টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদন
ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি, ভক্সওয়াগনের কারখানায় তৈরি হবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৫ পিএম
জার্মানির বিখ্যাত কার ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি ভক্সওয়াগনের একটি কারখানাকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তর করা হচ্ছে। ইউরোপজুড়ে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর তোড়জোড়ের মধ্যে জার্মানিও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে গাড়ি উৎপাদন বন্ধ হতে যাওয়া কারখানাটিকে সামরিক সরঞ্জাম তৈরির কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ভক্সওয়াগন জানিয়েছে, জার্মানির ওসনাব্রুক শহরের কারখানাটি বিক্রির বিষয়ে লোয়ার স্যাক্সনি রাজ্য সরকার এবং তেল আবিবভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান অরেলিয়াস ক্যাপিটালের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কারখানাটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা নেবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, অরেলিয়াস ও লোয়ার স্যাক্সনি কর্তৃপক্ষ ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের সঙ্গে কাজ করবে। ইসরায়েলের বহুল আলোচিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’-এর পেছনে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি এই রাফায়েল।
ভক্সওয়াগনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনার আওতায় জার্মানি ও ইউরোপের জন্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন সরঞ্জাম ও উপাদান তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও অংশীদারত্ব ও নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের পথও এই সহযোগিতার মাধ্যমে তৈরি হতে পারে।
ওসনাব্রুক কারখানায়, আগামী বছর, গাড়ি উৎপাদন বন্ধ হওয়ার কথা রয়েছে। ভক্সওয়াগনের কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী ওয়ার্কস কাউন্সিল জানিয়েছে, কারখানাটিতে মোট ১ হাজার ৮০০ কর্মীর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জনের চাকরি এই উদ্যোগের মাধ্যমে রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
কারখানাটিকে নতুন কাজে ব্যবহার করার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ভক্সওয়াগনের অন্য জার্মান কারখানাগুলোর জন্যও একটি উদাহরণ তৈরি করতে পারে।
ভক্সওয়াগন এরই মধ্যে সতর্ক করেছে, চাহিদার ঘাটতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে ২০৩০-এর দশকে জার্মানিতে তাদের চারটি কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
চুক্তির ঘোষণা দিয়ে ভক্সওয়াগনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অলিভার ব্লুম বলেন, এই সমঝোতার মাধ্যমে ওসনাব্রুক কারখানার জন্য নতুন একটি শিল্পভিত্তিক ভবিষ্যতের পথ উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ভক্সওয়াগনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পুনর্গঠন পরিকল্পনা ঘোষণার কয়েক দিন পরই এ উদ্যোগের কথা জানানো হলো।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ‘ফিউচার প্ল্যান ২০৩০’-এর আওতায় কোম্পানিটি তাদের গাড়ির মডেলের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৫০ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর আগে আরও ৫০ হাজার কর্মী কমানোর ঘোষণা দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।
চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, বাজারে চাহিদার দুর্বলতা এবং বাড়তে থাকা উৎপাদন ব্যয়ের কারণে ভক্সওয়াগন নিজেদের ব্যবসায়িক কাঠামো ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছে।
এই পরিস্থিতিতে গাড়ি উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত কারখানাগুলোকে অন্য শিল্পে কাজে লাগানোর বিষয়টি কোম্পানিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধসহ সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইউরোপজুড়ে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। জার্মানি এই প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিচ্ছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আগামী বছর, জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাড়িয়ে ১০ হাজার ৯শ' ৭০ কোটি ইউরো করার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি বছর, এই খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৮ হাজার ২৭০ কোটি ইউরো।
এই বিপুল সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির ফলে জার্মানির শিল্প খাতের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রাইনমেটালও গাড়ি উৎপাদনের কারখানাকে সামরিক সরঞ্জাম তৈরির কাজে ব্যবহার করছে।
বছরের পর বছর নুয়ে পড়া জার্মানির উৎপাদন খাতকে নতুন করে চাঙা করতে প্রতিরক্ষা শিল্পের এই সম্প্রসারণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ওসনাব্রুক কারখানায় গাড়ি উৎপাদন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ভক্সওয়াগন নেয় ২০২৪ সালে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের গ্রীষ্মে সেখানে গাড়ি উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার কথা।
কিন্তু নতুন চুক্তির ফলে কারখানাটির শিল্প কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার বদলে নতুন ধরনের উৎপাদনে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
লোয়ার স্যাক্সনির মুখ্যমন্ত্রী ওলাফ লিস বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে ওসনাব্রুকের জন্য একটি বাস্তব শিল্প সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, কারখানাটিতে অত্যন্ত দক্ষ কর্মী রয়েছে। একই সঙ্গে জার্মানি ও ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। ফলে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইউরোপকে আরও স্বনির্ভর হতে হবে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা
ওসনাব্রুক কারখানার নতুন পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইসরায়েলের রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের সঙ্গে সহযোগিতা।
রাফায়েল ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং দেশটির আয়রন ডোম আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
ভক্সওয়াগনের সঙ্গে চুক্তির আওতায় কারখানাটিতে ভবিষ্যতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সিস্টেম ও উপাদান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে জার্মানি ও ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্পে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে পুরো লেনদেন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের পাশাপাশি নতুন সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতার ওপর চুক্তিটির বাস্তবায়ন নির্ভর করছে বলে জানিয়েছে ভক্সওয়াগন।
/এআই