সিএনএনের প্রতিবেদন
ইরান যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক-গোয়েন্দা উপস্থিতি কমানোর কথা নীরবে ভাবছে ওয়াশিংটন
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৩ এএম
২০০৩ সালের ২৭ মার্চ, ইরাকের আন নাজাফ শহরের কাছে অভিযান পরিচালনা করছেন মার্কিন সেনারা। ছবি: সিএনএন নিউজ।
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত শেষ হলে, মধ্যপ্রাচ্যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা উপস্থিতি কমিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন দেশটির সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
মার্কিন প্রশাসন যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলে কতটা সামরিক অবকাঠামো ও জনবল রাখবে, তা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে 'নীরবে আলোচনা চলছে' বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ছয়টি সূত্র।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন নিউজ এ তথ্য জানায়।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এটি হবে আরেকটি বড় পরিবর্তন। গত কয়েক দশকে, একের পর এক মার্কিন প্রেসিডেন্ট, এ অঞ্চল থেকে নিজেদের সামরিক সম্পৃক্ততা কমানোর কথা বললেও বাস্তবে বিভিন্ন সংকট ও সংঘাতের কারণে বারবার সেখানে ফিরে যেতে হয়েছে ওয়াশিংটনকে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রে, সন্ত্রাসী হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে সামরিক ও গোয়েন্দা ঘাঁটির বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষকরে, ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরান, ইয়েমেন ও লিবিয়ায় যুদ্ধ, বিমান হামলা এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনায় এসব স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক কয়েক মাসের সংঘাত সেই অবকাঠামোর বড় ধরনের দুর্বলতাও সামনে এনেছে। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা একাধিক মার্কিন ঘাঁটি। দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৮ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট মার্কিন সূত্র।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার ভেতরে চলমান অনানুষ্ঠানিক আলোচনার একটি বড় কারণ হলো: যুদ্ধ শেষ হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কী ধরনের সামরিক উপস্থিতি মেনে নিতে পারেন, তা আগেভাগে অনুমান করা। কারণ ট্রাম্প অতীতে বিদেশে মার্কিন সেনা মোতায়েন কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। একই সঙ্গে যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে তার কোনো সুস্পষ্ট কৌশল এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
এখনো মধ্যপ্রাচ্যে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিমানবাহী রণতরী এবং এক ডজনের বেশি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারসহ বিপুল সামরিক সরঞ্জামও মোতায়েন রয়েছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরুর দিকে, সংঘাত যখন সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া কিছু সিআইএ কর্মকর্তাকে আবারও এ অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে।
একই সঙ্গে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও যারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করবেন, তাদের নিরাপত্তা কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়েও কাজ করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এর অংশ হিসেবে কিছু সামরিক স্থাপনা মাটির নিচে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে ঘাঁটিগুলোকে আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত করতেই এমন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আলোচনার সঙ্গে পরিচিত দুই ব্যক্তি।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের কিছু ঘাঁটি ভূগর্ভস্থ করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করে আসছে। তবে যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের হামলায় এসব স্থাপনার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ঘাঁটিগুলোর দুর্বলতা সম্পর্কে আগে থেকেই জানা ছিল। কিন্তু তা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র কখনো যথেষ্ট তৎপরতা দেখায়নি।
মার্কিন সমর বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী বছর থেকেই বদলাতে পারে মার্কিন সামরিক কাঠামো। চলমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির কাঠামো পরিবর্তনের জন্য ইতোমধ্যে একাধিক সম্ভাব্য পরিকল্পনা তৈরি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
তবে যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় বিমান অভিযান পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলো পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর এ বিষয়ে করা প্রশ্ন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের কাছে পাঠিয়েছে। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সেন্ট্রাল কমান্ড কোনো মন্তব্য করেনি। সিআইএও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
এর মধ্যেই ওয়াশিংটনের সামনে আবারও ফিরে এসেছে বহু পুরোনো প্রশ্ন: মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র আসলে কতটা সরে যেতে পারবে?
৯/১১-এর পর ব্যাপকভাবে বেড়েছিল মার্কিন উপস্থিতি
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার আগে থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ছিল। ১৯৯৮ সাল থেকে এ অঞ্চলে প্রায় ২৭ হাজার সক্রিয় মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল, যা আগের কয়েক দশকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
৯/১১ হামলার পর সেই উপস্থিতি আরও দ্রুত বাড়তে থাকে। প্রথমে আফগানিস্তানে যুদ্ধ, এরপর ইরাক যুদ্ধ এবং পরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনার জন্য নতুন নতুন ঘাঁটি ও সামরিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়।
২০০৩ সালে, ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের সময় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছিল। ২০০৭ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ওঠানামা করলেও কোনো সময়ই প্রায় ১ লাখের নিচে নামেনি।
২০১১ সালে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ঘোষণা করেছিলেন, আফগানিস্তানে ‘যুদ্ধের সময় কমে এসেছে’। তিনি সেখানে বাড়তি মোতায়েন করা হাজার হাজার সেনা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেন। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে পুরোপুরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহার হতে আরও এক দশক সময় লাগে।
একই বছর, ইরাক থেকেও মার্কিন যুদ্ধ সেনা প্রত্যাহার করেন ওবামা। দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে তৈরি হওয়া ক্ষমতার শূন্যতার সুযোগ নিয়ে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের উত্থান ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আবারও ইরাকে মার্কিন সেনা পাঠাতে হয়।
২০১১ সালের পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাসংখ্যা কমলেও তা দীর্ঘ সময় ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজারের মধ্যে ছিল।
ইরানের হুমকি বরাবরই বড় উদ্বেগ
এই পুরো সময়জুড়েই মার্কিন নীতিনির্ধারকদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ ছিল ইরান। বিশেষ করে ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা নিয়ে উদ্বেগ ছিল ওয়াশিংটনের। ইরাকে এসব গোষ্ঠীর হামলায় মার্কিন সেনাদের প্রাণহানিও ঘটেছে।
এখন যখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে, তখনও ইরানের সঙ্গে সংঘাতের অবসানের কোনো সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি ওয়াশিংটন ও তেহরান।
ইরান এখনো মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গত সপ্তাহেও জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে তেহরান। প্রায় এক মাস পর, দুই পক্ষের মধ্যে, আবারও সরাসরি গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এসব হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কম নয়। সৌদি আরবের রিয়াদে সিআইএ'র একটি ঘাঁটি ইরানের হামলায় কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন একজন মার্কিন কর্মকর্তা ও সাবেক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
পেন্টাগন ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কম করে দেখানোর চেষ্টা করলেও বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এসব হামলায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সব ঘাঁটি পুনর্নির্মাণ নাও করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র
সিআইএ ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালনাকারী ইউনিটগুলোর কিছু কর্মকর্তা এখন এমন সম্ভাবনাও বিবেচনা করছেন, যেখানে স্থায়ী ঘাঁটি ছাড়াই একই ধরনের অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব।
এক্ষেত্রে জনবল ও সরঞ্জাম যুক্তরাষ্ট্রেই রাখা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কোনো অভিযান পরিচালনার জন্য তাদের মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হবে এবং মিশন শেষ হলে আবার দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, ইরানের হামলায় যেসব মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা স্থাপনা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে, সেগুলোর কিছু হয়তো আবার পুনর্নির্মাণ নাও করা হতে পারে। এর পেছনে নিরাপত্তার পাশাপাশি বিপুল ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তবে কোন কোন স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করা হবে, সে বিষয়ে এখনো প্রকাশ্যে কিছু জানায়নি পেন্টাগন।
চলতি বছরের এপ্রিলে, পেন্টাগন জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা মেরামতে ঠিক কত খরচ হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান ভবিষ্যতে কেমন হবে, সেটিও আগে মূল্যায়ন করতে হবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর বাড়ানো হতে পারে প্রতিরক্ষা দায়িত্ব
আলোচনার সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত পর্যায়ে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে মার্কিন সেনার উপস্থিতি কমানোর পক্ষে মত দিচ্ছেন।
এর সঙ্গে বৃহত্তর একটি পরিকল্পনাও জড়িত। যেমন: মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক মিত্র ও অংশীদারদের ওপর আরও বেশি দায়িত্ব দেওয়া।
একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা দিতে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, ইরানের অবকাঠামোয় হামলা করছে এবং আরও কিছু লক্ষ্যবস্তুতে হামলার হুমকি দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রবণতাও কর্মকর্তাদের হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলছে।
‘মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে আসার’ পুরোনো প্রতিশ্রুতি
১১ সেপ্টেম্বরের হামলার সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএও নিজেদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল। তৎকালীন প্রধান প্রতিপক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়ন ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছিল। সন্ত্রাসবাদ ও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে কাজ করা কিছু দক্ষ বিশ্লেষক থাকলেও তাদের সংখ্যা ছিল সীমিত।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্টিন ক্যাম্পাসের গোয়েন্দা ইতিহাসবিদ জেফরি রগের মতে, সে সময় মধ্যপ্রাচ্যে সিআইএর কর্মীর সংখ্যা সম্ভবত কয়েকশ'র বেশি ছিল না।
কিন্তু ৯/১১-এর পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। সিআইএ ব্যাপকভাবে কর্মী নিয়োগ শুরু করে এবং অস্ত্র বহনকারী ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি কাজ করা প্যারামিলিটারি কর্মকর্তাদের সংখ্যা বাড়ায়। তাদের মূল কাজ হয়ে ওঠে সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করা ও অভিযান পরিচালনা করা।
এটি ছিল সিআইএ'র প্রচলিত গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভূমিকা থেকে বড় পরিবর্তন। আগে যাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে গোপন তথ্য সংগ্রহ করা।
তবে পরবর্তী দুই দশকে সামরিক ও গোয়েন্দা: দুই সংস্থাকেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী সম্পৃক্ততার উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
দল-মত নির্বিশেষে একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন সময়ে এই অঞ্চল থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন। ওবামা প্রশাসন সামরিক ও গোয়েন্দা সম্পদের বড় একটি অংশ এশিয়ার দিকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেও চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ার দিকে মনোযোগ সরানোর পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা অঙ্গনে এক ধরনের রসিকতার বিষয়ে পরিণত হয়। কারণ, আইএসের উত্থান থেকে শুরু করে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার মতো সিদ্ধান্ত, বারবারই, যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে ফিরিয়ে এনেছে।
ইরান নিয়ে ট্রাম্পের কৌশল কতটা কার্যকর হবে?
সম্প্রতি মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করলেও তা তার ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে খুব বেশি কার্যকর নাও হতে পারে।
এর পরিবর্তে ট্রাম্প এখন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। লক্ষ্য হলো, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানের সরকারকে দুর্বল করে দেওয়া।
তবে এই কৌশল সফল হতে কত সময় লাগবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব কয়েক মাস ধরে অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করার সক্ষমতা রাখে এবং অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে নতি স্বীকার করার সম্ভাবনাও কম।
এদিকে, পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে কয়েকটি বড় ও স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি রাখার পরিকল্পনা করছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তবে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পর এসব ঘাঁটি পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো কতটা অর্থ দিতে রাজি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একটি সূত্রের মতে, কিছু ঘাঁটি পুনর্নির্মাণে কয়েক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
তবে স্বল্পমেয়াদে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সেনা ও সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের হামলার ঝুঁকির মধ্যেই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, বাহরাইনে থাকা পঞ্চম নৌবহরের প্রচলিত ঘাঁটিতে নৌবাহিনীর সদস্যরা ‘শিগগিরই’ ফিরছেন না।
মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল বলেন, বাহরাইনে নৌবাহিনীর সদস্যদের দ্রুত ফেরানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। নিজের বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে তিনি ‘সম্পূর্ণ সৎ’ থাকতে চান বলেও জানান।
এতে স্পষ্ট হচ্ছে, ইরানের সঙ্গে সংঘাত শেষ হলেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির পুরোনো কাঠামো আর আগের মতো থাকবে কি না, তা নিয়ে ওয়াশিংটনে এরই মধ্যে বড় ধরনের পুনর্বিবেচনা শুরু হয়েছে।
/এআই