয়ারের গ্রাহকদের পরিচালিত ৫ হাজার ১০০টি উড়োজাহাজের প্রায় অর্ধেকই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে। ফলে মার্কিন বাজার প্রতিষ্ঠানটির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সহজেই বোঝা যায়।
বোম্বার্ডিয়ারকে নিয়ে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে, তিনি বোম্বার্ডিয়ারের গ্লোবাল এক্সপ্রেস ব্যবসায়িক জেটের সার্টিফিকেশন বাতিলের কথা জানিয়েছিলেন। একইসঙ্গে, কানাডায় তৈরি সব উড়োজাহাজের ওপর ৫০% আমদানি শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি।
তবে শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। পরের মাসে, কানাডা কয়েকটি গালফ স্ট্রিম উড়োজাহাজের সার্টিফিকেশন দেয়।
এদিকে, বোম্বার্ডিয়ারের ব্যবসায়ও সম্প্রতি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে, তাদের আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলত বিমান-পরবর্তী সেবা বা আফটারমার্কেট সার্ভিসের জোরালো চাহিদা এই প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার চলমান বাণিজ্য বিরোধের মধ্যে ট্রাম্পের সর্বশেষ হুমকি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং তা বোম্বার্ডিয়ারের যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ব্যবসায় কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
/এআই